গল্ফগ্রিনের মাঠ
গল্ফগ্রিনের সেন্ট্রাল পার্কে সেদিন লোক ভেঙে পড়েছিল। মঞ্চে রূপম, সিধু, কৌশিক, পটা, সায়ন, তিমির, শিলাজিৎ ও আরও অনেকে। কলকাতার ব্যান্ডপাড়ায় এদের নাম সাধারণত আলাদা আলাদা দলের সঙ্গে জোড়া থাকে। সেদিন কোনো দলের নাম ছিল না। যাদের মনোমালিন্যের কথা লোকে বহুদিন ধরে আলোচনা করে, তারাও একমঞ্চে গাইছিলেন, বাজাচ্ছিলেন, মাথা ঝাঁকাচ্ছিলেন। নিচে দর্শক পাগলের মতো নাচছিল।
সবার মুখে একটাই নাম, কুট্টি।
কুট্টি মজুমদার তখন আর নেই। ২০১৪ সালে হঠাৎ হার্টফেল করে মারা যান, বয়স ছিল ছেচল্লিশ। আজ তাঁর বারো বছরের মৃত্যুবার্ষিকী। এই বারো বছরে কলকাতার গানের বাজার অনেক বদলেছে। শ্রোতারা এখন গান শোনেন স্ট্রিমিঙে, নতুন ব্যান্ডের নাম নতুনদের মুখে মুখে ফেরে। তবু ওই মাঠের ছবিটা মনে থেকে যায়, কারণ একটা প্রশ্ন তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। একজন মানুষ চলে গেলে এমন কী রেখে যান যে এতগুলো আলাদা মানুষ আবার এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়?
এই লেখায় সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। উত্তরটা আমার কাছে একটা সুতোর মতো। কুট্টির হাতে সুতোটা ছিল, আর তিনি চলে যাওয়ার পরেও সেটা ছেঁড়েনি।

বন্ধুদের ব্যান্ড
১৯৯১ সালে কুট্টি কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে শুরু করেন বাংলা ব্যান্ড ‘অভিলাষা’। দলে ছিলেন রাজা, রনি, তিন্নি, বাম্পি, কমলেশ, সুমিত, ধ্রুব, আর ভোকালে কুট্টি নিজে। নামগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, এটা কোনো বাছাই করা তারকা-দল নয়। বন্ধুরা মিলে শুরু করেছিলেন, যেমন বহু ব্যান্ডের শুরু হয়।
সময়টা খেয়াল করার মতো। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের মহীনের ঘোড়াগুলি যে-পথ খুলে দিয়ে গিয়েছিল, সেই পথে তখন হাঁটার লোক বেশি ছিল না। মহীনের ঘোড়াগুলির পরের সময়ে যেসব ব্যান্ড প্রথম সারিতে উঠে এসেছিল, অভিলাষা ছিল তাদের একটি। পথিকৃৎ একবার রাস্তা কেটে দিলে সেটা চালু রাখার কাজটাও কম জরুরি নয়, আর অভিলাষা সেই কাজটাই করেছিল। তাদের পরের প্রজন্মের ব্যান্ডগুলো যে নিজেদের জায়গা পেয়েছে, তার পেছনে এই ধারাবাহিকতার একটা ভূমিকা আছে।

গাছতলার মঞ্চ
অভিলাষার গল্পের সবচেয়ে জমজমাট অংশটা ১৯৯৮ সালের। সেবার গান মেলায় ইয়ুথ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্টের দিক থেকে অনুষ্ঠানে বাধা এল। অনুমতি আটকে রেখে রক গানকে ঠেকানোর চেষ্টা সেই সময়েও নতুন ছিল না।
অভিলাষা কিন্তু বসে থাকেনি। গাছের তলায় নিজেদের মঞ্চ বেঁধে নিয়ে তারা সেখানেই পারফরম্যান্স শুরু করে দিলো। ভিড় উপচে পড়ল। বড় মঞ্চ না পেলেও মাইক আর কয়েকটা যন্ত্র হাতে থাকলে গান শ্রোতা টেনে আনতে পারে, সেদিন সেটা আবার প্রমাণ হয়ে গেল।
পরের বছর পরিস্থিতি উল্টে গেল। রাজ্য সরকার বুঝল, এভাবে দমিয়ে রাখা যাবে না। যে-অভিলাষাকে আগের বছর বাধা দেওয়া হয়েছিল, এবার তাকেই আমন্ত্রণ জানিয়ে পারফর্ম করতে বলা হল। অভিলাষা সেই অনুষ্ঠানের পারিশ্রমিক নিজেদের কাছে রাখেনি, পুরো টাকাটা তুলে দিয়েছিল আর্মি ওয়েলফেয়ার ফান্ডে।
এখানে থেমে একটু ভাবা দরকার। আগের বছর যারা বাধা পেয়েছে, পরের বছর তারা সম্মানিত অতিথি। ইচ্ছে করলে তারা একটু গর্ব দেখাতে পারত, এমনকি পারিশ্রমিকের টাকাটাও নিতে পারত। তারা সেসব করেনি। রকের বিদ্রোহ যে সবসময় চেঁচামেচির চেহারায় আসে না, অভিলাষার এই আচরণ তার একটা ভালো উদাহরণ।

‘বাংলা ব্যান্ড’ শব্দটা
রূপম ইসলামের একটা কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করার মতো। তাঁর মতে, ‘বাংলা ব্যান্ড’ শব্দটা শুরু করেছিলেন অভিলাষার কুট্টিদা।
একটা শব্দ কে চালু করল, এ নিয়ে সাধারণত কেউ মাথা ঘামায় না। কিন্তু কোনো ঘরানা নিজের নাম পায় শব্দের মধ্য দিয়েই। যাঁর দেওয়া শব্দে একটা গোটা ঘরানাকে ডাকা শুরু হয়, তিনি সেই ঘরানার অভিভাবক হয়ে যান, কেউ তাঁকে সেই পদ দিক বা না দিক।
রূপম আরও বলেছেন, কুট্টিদা বয়সে অনেক সিনিয়র হয়েও ছিলেন বন্ধুস্থানীয়। এই কথাটার ওজন আছে। বয়সে বড় হলে অনেকেই দূরত্ব তৈরি করে ফেলেন। আবার ছোটদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে কেউ কেউ সম্ভ্রম হারান। কুট্টি দুটোই সামলাতে পারতেন।
গায়ক আগে না ব্যান্ড আগে, এই বিতর্ক বাংলা ব্যান্ডের জগতে অনেক পুরনো। ভোকালিস্টের জন্য মঞ্চে আলাদা জায়গা রাখার ব্যাপারে দলের ভেতরে চাপা টান থাকেই। কুট্টির ক্ষেত্রে সেই বিতর্ক জমত না, কারণ তিনি নতুন-পুরনো, বড়-ছোট সবার সঙ্গে মুহূর্তে মিশে যেতে পারতেন। ক্যাকটাস-এর সিধু তাঁকে মনে রেখেছেন অসম্ভব প্রাণচঞ্চল আর সংগীতমুখর একজন মানুষ হিসেবে। যিনি গানের মধ্যে আর মানুষের মধ্যে ফারাক রাখেন না, তাঁকে লোকে এভাবেই মনে রাখে।

বাউলের সঙ্গে ব্যান্ড
অভিলাষার আরেকটা কাজ আজকের শ্রোতার কাছে হয়তো কম পরিচিত। কার্তিক দাস বাউল নিজের সহজ ভাষায় বলেছেন, কলকাতায় বাউলকে নিয়ে ব্যান্ডের সঙ্গে প্রথম কাজ করেছিল অভিলাষা, আর কুট্টির হাত ধরেই তাঁর ব্যান্ডজীবনের শুরু।
একতারা আর ইলেকট্রিক গিটার প্রথম দেখায় দুটো আলাদা জগতের জিনিস। একটা গ্রামের আখড়ার, আরেকটা শহরের মঞ্চের। কুট্টি এই দুই জগতের মাঝখানে যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন, তাও কোনো বড় ঘোষণা ছাড়াই। বাংলা গানের লোকধারা আর বাংলা রকের আধুনিকতা যে পরস্পরের শত্রু নয়, এই কাজ থেকে সেটা পরিষ্কার হয়েছিল। যিনি স্বভাবে বন্ধুত্বপ্রিয়, তিনি গানের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষকে এক আসরে বসিয়ে দেবেন, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

দশদিনের অ্যালবাম
কুট্টি চলে যাওয়ার পর তাঁর বন্ধুরা ঠিক করলেন, তাঁর স্মরণে একটা বড় কন্সার্ট হবে। নাম রাখা হলো ‘হাওয়ায় মেলেছি পাখনা’।
অভিলাষার প্রথম দিকের সদস্যরা তখন নানা দিকে ছড়িয়ে গেছেন। অনেক বছরের পুরনো দল ভেঙে গেলে আবার একসঙ্গে বসা সহজ হয় না। তবু তারা মাত্র দশদিনে একটা গোটা অ্যালবাম রেকর্ড করে ফেললেন। কন্সার্টের রিহার্সালও হলো কয়েক দিনের। তবু খবর ছড়িয়ে পড়ল আর কন্সার্ট দারুণ সাড়া পেল।
সময় এত কম থাকা সত্ত্বেও কাজটা দাঁড়িয়ে গেল, এর পেছনে আমি দক্ষতার চেয়ে তাগিদকে বড় কারণ মনে করি। যে-কাজ ভালোবাসা থেকে আসে, তাতে সময়ের চেয়ে মনের দরকার বেশি পড়ে। সংগীতপরিচালক রাজা নারায়ণ দেব, লক্ষ্মীছাড়ার গৌরব চট্টোপাধ্যায় গাবু, ক্যাকটাস-এর পটা, ঈশাণ-এর সায়ন, পৃথিবীর কৌশিক, সবাই প্রায় একই কথা বলেছেন। কলকাতায় গত দশ-বারো বছরে সব ব্যান্ডের এভাবে এক জায়গায় জড়ো হয়ে একসঙ্গে গান-বাজনা করার ঘটনা ঘটেনি। সবাই এসেছিলেন শুধু ভালোবাসার টানে, আর একের পর এক গেয়েছিলেন অভিলাষার গান।
একটা বিষয় আলাদা করে বলার মতো। মঞ্চে যারা উঠেছিলেন, তাদের প্রত্যেকের নিজের ব্যান্ড আছে, নিজের গান আছে, নিজের ভক্ত আছে। সেদিন তারা নিজেদের গান গাননি। সবাই গেয়েছিলেন কুট্টির দলের গান। কাউকে সম্মান জানানোর জন্য এর চেয়ে বড় কিছু আমার জানা নেই।

বাংলাদেশের শোক
শোকের খবর শুধু কলকাতায় আটকে থাকেনি। বাংলাদেশ থেকে এলআরবির আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, কুট্টির প্রাণখোলা স্বভাবের জন্য তিনি তাঁর খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন। আরেক বাংলাদেশি ব্যান্ড ‘ব্ল্যাক’ শোকবার্তা পাঠিয়েছিল।
আজ এই লাইনগুলো লিখতে বসে মনে পড়ছে, আইয়ুব বাচ্চুও আর নেই; ২০১৮ সালে তিনিও চলে গেছেন। যিনি একপারের শোকবার্তা লিখেছিলেন, তিনি এখন অন্যপারের স্মরণের বিষয়। বাংলা রকের ইতিহাস অনেকটা এমনই, একজন আরেকজনকে মনে রাখে, তারপর সেই মনে-রাখা মানুষটাও কারও স্মৃতিতে ঢুকে যান। কাঁটাতার এখানে সুরের পথ আটকাতে পারে না।

আজকের কুট্টি
নতুন প্রজন্মের কাছে অভিলাষা হয়তো খুব পরিচিত নাম নয়। স্ট্রিমিঙের তালিকা খুললে প্রথমেই যে-নামগুলো চোখে পড়ে, এটা সেগুলোর একটা নয়। কিন্তু ইতিহাস শুধু জনপ্রিয়তার হিসেবে লেখা হয় না। পশ্চিমবঙ্গের রক-ইতিহাসে কুট্টির নাম স্মরণীয় হয়ে আছে, আর তার কারণ শুধু গান নয়। তাঁর স্বভাবই এতগুলো অভিমানী, ব্যস্ত, ভিন্ন ভিন্ন দলের মানুষকে একটা মাঠে এনে দাঁড় করিয়েছিল।
শুরুর প্রশ্নে ফিরি। একজন মানুষ চলে গেলে কী রেখে যান? কুট্টি রেখে গেছেন বন্ধুত্ব, গান, আর এই বিশ্বাস যে ব্যান্ড শুধু বাজনদারের দল নয়, একটা সম্পর্কও। তিনি যখন ছিলেন, সুতোটা তাঁর হাতে ছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর বাকিরা সেটা নিজেদের হাতে তুলে নিলেন, আর কয়েক দিনের মধ্যে একটা পুরো অ্যালবাম আর একটা পুরো মাঠ জোড়া লেগে গেল।
আজ ছয়ই অক্টোবর। কলকাতার কোনো ঘরে হয়তো কেউ অভিলাষার পুরনো রেকর্ড চালাবেন, হয়তো চালাবেন না। তবু যে-গাছতলায় একদিন মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল, যে-মাঠে একদিন সব ব্যান্ড এক হয়েছিল, সেই জায়গাগুলোর হাওয়ায় এখনও একটা নাম ভেসে থাকে, কুট্টি।
- গাছতলা থেকে গল্ফগ্রিন : কুট্টি মজুমদার ও অভিলাষা || মাহমুদ নেওয়াজ জয় - October 7, 2026
- ম্যাডোনায় মৃত্যুচিন্তা / ২ - October 1, 2026
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026

COMMENTS