নজরুলের কথা ভাবতেছি। সিলেটের বৃষ্টিমাখা এই মধ্যরাতে। এই বৃষ্টি খুব স্পেশাল এইখানে। শীতের সময়টা বাদ দিলে, মধ্যরাতে এই মায়াবী বৃষ্টির দেখা আপনে সারাবছর পাইবেন। সারাদিন খুব রোদ, আর্দ্রতায় ভারী বাতাস, এপ্রিল-মে মাসের ধূসর ও বেখাপ্পা আবহাওয়া যখন আপনারে অস্থির কইরা তোলে, মধ্যরাতে পেঁচার চোখ-ভিজায়ে জীবনানন্দের নির্মোহ বিষাদের মতো এই বৃষ্টি আসে। অপ্রস্তুতে। জানালায় অপরিণত মাতম তুইলা আচমকা বিদায়ও নিবে—এমনো নিশিচরে।
ধরণী দিয়াছে তার
গাঢ় বেদনার
রাঙা মাটি-রাঙা ম্লান ধূসর আঁচলখানি
দিগন্তের কোলে কোলে টানি।
পাখি উড়ে যায় যেন কোন্ মেঘ-লোক হতে
সন্ধ্যা-দীপ-জ্বালা গৃহ-পানে ঘর-ডাকা পথে।
(বেলাশেষে, দোলন-চাঁঁপা, নজরুল, অক্টোবর ১৯২৩)
এই বৃষ্টির রাতে জেলে-বইসা-লেখা নজরুলের ওই রোমান্টিক, নিঃসঙ্গ-বেদনার কবিতাটা মনে মনে জপতেছিলাম। যেন আমি চব্বিশ-বছর-বয়সী বিখ্যাত এই ইয়াং-পোয়েটের মনের কথা বুঝতে চাইতেছিলাম। এই জেনজি-জেনআলফা জেনারেশনে আইসা আমি এক জেনওয়াই— বিশশতকের এক বন্দী কবির নিঃসঙ্গতারে টোকা দিতেছিলাম নিজের ভিতর। ইতিমধ্যে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ঝড় তুলতেছেন একের পর এক বেপরোয়া কবিতায়। দাবী কইরা বসেন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা। অতএব ব্রিটিশ বেনিয়াদের কারাগারে আটক হইলেন এই তরুণ বিদ্রোহী।
আকাশের অস্ত-বাতায়নে
অনন্ত দিনের কোন্ বিরহিণী কনে
জ্বালাইয়া কনক-প্রদীপখানি
উদয়-পথের পানে যায় তার অশ্রু-চোখ হানি?
‘আসি’-বলে-চলে-যাওয়া বুঝি তার প্রিয়তম আশে,
অস্ত-দেশ হয়ে ওঠে মেঘ-বাষ্প-ভারাতুর তারি দীর্ঘশ্বাসে।
(বেলাশেষে, দোলন-চাঁঁপা, নজরুল, অক্টোবর ১৯২৩)
ফের বৃষ্টি শুরু হইলো। নিজের ভিতরে কোথাও এই বৃষ্টিরে কি ধইরা রাখতে পারি? সাথে মেঘের ডাক, রাতের শোর, দূর লাক্কাতুরায় ভিজতে থাকা টিলার মুখ? যেন নিজের অদেখা অবয়বের কাছে কোথাও এক অস্ত-দেশের দেখা পাইতেছি আমি। সেইখানে পথ আছে, মাঠ আছে। আছে কাঠের বন ও তার ভরা-অন্ধকার। সেইখানে আমি তার ভোর। আমি তার বিনীত আকাশ।
আদিম কালের ঐ বিষাদিনী বালিকার পথ-চাওয়া চোখে—
পথ-পানে-চাওয়া-ছলে দ্বারে-আনা সন্ধ্যা-দীপালোকে
মাতা বসুধার মমতার ছায়া পড়ে।
করুণার কাঁদন ঘনায় নত-আঁখি স্তব্ধ দিগন্তরে।
কাঙালিনী ধরা-মা’র অনাদি কালের মতো অনন্ত বেদনা
হেমন্তের এমনি সন্ধ্যায় যুগ যুগ ধরি বুঝি হারায় চেতনা…
(বেলাশেষে, দোলন-চাঁপা, নজরুল, অক্টোবর ১৯২৩)
বৃষ্টির নিজের একটা হারমোনি আছে। সন্ধ্যার মতো। বস্তু ও প্রতি-বস্তু নিয়া। এই হারমোনি ধইরা আপনে ঘরে ফিরতে পারবেন না। বরং এই হারমোনি নিজেই হইয়া ওঠে এক গোপন আশ্রয়। এই আশ্রমে বিষণ্ণ হইয়া বইসা থাকে এক ধীমান দার্শনিক। যেন সব প্রশ্নের উত্তর জাইনা ফেলছে সে আচমকা। ইনফ্যাক্ট দার্শনিকের একটাই প্রশ্ন ছিল এই ইহলোকে। বৃষ্টির ভিতর এখন আর কোনো কাজ নাই তার।
কী যে তুমি, কী যে নহ, কত ভাবি—কত দিকে চাই
নামে নামে, অ-নামিকা, তোমারে কি খুঁজিনু বৃথাই?
বৃথাই বাসিনু ভালো? বৃথা সবে ভালোবাসে মোরে?
তুমি ভেবে যারে বুকে চেপে ধরি সে-ই যায় স’রে
কেন হেন হয়, হায়, কেন লয় মনে—
যারে ভালো বাসিলাম, তারো চেয়ে ভালো কেহ বাসিছে গোপনে….
(অ-নামিকা, সিন্ধু-হিন্দোল, নজরুল, জুলাই ১৯২৮)
নজরুলের বয়স তখন আটাশ-উনত্রিশ। রক্ষণশীল কিছু পত্রিকার ধারাবাহিক নির্মম সমালোচনায় বিধ্বস্ত নজরুল। কন্সট্রাক্টিভ সাহিত্য-সমালোচনা সবসময়ই ওয়েলকাম। কিন্তু নজরুলরে তারা আক্রমণ করতেছিল ধর্ম নিয়া, তাঁর ভাষা নিয়া, তাঁর রাজনৈতিক লড়াই নিয়া। কারা ছিল না ওই নিষ্ঠুর তান্ডবলীলায়? মুসলিম রক্ষণশীল, হিন্দু রক্ষণশীল, তথাকথিত রবীন্দ্রবলয়ে-থাকা-অভিজাত লিখিয়েরা, জমিদার, ব্রিটিশ বেনিয়াকুলের সুবিধাভোগী—সব। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে, দাঙ্গার বিরুদ্ধে, সাম্যের পক্ষে, ব্রিটিশশাসনের বিরুদ্ধে, জনতার পক্ষে, জমিদারের বিপক্ষে—যত শক্তিশালী হইয়া নজরুল হাজির হইতেছিলেন, তাদের আঘাত তত নৃশংস হইয়া উঠতেছিল। মুসলিম রক্ষণশীলরা নজরুলরে একসময় কাফের, খোদাদ্রোহী, বর্বর, নমরুদ, ফেরাউন, শয়তান নামে ট্যাগ দিতো। এই ভয়াল খরস্রোতার বিপরীতে নজরুলের পাশেও ছিলেন কেউ কেউ। চির-রোমান্টিক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ইয়াং এই বিদ্রোহী, তুখোড় সৃষ্টিশীল কবির উত্থানে পাশে ছিলেন বরাবর। ভালোবাসা দিছেন। চব্বিশ-বছরের নজরুল যখন জেলে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ উৎসর্গ করেন নজরুলরে।
আমি জানি তুমি কেন চাহ নাকো’ ফিরে।
জানিতে না আঁখি আঁখিতে হারায় ডুবে যায় বাণী ধীরে।
তুমি ছাড়া আর ছিল নাকো কেহ
ছিল না বাহির ছিল শুধু গেহ,
কাজল ছিল গো জল ছিল না ও উজল আঁখির তীরে।
সে দিনো চলিতে ছলনা বাজেনি ও-চরণ-মঞ্জীরে
আমি জানি তুমি কেন চাহ নাকো ফিরে…
(ভীরু, জিঞ্জীর, নজরুল, নভেম্বর ১৯২৮)
রাত শেষ হইয়া আসতেছে। বেপরোয়া এক কবির উত্তাল-বোটের কায়াকিং বাদ দিয়া আমি যে তাঁর নিঃসঙ্গতার খোঁজে—নিজের ভিতর ছুটতেছি এই বৃষ্টিমায়ার রাতে, তার কি কোনো অর্থ আছে? এই অর্থ-থাকার মানে কী? নিজের অস্তিত্বরে আরো বেশি মহিমান্বিত করা? কেন? অস্তিত্ব নিয়া কি কোনো সংশয় আছে? ফের থাকা না-থাকার টেনশন…ফের এক অবধারিত কলোসিয়াম। আরেকটা প্রতিধ্বনির মতো এই ইতর-হল্লার এম্ফিথিয়েটারে। কেউ কি নাই তবে তার আগে? তার পরে নাই কোনো সুখবর?
একি বেদনার উঠিয়াছে ঢেউ দূর সিন্ধুর পারে
নিশীথ-অন্ধকারে।
পূরবের রবি ডুবিল গভীর বাদল-অশ্রু-ধারে
নিশীথ অন্ধকারে।।
(নিশীথ-অন্ধকারে, সন্ধ্যা, নজরুল, আগস্ট, ১৯২৯)
হাসান শাহরিয়ার রচনারাশি
গানপারে নজরুল
- মধ্যরাতে বৃষ্টিমায়া ও নজরুল || হাসান শাহরিয়ার - May 26, 2026
- তথ্য অপতথ্য ও অনলাইন অফলাইন অসভ্যতা || হাসান শাহরিয়ার - May 2, 2026
- রইদের সহজিয়া || হাসান শাহরিয়ার - April 16, 2026

COMMENTS