ম্যাডোনার গানেও অবশেষে দেখা পাওয়া গেল অমোঘ সেই চিন্তার, সোজা বাংলায় মৃত্যুচিন্তা নামেই ডিটেক্ট করা যায় যারে। একদমই রিসেন্ট এবং লেটেস্ট অ্যালবামে ম্যাডোনাকে এমন মৃত্যুচিন্তিত হতে দেখা গেল। দশকের পর দশক ধরে তিনি নিজের অমরতা নিয়ে বড়াই করেছেন, কিন্তু তার নতুন বেরোনো ‘কনফেশন্স টু’ অ্যালবামে ম্যাডোনাকে যেন মৃত্যু তাড়া করে ফিরছে এবং তিনি তারুণ্যের স্বাধীনতার জন্য শোক করছেন। এটি এমন এক দুর্বলতা যা তাকে আরও মানবিক করে তুলেছে এবং গত কয়েক দশকের মধ্যে তাকে সবচেয়ে সৃজনশীলভাবে আকর্ষণীয়ও করে তুলেছে।
অ্যালবামটি রিলিজের পরপরই লিখেছেন অ্যাডাম হোয়াইট। সেই লেখা দেখে দেখে এই লেখা। বাংলায়। লাইন বাই লাইন অনুবাদ নয়। আজকাল অনুবাদ অ্যাআইয়ের এক পলকের বিষয়। একক্লিকে একশপাতা হাজারপাতা হাফসেকেন্ডে। এডিট করার পরেই জিনিশটা মানুষের মুখনিঃসৃত বলে মনে হয়, তার আগে নয়। বাংলাদেশে সবই আছে ভুরি ভুরি গণ্ডায় গণ্ডায়, এডিটর ছাড়া। অ্যানিওয়ে। অ্যাডাম হোয়াইটের এই লেখাটা ছাপা হয় মাত্র গত মাসে, এ-বছর ছাব্বিশের জুলাইয়ের পয়লা সাপ্তায়, অ্যালবাম রিলিজের পরেপরেই। ইউকে বেইসড ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায়।
যে-লেখা থেকে ‘ম্যাডোনায় মৃত্যুচিন্তা’ বাংলায় এসেছে, ‘ম্যাডোনা ইজ ফাইন্যালি ফেইসিং হার মর্টালিটি’ শিরোনাম তার। লিখেছেন, আগেও বলেছি, অ্যাডাম হোয়াইট। বলবার বাকি কিছু? ও হ্যাঁ, একবৈঠকে এঁটে ওঠা গেল না বলে নেক্সট সিটিঙে লেখাটা শেষ করা যাবে। স্টে উইথ। ল্যভ।—জিপিডেস্ক

ম্যাডোনায় মৃত্যুচিন্তা || অ্যাডাম হোয়াইট
আজ থেকে এক দশক আগে ম্যাডোনা একটি স্পিচ দিয়েছিলেন। দুইহাজারষোলোয়। বিলবোর্ড পত্রিকার কাছ থেকে সেই দিনটায় তিনি ‘উয়োম্যান অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার গ্রহণ করতে গেছিলেন। বক্তৃতায় তিনি শিল্পকলা, নারীবাদ, নারীবিদ্বেষ, সহিংসতা আর শন পেনের সাথে তার বিয়ের পরে সেই উত্তাল কয়েকটি বছর নিয়ে কথা বলেছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত। ওইসময় তিনি মৃত্যু নিয়েও কথা বলেছিলেন লক্ষ করব। অথবা, আরও স্পষ্ট বলা ভালো, মৃত্যুবরণ না-করা নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, “লোকেরা বলে আমি বিতর্কিত, কিন্তু আমার মনে হয়, আমি জীবনে সবচেয়ে বিতর্কিত যে-কাজটি করেছি তা হলো টিকে থাকা। দ্যাখেন, মাইকেল জ্যাকসন চলে গেছেন। টুপাক শাকুর চলে গেছেন। প্রিন্স চলে গেছেন। হুইটনি চলে গেছেন। অ্যামি ওয়াইনহাউস চলে গেছেন। ডেভিড বোয়ি চলে গেছেন। কিন্তু আমি এখনও দাঁড়িয়ে আছি।”
বক্তৃতার এই অংশটি, ঠিক উপরের প্যারায় যেটুকু কোট করা হয়েছে, ম্যাডোনার আত্মপ্রচারের প্রমাণ হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিত্য ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। কিন্তু প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রাখলে এই কথাগুলি নির্মম সত্য। ওই অংশে ম্যাডোনা যে-নামগুলো উল্লেখ করেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনজন তার স্বর্ণযুগে পাশে দাঁড়ান নাই। যদিও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি অবশ্য টুপাক শাকুরের সঙ্গে প্রেম করেছিলেন। সত্যি বলতে গেলে সেইসময় তারা চারজনে ছিলেন একটি চতুষ্টয় : প্রিন্স, ম্যাডোনা, হুইটনি ও এমজে। এরা আশির দশকের চার কিংবদন্তি, যারা আধুনিক পপতারকার ধারণাটি তৈরি করেছিলেন ওই সময়টায়। তাদের মধ্যে ম্যাডোনা টিকে গিয়েছিলেন ওই সময়, আর বাকিরা আসক্তি ও অমিতাচারে বা যাপনজনিত জটিলতায় দীর্ঘ বন্ধ্যাকাল পার করে শেষে বিদায় নিয়েছেন। ওই বক্তৃতায় ম্যাডোনা স্বীকার করেন যে এই টিকে থাকতে পারায় তিনি গর্বিত। পপসংগীতে এবং সংগীতের বাইরে এটাই ছিল ম্যাডোনার নিজের জীবনের গল্প।

তার মৃত্যু-অবসেশনযুক্ত নতুন অ্যালবাম ‘কনফেশন্স টু’ প্রকাশের আগে থেকে আমি ম্যাডোনার কাজে মৃত্যুর উপস্থিতি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম। এটা সবসময়ই একরকম অবিশ্বাস্য মনে হতো। ম্যাডোনা এক অজেয়তার প্রতীক—সেটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আধ্যাত্মিকতা, বা বেভারলি হিলসের কোনো দামী রূপসজ্জাকারীর দ্বারাই চালিত হোক না কেন—যা দেখে মনে হতো নশ্বরতা বা মৃত্যুর বিষয়টা তাকে কখনো স্পর্শ করবে না। কিন্তু তারপর আসে তেইশ সালের জুন মাস। দুইহাজারতেইশের ঠিক মাঝামাঝি। তিনি প্রায় মারাই গিয়েছিলেন; এক মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে তার ডাক্তাররা তাকে আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য কোমায় পাঠিয়েছিলেন।
কোমা থেকে ফিরেছেন সবাইকে চমকে দিয়ে। এরপর থেকে একের পর এক আঘাত আসতেই থাকল। দুইহাজারচব্বিশের সেপ্টেম্বরে তার সৎমা ক্যান্সারে মারা যান, তারপর তার ভাই ক্রিস্টোফার। বলতে হয়, ক্রিস্টোফার একজন রসিক, চটপটে, সমকামী ব্যক্তি যিনি কখনও ম্যাডোনার সেরা বন্ধু কখনও ঘোরতর শত্রু ছিলেন। সৎমা মারা যাবার একমাস পরেই ক্রিস্টোফার ক্যান্সারে মারা যান। ম্যাডোনার বড়, আরও সমস্যাগ্রস্ত ভাই অ্যান্টনিও মারা যান ম্যাডোনার কোমায় যাবার কয়েক মাস আগে। গত বছর অর্থাৎ পঁচিশেও গুজব ছড়িয়েছিল যে তার প্রায় শতবর্ষী পিতাও ভয়ানক অসুস্থ ও মৃত্যুগামী, কিন্তু পরে সেই নিউজটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।

ম্যাডোনার বয়স বর্তমানে সাতষট্টি। তিন কম সত্তইর বছর। দুইহাজারছাব্বিশের জুলাই পর্যন্ত গণনায়। আব্রাহাম লিঙ্কন যখন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তখন তার যে বয়স ছিল, ম্যাডোনার বয়স তার চেয়ে এগারো বছর বেশি। আরেক গ্রেইট পপগডেস শের, শেরিল সার্কিসিয়ান, ছাপ্পান্ন বছর বয়সে তার প্রথম বিদায়ী সফর শুরু করেছিলেন। পপ ও রক সিনের এমন ঘটনাগুলো মনে রাখাটা ম্যাডোনার মতো আর্টিস্টকে বিবেচনার সময় গুরুত্বপূর্ণ।
‘কনফেশন্স টু’ কোনো ক্ষয়িষ্ণু শিল্পীর কাজ নয়। মৃত্যুচিন্তায় বিচলিত মুমূর্ষু কোনো গতযৌবনা আর্টিস্টের আর্ত আওয়াজ নয়। এমন নয় যে ম্যাডোনার এই অ্যালবাম শুনতে যেয়ে এক গ্রেইটের পড়তি দশার কাজ সহানুভূতিবশত শুনছেন বলে মনে হবে। এ নয়, এ মোটেও নয়। এ-অ্যালবাম জরুরি, ঝলমলে, প্রায়শই অবিশ্বাস্যভাবে অন্তরঙ্গ ডিস্কোপপে পরিপূর্ণ। শুনতে শুনতে মনে হবে এ কাউরে তেলায় না, কাউরোর তোয়াক্কা পরোয়া করে না, আবার অস্বস্তিতেও ফালায় না। অ্যালবাম বেরিয়েছে শুক্কুরে শুক্কুরে সাপ্তাও হয় নাই, এরই মধ্যে সর্বত্র বলাবলি শুরু হয়ে গেছে এইটা তার লাস্ট কুড়িবছরের মধ্যে সেরা অ্যালবাম।

যদিও বয়সের হিসাব মুখ্য নয়, কিন্তু পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হয় ম্যাডোনা আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি ভঙ্গুর, আগের চেয়ে ফ্র্যাজাইল। আগের মতো স্থির নন। চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুর দিকে নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে এক ছোট কন্সার্টে দেখা যায় ম্যাডোনা মাটি থেকে তিরিশফুট উচ্চতায় একটা প্লাস্টিকের ব্যারিয়ারের উপর দিয়ে পা ঝুলিয়েছেন; তবে তার আগে তিনি ভয়ে ভয়ে পা সামনে-পেছনে নেড়েচেড়ে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলেন যে এই সিক্যুয়েন্সটা তার জন্যে নিরাপদ কি না। আগের দিনের ম্যাডোনা হয়তো এসবের পরোয়াই করতেন না, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি জাহান্নামে যাক।
অসমাপ্ত। পরবর্তী কিস্তিতে সমাপ্য।
গানপারে ম্যাডোনা
- ম্যাডোনায় মৃত্যুচিন্তা - August 11, 2026
- জাকির জাফরান, বাংলা কবিতার তিন দশকের তবিলদার - August 6, 2026
- শোনো পুঁইপাতা, জাকির জাফরান ও এক গার্ডেনারের গান - August 4, 2026

COMMENTS