তপন চৌধুরী, প্রিয় নব্বই ও নেত্রকোনা || আরেফিন টিটো

তপন চৌধুরী, প্রিয় নব্বই ও নেত্রকোনা || আরেফিন টিটো

শেয়ার করুন:

আমাদের প্রিয় সংগীতশিল্পী তপন চৌধুরী ১৯৯০ সালে নেত্রকোনায় এসেছিলেন গান গাইতে। সেইসময়কার আমাদের নেত্রকোনার বন্ধুদের আমন্ত্রণে এসেছিলেন তিনি। তখন আমরা প্রায় সবাই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী। সেই সময় পর্যন্ত নেত্রকোনায় কোনো ব্যান্ডসংগীতের বড় তারকা শিল্পীর পা পড়েনি।

তো, আমরা বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিলাম ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকা সবাই যার যার বাসার বাবামার কাছ থেকে একটু আগেই নিয়ে নিব। ফরম ফিলাপের টাকায় তখনকার সময়ের দারুণ ক্রেজ তপন চৌধুরীকে নেত্রকোনায় আনতে হবে। আমাদের বয়স তখন কত হবে, এই ১৭/ ১৮; এর বেশি নয়।

আমাদের এই প্ল্যান তখন যাকেই বলি হেসে উড়িয়ে দেন। পড়লাম মহা মসিবতে। এর মধ্যে আমরা অনেক বন্ধুই তখন বাসা থেকে অগ্রিম ফরম ফিলাপের টাকা সংগ্রহ করে ফেলেছি। কেউ ১০০০ টাকা কেউ ৫০০ টাকা এভাবে মিলিয়ে প্রায় ১৬০০০ টাকা জমা হয় আমাদের। আমি ছিলাম টাকা সংগ্রহের ক্যাশিয়ার। টাকা হাতে, কিন্তু যার গান শুনতে চাই তার সাথে যোগাযোগ করব কীভাবে? তখন ঢাকা শহরও আমরা বন্ধুরা কেউ ভালো করে চিনি না। একা কিংবা দল বেঁধে তখনও কেউ ঢাকা যাইনি।

তো, আমাদের এক বন্ধু মরহুম মোশতাক আহমেদ ভুট্টোর বাসা ছিল আমাদের সাতপাই রেলক্রসিং এলাকায়। তার বোনজামাইয়ের নাম ছিল বাঁশিশিল্পী বারী সিদ্দিকী। তিনি তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের নবীন বংশীবাদক। আমরা কয়েক বন্ধু বাসায় কাউকে না বলেই ভুট্টোকে সাথে নিয়ে অচেনা ঢাকা শহরে উপস্থিত হলাম। গিয়ে উঠলাম বন্ধু বোনজামাই বারী সিদ্দিকীর বাসায়।  উনি তো সব শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

কিন্তু আমাদের নাছোড়বান্দা মনোভাবে পরাস্ত হয়ে উনি গেলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন অফিসে।  তখন তো মোবাইল ছিল না, টেলিফোনও ছিল যক্ষের ধনের মতো।  বারীভাই কীভাবে জানি কার কার সাথে যোগাযোগ করে তপন চৌধুরীর বাসার ঠিকানা নিলেন।  আমরা বন্ধুরা সহ ওইদিন সন্ধ্যায় তপন চৌধুরীর বাসায় গেলাম।  তপন চৌধুরী আমাদের বয়স এবং রূপকল্প শুনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। আমরা পকেট থেকে ১৫০০০ টাকা বের করে উনার সামনে ধরলাম।  উনি কি করবেন বুঝতে পারতেছিলেন না। উনি তখন বারী সিদ্দিকী ভাইকে বললেন উনার সঙ্গীসাথি সহ ৫ জন প্লাস ইনস্ট্রুমেন্ট আর মাইক্রোবাস ভাড়া সহ ৩২০০০ টাকা খরচ পড়বে।  তখন উনি সারা বাংলাদেশে স্টেজ শে করে বেড়ান ৪০/৫০ হাজার টাকায়।  উনি আমাদের বয়সের কথা বিবেচনা করে ৩২০০০ টাকায় রাজি হন এবং দিনতারিখ দিয়ে দেন।

আমরা তো মহাখুশি।  ফিরে এলাম বিশ্ব জয় করে নেত্রকোনায়। এখন অনুষ্ঠান কোথায় হবে…? বাকি টাকা কীভাবে জোগাড় হবে…? আমরা বন্ধুর সংখ্যা আরও কিছু বাড়ালাম। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থল…সেটা কোথায় হবে…?

তো, সেইসময় নেত্রকোনা হীরামন  সিনেমা হল অনেকমাস যাবৎ বন্ধ ছিল পুনর্গঠনের জন্য। হীরামন  সিনেমা হলের মালিক মরহুম কাদির কাকার ছেলে শেখ সুলতান তপু ছিল আমাদের বন্ধু।  বন্ধুর মাধ্যমে তার বাবার দ্বারপ্রান্ত হয়ে অনেক কাকুতিমিনতির পর সেই বন্ধ জরাজীর্ণ হীরামন সিনেমা হল বন্দোবস্ত পেলাম।  পুরো সিনেমা হলে একটা লাইটও ছিল না। আমরা সারাশহরে তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি যাই তপন চৌধুরীর আগমনী অনুষ্ঠানের টিকেট ছাপিয়ে…টিকেট বেচতে।

আমাদের বয়সের কারণে মানুষ খুব বেশি আশ্বস্ত হতে পারত না। আমাদের টিকেটের মূল্য ছিল ১০০ টাকা ভিআইপি ৫০ টাকা ফার্স্ট ক্লাস ৩০ টাকা ডিসি ক্লাস। ভিআইপি টিকেটগুলো আমরা সিনেমা হলের একদম সামনের সারির সিটগুলোকে বরাদ্দ করলাম। যারা আমাদের টিকেট কিনত না তাদের বাড়ির উঠানের বাল্বগুলো খুলে নিয়ে আসতাম তাদের অগোচরে সিনেমা হল আলোকসজ্জিত করতে। সারাশহরে ব্যাপক মাইকিং করেও কাঙ্ক্ষিত টিকেট বিক্রি করতে পারলাম না। তখন নিজেদের বাসাবাড়িতে টিকেট পুশিং সেলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সব মিলিয়ে ২৫০০০ টাকার মতো সংগ্রহ করলাম। দিনক্ষণ যখন উপস্থিত হলো সব শিল্পীদের নিয়ে আমরা আমাদের সাতপাই কলেজ রোডের বাসায় আহারের ব্যবস্থা করলাম বাবামাকে বলেকয়ে।

তো, তপন চৌধুরী তার সঙ্গীসাথি সহ আমাদের বাসায় ঠিক সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে উপস্থিত হয়ে দুপুরের লাঞ্চ করলেন।  এদিকে  সারাশহর বুঝতে পারল আসলেই এই বাচ্চা ছেলেগুলো তপন চৌধুরীকে নেত্রকোনায় উপস্থিত করতে পেরেছে। আমার বাসা এবং হীরামন সিনেমা হল তখন লোকে লোকারণ্য। রাত ৮টায় যখন তপন চৌধুরী সিনেমা হলে উপস্থিত হলো তখন হীরামন সিনেমা হল মানুষের ধাক্কাধাক্কিতে ভেঙে পড়ার অবস্থা এবং প্রায় সবাই বিনা টিকেটে। আমাদের অবস্থা একদম নাভিশ্বাস বেরিয়ে যাবার মতো।  টিকেটের লোকজন সিনেমা হলে ঢুকতে পারছিল না। আমাদের বয়সের কারণে তখন আমরাও এই সারাশহরের উপচে-পড়া ভিড় সামাল দিতে পারতেছিলাম না। নেত্রকোনা সদর থানা পাশে হওয়াতে থানার সকল পুলিশ এসে কোনোরকমে অনুষ্ঠান শুরু ও গান শোনার ব্যবস্থা করা যায়।

শেষমেশ আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে তপন চৌধুরী ও তার ব্যান্ড দারুণ পারফর্ম করে। রাত ১১টা অবধি গান গেয়ে শেষ হলো অনুষ্ঠান। তপন চৌধুরী সহ উনাদের সবাইকে নিয়ে থানা রোডস্থ বিখ্যাত আলিফ খাঁ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে রাতের খাবার খাইয়ে বাকি পাওনা পরিশোধ করে বিদায় দেই।

এখন হিসাব মিলানোর পালা। আমরা বন্ধুরা দিয়েছিলাম সবমিলিয়ে ১৬০০০ টাকা। সব খরচের পর হাতে ছিল ৭/৮ হাজার টাকা ।  যে বন্ধু ১০০০ টাকা দিয়েছিল সে ফেরৎ পেয়েছে ৫০০ টাকা, যে দিয়েছিল ৫০০ টাকা সে ফেরৎ পেল ২৫০ টাকা। এখানে প্রথমেই যে-কথাটি বলা হয়নি সেটা হলো, আমরা ভেবেছিলাম তপন চৌধুরীকে নেত্রকোনায় গান গাওয়াতে আনতে পারলে আমরা অনেক টাকা লাভ করতে পারব। আমরা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকা সবাই ফেরৎ পাবো এবং কিছু বাড়তি টাকাও উদ্যোক্তা হিশেবে আমাদের পকেটে আসবে, যে-টাকায় তখনকার সময়ের কাঙ্ক্ষিত জিন্স প্যান্ট কিংবা গুলিস্তানের নাইকি ক্যাডস হয়ে যাবে একজোড়া করে। সেসব কিছুই তো হলো না, তার বদলে জুটলো ফরম ফিলাপের জন্য যৎসামান্য টাকা ও পরিবারের দৌড়ানি ও চোখরাঙানি।

দিনশেষে আমাদের অনেকের পরীক্ষার প্রস্তুতি ঠিকমতো হয়নি এবং পরীক্ষা স্বাভাবিক সংগত কারণেই খারাপ হয়। আমি তো পরীক্ষাই দিতে পারিনি। আমি পড়তাম আনন্দ মোহন কলেজে। বাবা অনেক শখ করে ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করতে নেত্রকোনায় না পড়িয়ে আনন্দ মোহন কলেজে ভর্তি করেছিলেন। পরীক্ষা ড্রপ দিয়ে পরবর্তীকালে আমাকে বাবার কর্মস্থলে গিয়ে থাকতে হয়, সেইসময় আমি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর চলে যাই। সেখানে আরও একবছর প্রিপারেশন নিয়ে পরবর্তীকালে এসে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করি।

এই হলো আমাদের ছেলেবেলার বন্ধুদের প্রথম দিকের অ্যাডভেঞ্চারের অনুপম কাহিনি।


আরেফিন টিটো

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you