বাড়ি ২ || শুভ্র সরকার

বাড়ি ২ || শুভ্র সরকার

শেয়ার করুন:

পেয়ারাপাতা দুলছে। কিছু পাতা দেখে মনো হলো—ঘুমিয়ে আছে, শিশুরা ঘুমায় যেভাবে। একটি আস্ত গাছের পাতায় কখনো স্তবক, কখনো বিচ্ছিন্নভাবে নানা পঙক্তি থাকে। কে তবে পাতা খুলে এসব পড়ে নেয়? পাখি টুনটুনি তাকে দেখছি—অদ্ভুত সুন্দর কবিতাটির কথা বলছে। বলতে গিয়ে তার কণ্ঠনালী থেকে উদ্ভিদ বের হচ্ছে। যার সবুজ ধূসর আর বাদামী অফুরন্ত পাতার কম্পন সবসময় দখিনমুখী হয়ে আছে। কেন জানি মনে হচ্ছে—টুনটুনি পা ফেলে উদাস হয়ে পড়ছে সন্ধ্যার দিকে। পুকুরপাড়ে পাতার নৌকোচাঁদ। অর্ধেক পেয়ারা ডুবে আছে পুকুরের জলে তারও অর্ধেক উপরে।

শুনেছি, বাস্তুশ্রাস্ত্রমতে বাড়ির পূর্ব দিকে পেয়ারাগাছ থাকা ভালো। কিন্তু আমাদের পেয়ারাগাছটা উত্তর দিকে। আমি বিরহ জানি দখিন দিকে। আর দখিন দিকে যে জিগাগাছটা, তাতে আঠালো অশ্রু লেগে আছে। অবশ্য সেই অশ্রু দীর্ঘ হলে বাদামী থেকে কালচে রঙ ধারণ করে। আমি যখন কল্পনা করি—পাটকাঠির মাথায় সেই গাছের অশ্রু লাগিয়ে একটি ছেলে ফড়িং ধরার জন্যে দৌড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে কেবল দৌড়াচ্ছে। আর কতদূর গেলে সেই যোগ্যতা তার অর্জিত হয়ে যাবে। গৎবাঁধা একটা জীবন আমাকে হয়তো এর চেয়ে বেশি খুব করে আকর্ষণ করেনি। এই আনন্দ মগ্ন করে রাখে। কিছুটা সময় আমাকে টানে। সময় কী সত্যিই ধরা যায় এই বহুমাত্রিক জীবনে?

খানিকটা উঁচুতে—সবুজাভ নারিকেলপাতারা বাতাসের চরিত্রে বেশ মানিয়ে নিয়েছে নিজেদের। নারিকেলপাতারা যেন একাকী বেহালা। নিদ্রার ভেতর যে-সুর পাখিরা অনেক দূর পর্যন্ত নিযে যায়। সুরের সৌন্দর্য বুঝেছিলেন লুডভিগ ভ্যান বেথোভেন। আমি সুরের সৌন্দর্য বুঝি না। তবে বুঝি ঝিঁঝিপোকার ডাকে আশেপাশে যখন নীরবতা নামে, তখন সুরের আবেশে কিছু পাতা ঝরে পড়ে ঘাসে, ছায়ায়। ছায়ার ভেতর আমি কিছু বনটমেটো গাছ দেখলাম। যেন শস্যফলে ছিঁড়ে গেল আলাপচারিতা। আর দূরে শস্যঘ্রাণে ফসলের মাঠ।

মা বারান্দায় বসে মালা হাতে নিয়ে হরিনাম জপ করছেন। মুখাবয়বে সে-সময় কোনো বিশেষ ভাবের ছোঁয়া ছিল না। মালার বড় দানাটি হলো ‘মেরু’। জপ শুরু করার সময় ডান হাতের মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ (অঙ্গুষ্ঠ) দিয়ে মেরুর পরের দানা থেকে জপ শুরু করতে হয়। পুরো মালা ঘুরে যখন আবার মেরুর কাছে পৌঁছাবে, তখন মেরু লঙ্ঘন না করে (দানাটি পার না হয়ে) মালা ঘুরিয়ে উল্টো দিক থেকে আবার জপ চালিয়ে যেতে হয়।

আমাদের বাড়ির পাশে একজন মহিলার নাম হ্যালো। আমরা ছোট থেকেই তাকে এমন দেখে আসছি। মা তাকে ডাকছে—হ্যালো, কি রে হ্যালো, গাঁও করতে যাস নাকি? মানে, গ্রাম ঘুরে ভিক্ষা করে চাল তোলে সে। আকাশ ভেঙে উঁকি দেয়া রোদে ভাবি, হ্যালো কী অদ্ভুত নাম! আবুল হাসান বলেছিল : ডাকনামগুলা জীবন ও যত্নের সীমান্ত।


শুভ্র সরকার রচনারাশি

শুভ্র সরকার
শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you