বাংলাদেশী সিনেমায় স্ট্রিট স্যঙের রাজা || আহসান রফিক

বাংলাদেশী সিনেমায় স্ট্রিট স্যঙের রাজা || আহসান রফিক

চটুল গান সিনেমার এক প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। চটুল গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হলো (Street Song) স্ট্রিট স্যং। বাংলাদেশী ছায়াছবির স্বর্ণালী যুগে নায়ক রাজ্জাক, আহসান, উজ্জ্বলরা পর্দায় যখন থাকতেন চানাচুরওয়ালা, বুটপালিশওয়ালা, রিকশাচালক, কারড্রাইভার অথবা বাহারী দ্রব্যের ফেরিওয়ালা হিশেবে তখন তাদের লিপে থাকত মো. আলী সিদ্দিকীর স্পিরিটেড ভয়েসের স্ট্রিট স্যং।

তাঁকে বলা হয় স্ট্রিট স্যঙের রাজা। চটুল গানকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন শিল্পের মাত্রায়। তবে মো. আলী সিদ্দিকীকে যদি শুধু চটুল গানের ফ্রেমে বন্দি করা হয় তবে তার প্রতি অবিচার করা হবে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বেতার যখন নাজিমউদ্দিন রোড থেকে শাহবাগে স্থানান্তরিত হয় তখন রেডিও থেকে অপার সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি।

১৯৬৩ সালে খান আতার সুরে ঢাকামেইড উর্দু ছবি ‘প্রীত না জানে রীত’-এ প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের তত্ত্বাবধানে নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছবিতে কবি সিকান্দার আবু জাফরের লেখা ও আলতাফ মাহমুদের সুরে গাইলেন একটি টাইট ক্ল্যাসিক্যাল গান ‘কালো রূপ কত অপরূপ আমি দেখেছি নয়ন মেলে’।

তখনও বোঝা যায়নি এ-গায়ক পরবর্তীকালে চটুল গানের প্রয়োজনীয় শিল্পী হয়ে উঠবেন। ‘হেসেখেলে জীবনটা যদি চলে যায়’, ‘ঐ দূর দূর দূরান্তে’, ‘আহা রাজপুত্তর চায় মামলেট’, ‘এই শহরে আমি যে এক নতুন ফেরিওয়ালা’, ‘চানাচুর এনেছি বড় মজাদার চানাচুর গরম’, ‘আমি এক দূরন্ত যাযাবর’, ‘বুটপালিশ জুতাপালিশ’ সহ বহু হ্যাপিস্যং-এর গায়ক মো. আলী সিদ্দিকী ১৯৭০ সালে গাজী মাযহারুল আনোয়ারের লেখা ও সত্য সাহার সুরে নায়ক উজ্জ্বলের প্রথম ছবি ‘বিনিময়’-এ ছবির পরিচালক ও অভিনেতা সুভাষ দত্তের লিপে ছবির থিম স্যং হিসেবে গাইলেন যোগবিয়োগ-গুণভাগের দোলাচলে দোলায়িত মানবজীবনের অভিব্যক্তিমূলক একটি অপূর্ব কমেডি গান ‘জানতাম যদি শুভঙ্করের ফাঁকি / আমার ঘরে পড়ত না ভাই শূন্য’। বিস্ময়করভাবে বহুল জনপ্রিয় এ-গানটির ১ম অন্তরা ‘দুইয়ে-দুইয়ে চার আবার দুই-দুগুণে চার / যোগবিয়োগ আর পূরণভাগের এ কী অত্যাচার’ … যেন একটি ইউনিভার্স্যাল কোটেশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজকাল পথেঘাটে-রাস্তায় বা পাব্লিক বাসে চানাচুরওয়ালারা যে ‘চানাচুরররর’ বলে হাঁক ছাড়ে তার উৎস কিন্তু ১৯৬৮ সালে উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘চোরাবালি’ ছবিতে নায়ক আহসান আলী সিডনীর লিপে সত্য সাহার সুরে মো. আলী সিদ্দিকীর গাওয়া ‘চানাচুর এনেছি বড় মজাদার চানাচুর গরম’ গানটি।

১৯৬৩ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত ৪টি উর্দু ও ২৩৩টি বাংলা ছবিতে ছয়শোর মতো গান গেয়েছেন তিনি, যার মধ্যে স্যাড ম্যুডের গান ২/৩টি। তবে ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অভিশাপ’ ছবিতে ‘চাওয়া-পাওয়ার মাঝে কি পেয়েছি বলো না / মুঠো মুঠো শুধু ব্যথা আর বেদনা’ গানটি শুনে অনেক বোদ্ধা অভিমত দিয়েছিলেন তাঁকে স্যাড ম্যুডে আরো ব্যবহার করা যেত।

সাবিনা ইয়াসমীন ও শাহনাজ বেগম (রহমতুল্লাহ)-এর সাথে তাঁর অনেক স্মরণীয় রোম্যান্টিক ডুয়েট আছে। ‘সাইফুলমূলক বদিউজ্জামাল’ ছবিতে শাহনাজ বেগমের সাথে ‘তুমি আমার কাজল ভ্রমর গো’, ‘প্রতিশোধ’ ছবিতে একই গায়িকার সাথে ‘একটি ছোট্ট আশা একটি ছোট্ট বাসা’, ‘মানুষের মন’ ছবিতে সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে ‘আমি কত দিন কত রাত ভেবেছি’, ‘অনেক দিন আগে’ ছবিতে রুনা লায়লার সাথে ‘আমি তিসমার খাঁন / এই জান কোরবান / হেই সুন্দরী’ সহ অনেক গান এই প্রতিভাবান গায়কের বৈচিত্র্যময় দক্ষতার প্রমাণ দেয়।

১৯৭৩ সালে জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবির মাধ্যমে ঢাকাই ছবির ট্র্যানজিশন্যাল পিরিয়ড শুরু হয়। ‘রংবাজ’ ছবির গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ ছবির মেইল ভয়েসের প্রতিটি গান গেয়েছিলেন মো. আলী সিদ্দিকী। এ ছবিতে সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে গাওয়া ‘হৈ হৈ হৈ রঙ্গিলা রঙ্গিলা রে’ গানটি চতুর্দিকে হৈ চৈ ফেলে দেয়।

সিনেমা ছাড়া রেডিও-টিভিতে অনেক বেসিক আধুনিক গান গেয়েছেন। ‘আজকে আমার মনের ময়ূর পাখা মেলেছে’, ‘যা যা যা যা যা উড়ে যা মনভ্রমরা আজকে প্রিয়ার দেশে’, ‘না-হয় রাখলে আমার কথা আগের মতো’, ‘তোমাকে মানায় ভালো যখন তুমি লজ্জারাঙা আবীর মেখে সাজো’ প্রভৃতি জনপ্রিয় রেডিওর বেসিক গান সহ টিভি, সিনেমা ও বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর গানের সংখ্যা চার হাজারেরও বেশি।

শিল্পীকে যখনই প্রশ্ন করা হতো তাঁর সেরা দুটো গানের কথা, অনেক সংগীতবোদ্ধার মতামতের প্রতি একাত্মতা পোষণ করে তিনি বলতেন তাঁর নিজের লেখা ও সুর-করা রেডিওর বেসিক গান ‘বাঁশি বাজে ঐ দূরে চেনা কি অচেনা সুরে’ ও ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছবির সেই ক্ল্যাসিক্যাল অ্যাপ্রোচে গাওয়া ‘কালো রূপ কত অপরূপ’ গানদুটোর কথা।

‘যোগাযোগ’ ও ‘গোপাল ভাঁড়’ নামে দুটো ছবির সংগীত পরিচালনাও করেছিলেন মো. আলী সিদ্দিকী। হার্টের সমস্যার কারণে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আশির দশকের প্রথম থেকেই গান গাওয়া কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সর্বশেষ গেয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে ‘সুখে থাকো’ ছবিতে।

সংগীতাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও তিনি অদ্যাবধি কোনো সরকারী স্বীকৃতি পাননি। ২০১০ সালে ব্রেইনস্ট্রোক করার পর গায়ক আসিফ আকবর সহ অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এক পর্যায়ে সরকারীভাবে তাঁকে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। পরবর্তীকালে পিজির পরিবর্তে মিটফোর্ডে চিকিৎসার ব্যবস্থার কথা বলা হলে তাঁর পরিবার সে-প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

মো. আলী সিদ্দিকী ১৯৭৩ সালে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও টেলিভিশনের এনলিস্টেড ফোকগায়িকা সুরাইয়াকে বিয়ে করেন। মো. আলী সিদ্দিকী ও সুরাইয়া সিদ্দিকীর দাম্পত্য ভালোবাসার গভীরতা যেন সনাতন প্রেমকাহিনিকেও হার মানায়। বিয়ের পর স্ত্রীকে ছাড়া তিনি যেমন একটি দিনও থাকেননি, স্ত্রী সুরাইয়া সিদ্দিকীও শেষদিন পর্যন্ত স্বামীকে আগলে রেখেছিলেন। বিশেষ করে ব্রেইনস্ট্রোক করার পর একেবারেই শয্যাশায়ী স্বামীকে তিনি যে স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক সেবা দিয়েছিলেন তা এ-আধুনিক সমাজের এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। স্বামী ও কন্যাদের স্বার্থে ফোকগানে ক্রমশ জনপ্রিয়তার দিকে ধাবমান অবস্থায় গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন সুরাইয়া সিদ্দিকী। মো. আলী সিদ্দিকীর তিন মেয়ে এ্যানি, রিনি ও গিনি তিনজনই বেতার-টিভির এনলিস্টেড শিল্পী হলেও এ-মুহূর্তে অত্যন্ত ধার্মিক এ-পরিবারটির কেউই এখন গানের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয়।

সোনালি দিনের কিংবদন্তি গায়ক মো. আলী সিদ্দিকী প্রয়াণের তৃতীয় বছর সম্প্রতি নীরবেই চলে গেল। অনুসন্ধিৎসু সংগীতসমুজদারদের মনে এই শিল্পী চিরভাস্বর রইবেন যুগযুগান্তরব্যাপী। ২০১৪ সনের ৪ নভেম্বর পবিত্র আশুরার দিন আলোছায়ার ভুবন ছেড়ে অনেক অভিমান নিয়ে অনন্তের পথে পাড়ি দিয়েছেন মো. আলী সিদ্দিকী।

… …

আহসান রফিক

COMMENTS