
১৮.
মেঘ ও বৃষ্টির প্রগাঢ় আলিঙ্গনের মিতালী ছিল আজও। পরশুর স্নোফলের কারণে একেবারে লয়াল প্রেমিকের মতন আইস জমে ছিল কঠিনভাবে। দেবর মিঠু দক্ষ ড্রাইভার। ও গাড়ি চালাচ্ছিল স্মুথ ভঙ্গিতে । মনে হচ্ছিল যাচ্ছি কোনো স্বপনপারের দেশে! মাথার ওপর অনেকখানি নেমে আসা আকাশে মেঘেদের বিস্তর ভাসাভাসি আর ঝরেপড়া। ফাঁকে ফাঁকে অবুঝ শিশুর চার দাঁতের হাসির মতো মোলায়েম ও পবিত্র রৌদ্রকিরণ! ওয়েদার যত খারাপ হবে ভেবেছিলাম, ততটা খারাপ হলো না। কিন্তু বাতাস ছিল ভাঙা কাচের টুকরার মতো ধারালো। ধামধাম বিঁধে যাচ্ছিল ত্বক ভেদ করে একেবারে হাড়ের ভিতর। সে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা!
একদম ওপরে আইসপ্রুফ জ্যাকেট, ভেতরে সোয়েটার। মাফলার, গ্লাভস, টুপি নিয়ে জেরবার দশা। পায়ে স্নোবুট। এত ভারী যে পা ফেলতেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। তবুও হাঁটতে হয়। হাজার বছরের পথ হাঁটতে চাওয়া পথিক আমি।
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, / সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে / অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে / সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; / আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন…
মিঠু আমাদের গাইড ও ফিলোসোফার দুইয়ের ভূমিকাই নিচ্ছিল। একই সঙ্গে ওর দুর্দান্ত সেন্স অব হিউমার!
এবং অতি দূর থেকে তাহাকে কেমন দেখায়? এটা ভেবেই মিঠু গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে গেল অন্যপথে। আমাদের গাইড বড় বুদ্ধিমান বটে! এক দুর্দান্ত নৃত্যপর ভরযুবতীকে দেখলাম আবছা আলোর মতো। জল নাকি আলোর ঝর্ণাধারা ও? আর অবাক ব্যাপার, ওর ঝুমুরের শব্দ আমি পাচ্ছিলাম বহূ দূর থেকেই।
অতিদূর সমুদ্রের ‘পর / হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা / সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর, / তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’…
ভরযুবতীকে দেখলাম একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলেও ওর শতসহস্র নাচের মুদ্রা ঠাহর করা বড় মুশকিল! শুধু দুইচোখে এই পৃথিবীর যাবতীয় বিস্ময় জমা করে দেখে যেতে হয়—কতভাবে কিংবা কীভাবে ঝরে যাচ্ছে সে। ভরযুবতী অনন্তযৌবনা, অনন্ত যৌবনখানি অমলিন রেখে সে ঝরেই যাচ্ছে অবিশ্রাম! এ কী, ওর চোখের জল! নাকি এই পৃথিবীর তাবৎ অসুখী নারীর সম্মিলিত ক্রন্দন?
অশ্রুর একটি ফোঁটায় জন্ম আমার,আমার মরণ, / নীরবে জাতিস্মরের গল্প বলা তোমার ধরন। / ঝরেছো আগেও তুমি বৃষ্টি হয়ে, আবার ঝরো…
ভরযুবতীর দেহে নানা রঙের খেলা। বৃষ্টিপতনে যেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল ওর পেখম মেলা। তবুও যা বা যতটুকু দেখা যায়, দেখে নিতে চাইলাম মনপ্রাণ ভরে। ওই পতনশীল জলের রঙ টারকোয়াইজ নাকি পেস্ট? হালকা-সবুজাভ-নীল বলতে পারলেই লাগসই হয় হয়তো-বা। কখনো হীরকদ্যুতির মতো শাদা হয়ে ঝরে পড়ছে। যেন-বা অগণন শাদা পায়রার ঝাঁক উড়ে উড়ে গলে পড়ছে স্রোতধারা হয়ে।
কনকনে ঠাণ্ডায় শরীর জমে যাওয়ার উপক্রম। কপাল ঢেকে টুপি পরেও তীব্র শীত এড়াতে পারছি না। বড়কন্যাটি বড় যত্ন করে সব গুছিয়ে দিয়েছিল। উলেন ভারী মোজা। বিড়ালের মতো নরমসরম মাফলার। মোটা ডলার গচ্চা দিয়ে কেনা ওজনদার জ্যাকেট। কিন্তু কীসে কী আটকানো যায়? মারাত্মক সৌন্দর্যের অধিকারী এই জল্প্রপাত—যার সামনে এসে দাঁড়ালে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবনকে থামিয়ে দেবার তুমুল বাসনা পেয়ে বসে, যে-বাসনা থেকে সরে যাওয়া বড্ড কঠিন। বড্ড লড়াই শুরু হয়ে যায় নিজের সাথে নিজের।
পা দুটো তীব্র ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে যেন-বা মমি হয়ে উঠছে। নায়াগ্রা ফলসের পতনশীল জল থেকে বিন্দু বিন্দু শিশিরকণা উড়ে এসে খোলা মুখের ওপর হীরকচূর্ণ জমিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তাকিয়ে দেখি এক একাকী গাঙচিল বসে আছে বরফখণ্ডের ওপর। ওর চোখের ভাষা বিষণ্ণ। ও হয়তো আমারই মতো জীবনের ঘাটে ঘাটে পরাজিত হয়ে এসেছে। নায়াগ্রা ফলস থেকে ঝরেপড়া জলের অপরূপ দৃশ্যাবলি হয়তো ওকে বলছে—আয় এবার। সকল জ্বালা জুড়িয়ে একাকার হই । গলে গলে জল হই। তারপর সাতরঙা জলধারা হই। আকাশের সাথে বিলীন হই। ফের মেঘের কণা হয়ে অবিরত ঝরে পড়ি…
আমি ভাবছি, এই যে স্তূপীকৃত বরফের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ও—পাখি, তোমার কি ঠাণ্ডা লাগছে না? তোমার শরীর না-হয় পালকের ওমে ভরে আছে, কিন্তু পাদুটো কীভাবে এত হিম উপেক্ষা করে বেঁচে আছে? এদিকে আমি স্নোবুট পরেও পা ফেলতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি।
বরফের চাঙারির ওপর নির্বিকার বসে থাকা ওহে গাঙচিল, এই জন্মে আমি মানুষ হয়ে সয়েছি হাজারো দুঃখকষ্টের ভার, আরেক জন্মে পাখি হব, শুধুই ভালোবাসিবার…
১১ নভেম্বর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৮ || পাপড়ি রহমান - September 11, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৭ || পাপড়ি রহমান - September 4, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৬ || পাপড়ি রহমান - August 28, 2026

COMMENTS