রচনাটি রিপ্রিন্ট। পুনর্মুদ্রণ। তথ্যটা জানায়া তারপরে দেড়-দুইটা বাক্য বলবার নিয়তে এই ইন্ট্রোডাক্টোরি টীকার অবতারণা।
আগে এই লেখাটা ছাপানো বইপত্রিকা পড়ার যুগে ম্যাগাজিনে দেখে থাকবেন অনেকেই। বিশেষত সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় জীবনাবসানের অব্যবহিত পরে বেরোনো পত্রপত্রিকায়। কিন্তু কোথায় ছাপার অক্ষরে পড়েছিলেন তা আজ আর ইয়াদ থাকবার কথা না। কারণ, সন্দীপন ইন্তেকাল করেছেন কুড়ি-একুশ বছর আগে, দুইহাজারপাঁচ সালে। সেইসময় তারে নিয়া ভারতীয় বাংলা কাগজগুলায় বিশেষ কিছু সংখ্যা প্রকাশিত হয়। আমরা এখানে লেখাটা গ্রহণ করেছি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় নামে ফেইসবুকে সচল একটা ফ্যানপেইজ থেকে। সেখানে এইটা আপ্লোডের ডেইট দুইহাজারতেইশের জানুয়ারি। ইয়াদ রাখব, তখনও গ্যুগল লেন্স দিয়া ইমেইজ টু টেক্সট কনভার্শনের সুবিধা চালু হয়নি। যিনি জিনিশটা আক্ষরিক কম্পোজ করেছেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি। কিউরিয়াস ভিয়্যুয়ার হলে ফ্যানপেইজের ইমেইজ সেকশন ভিজিট করে দেখবেন। ওয়ার্থ ওয়াচিং, মনে হবে। অ্যাডমিনকে থ্যাঙ্কস, গোছানো পেইজটার জন্যে।
এই রচনাটা যাকে কেন্দ্রে রেখে লেখা হয়েছে, আল মাহমুদ, একনামেই পরিচয় তার। কবি তিনি বাংলাদেশ ও বাংলাভাষার। তিনি মৃত্যুবরণ করেন দুইহাজারউনিশে। এবং রচনাটি লিখিত ও প্রকাশিত হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। লেখার প্রেক্ষাপট যদিও গোল্ডেন সেভেন্টিওয়ান।
চোখ কোঁচকায় একটা তথ্যে, ফেইসবুকের পোস্টে এই গদ্যের শেষে ‘অগ্রন্থিত’ বলা হয়েছে। এখনও! রচনাটা আপ্লোড করা হয়েছে তেইশে। এর কম করে হলেও পঁচিশ বছর আগে লেখাটা পাব্লিশড পত্রিকান্তরে। এতকাল ধরে এমন রচনা অগ্রন্থিত রয় কেমন করে! বেখেয়ালে? অ্যানিওয়ে। ফেইসবুকে এহেন প্রকাশকালে এর সংগ্রহস্থল/সংগ্রহসূত্র উল্লেখ করলে বেহতর হতো।—জিপিডেস্ক ২০২৬

গ্রহান্তরের মানুষ || সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
আল মাহমুদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকার প্রধান বার্তাসম্পাদক সন্তোষকুমার ঘোষের ঘরে। ওই সময়ের আনন্দবাজারে ওই একজনের কক্ষই আমার জন্য ছিল অবারিত। দ্বাররক্ষীরা প্রায়শই আমাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে বেরুতে দেখত। যে-জন্য ঢোকার সময় বাধা দিত না।
মাত্র কিছুদিন আগেই সন্তোষদা ওই কাগজের দিল্লি অফিস থেকে কলকাতায় এসেছেন। জোর বরাত। এসেই পেয়ে গেছেন একখানি আস্ত যুদ্ধ। এমন সুযোগ তো সাংবাদিকের পেশা-জীবনে একটাই যথেষ্ট, আর, কে না-জানে, উনি তার পূর্ণ সদব্যবহার করেছিলেন। চিফ নিউজ এডিটরের পেল্লায় ঘরটি ছিল তিনতলায়, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। তাঁর সামনে বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিল। তার ওপর বিছানো মস্ত ব্রডশিট। তার ওপর ছক কেটে সন্তোষদা পরের দিনের কাগজের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে দিচ্ছেন। হাতে, রণক্ষেত্রে সেনাপ্রধানের মত, লম্বা ছড়ির বদলে, উঁচনো লাল-নীল পেন্সিল। তাঁকে ঘিরে নাইট এডিটর, চিফ সাব ও অন্যান্যরা। তারা চলে যাবার পর আমি দেখলাম, এ-ঘরে আরো একজন ছিল। খুবই কৃশকায়, অতি ছোটখাটো, এক তাম্রাভ বালক, যার যুবাকালও পেরিয়ে যাচ্ছে। আর তাই না শুনে হঠাৎ টনক নড়েছে ঈশ্বরের, আর তাই তড়িকঘড়িক কিছু দাড়ি-গোঁফ লাগিয়ে দিয়েছেন তার মুখে, যাকে গোঁফদাড়ি না বলে ঈশ্বরের ভ্রম-সংশোধনও বলা চলে। ধরা-পড়া গ্রহান্তরের মানুষের মত সে কাচুমাচু হয়ে বসেছিল। আমি তাকাতেই ঈষৎ নড়েচড়ে বসল। তাকে মুক্তিযোদ্ধার মত মোটেই দেখাচ্ছিল না।
সেটা ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হতে চলেছে। উত্তর দ্বিগ্বলয় থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী তিস্তা-তোর্সার মত হুড়মুড় করে নেমে আসছে। যদিও বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে আসছে মার্কিন ৭ম নৌবহর।

২.
এখানে বর্তমান কাহিনির উপস্থাপকের তৎকালীন স্বারূপ্য সঙ্কটটিও কিঞ্চিৎ উন্মোচনের অপেক্ষা রাখে। কবি কেন দেশত্যাগী হয়েছিলেন তা আমার জানা নেই। তবে কোন পুন্নামে এসে পড়েছিলেন সে সম্পর্কে সম্যক জানকারি আছে।
কমলকুমার মজুমদারের ভাষায়, সে সময় ‘কলিকাতার বাঙালত্ব জাগ্রত হইয়াছে।’ এদিকে বর্তমান কাহিনির এই অধম ভগ্নদূত হলেন গিয়ে কলকাতার ভূমিপুত্র। তথা, ঘ্যাম ঘটি। আমাদের বাড়িতে ঢাকা থেকে কখনো চিঠি আসেনি। শিয়ালদহ দিয়ে দার্জিলিং ছাড়া কোথাও যাওয়া যায় বলে আমরা জানি না। আমার ফুটবল প্লেয়ার দাদা কিশোরীমোহন (কে. চ্যাটার্জি, এরিয়ান্স)—আমরা যুদ্ধের সময় রাঁচিতে থাকাকালীন—রতন টকিজের ম্যানেজারের মেয়ে মনুদির সঙ্গে তুমুল প্রেম করার পর ওরা বরিশালের বাঙাল শুনে পিছিয়ে আসেন। এই তো আমাদের বংশ-পরিচয়।
এহেন গোদগ্রস্ত পায়ের ওপর বিস্ফোরকের প্রায় পূর্ব দিগন্ত থেকে নেমে এল ৬০ লক্ষ মানুষ—ইতিমধ্যে, ২৪ বছর ধরে আমাদের জমিজমা, আমাদের ঘরবাড়ি, আমাদের চাকরিবাকরি প্রায় সবই দখল—ভুল বললাম জবরদখল করে নিয়ে কলকাতার নিষ্ক্রিয় ও নিশ্চিত্ত বাবু কালচারের একেবারে এইসি-কি-তেইসি করে ছেড়েছে। বিধান রায়ের আমলে ক্যাবিনেটে পূর্ববঙ্গের লোক ছিল মাত্র একজন (পি. ঠাকুর)। বামফ্রন্ট আমলে ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। বস্তুত, ‘জবরদখল’ বলে কোনো শব্দ এতদ্দেশীয়দের জানা ছিল না। ওসব সুন্দরবনের বাদা অঞ্চলে আরণ্যকদের মধ্যে এখনও প্রচলিত ছিল বলে তারা জানত। কেউ কেউ বলতে পারেন ওরা ধর্ষিত আর লুণ্ঠিত হতে হতে এসেছিল। দেশ বিভাগের জন্য কি ওরা দায়ী? ওরা কি সহানুভূতি পেতে পারে না? ঠিক। এবং পেয়েও ছিল।
আমি শুধু বলতে চাইছি, ওরা মড়মড় শব্দে আমাদের মেরুদণ্ড ভাঙতে ভাঙতেও এসেছিল। এটাও কি সহানুভূতি পেতে পারে না? তো, এই পরিপপ্রেক্ষিতে এসে গেল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বা মুক্তিযোদ্ধারা। তখন ওঁদের আর পায় কে। প্রতিদিন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংবাদ ও ভাষ্যপাঠে মুগ্ধ হতে হতে, খাঁটি ঢাকাই ভাষায় সদর স্ট্রিটের স্বাধীন বাংলাদেশ রেডিওয় ‘কামালের কামাল’ শুনতে শুনতে আর ‘বড়দি, তোমার সঙ্গে বুড়িগঙ্গায় আবার সাঁতার কাটব’ জাতীয় শতশত গবেট কবিতা পড়ে পড়ে ৩৪ বছর ধরে রপ্ত করা বাঙালি ভাষা ছেড়ে অনেকেই ঘরে-বাইরে ফের বাঙাল ভাষায় কলকাকলি শুরু করে দিলেন। মনে করলেন, এবার আমরা দ্যাশে ফিরুম। তাদের সে আশা পূর্ণ হয়নি। ফরাসি বিপ্লব অনেক করেছিল। রাজার শিশুপুত্র ও কন্যাকে ল্যাংটো করে ছেড়ে দিয়েছিল রাস্তায়। যে, দ্যাখো, রাজপুত্র আর রাজকন্যা বলে কিছু হয় না। বিপ্লব ঈশ্বরের প্রতিনিধি রাজার মুণ্ডচ্ছেদ করেছিল গিলোটিনে। তখন এই মর্মে, গিলোটিনের চারপাশে পোস্টার পড়েছিল কয়েকটা। রাজার রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছিল। ‘ঈশ্বরের প্রতিনিধি মৃত। এবার ঈশ্বরকে গিলোটিনে চড়াও।’ এই একটা ব্যাপারে পৃথিবীর সব বিপ্লব ব্যর্থ। কেউ পারেনি।

৩.
এ সময় কমলদা আমাদের চিঠির পর চিঠি লিখতে থাকেন। আমাকে লিখলেন…
ইদানীং কলিকাতার তথা পূর্ববঙ্গের অবস্থা আমাকে একাধারে বিচলিত ও বিমর্ষ করিয়াছে; নিশ্চয় তোমাকেও স্তম্ভিত করিয়া থাকিবে; যদিও তুমি বা আমি কেহই বাঙাল নহি। এখন শহরের বাঙালত্ব জাগ্রত হইয়াছে, সকলেই বিশেষত পূর্ববঙ্গজরা এ হেন হতভাগ্য সময় লইয়া কিছু রোজগার করিতেছে আর্থিক ও জনপ্রিয়তা! কাহারও মনে দুঃখের লেশমাত্র নাই, পদ্মার ওদিকে ভারি মজা হইতেছে, এই সুযোগ। প্রতিটি দৈনিকে মুরগীর মাংস খাওয়ার গল্প; মনুষ্যত্ব যে কবে ছেনতাই হইয়াছে, তাহা ভগবান জানেন। একবার ভাব, লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ হারাইতে আছে—শিশুরা হত্যা রমণীরা ধর্ষিতা, নিরীহ মূঢ় তাবিজ পরা হাত মাটিতে লুটাইয়া পড়িতেছে। কত ‘বাজান’ ‘বাজান’ বলিয়া ক্রন্দনরোল সেখানকার আকাশ বাতাসকে মথিত করিতেছে—কততে ‘আল্লারে!’ বলিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিতেছে। ইহা ধর্মযুদ্ধ! সেই ধর্মযুদ্ধ লইয়া আমরা কী করিতেছি?
ধর্মযুদ্ধই তো। ধর্মতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের কাঠামো ভেঙে জন্ম নিতে যাচ্ছে, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী বাঙালি রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্রের গায়ে ধর্মের কোনো গন্ধ থাকবে না। যাদের মন্ত্র জয় বাংলা । জাতীয় সংগীতও আমার সোনার বাংলা। যে ভাষাভূখণ্ডের রাষ্ট্রপ্রধান রবীন্দ্রনাথ। মুজিবর রহমান যে আন্দোলনের নেতা তার তো এই চেহারাই নেবার কথা—অথচ আমরা ঘটিরা একে বাঙালদের যুদ্ধ মনে করে হাত গুটিয়ে বসে ছিলাম। বায়রন যুদ্ধ করতে গ্রিসে গিয়েছিলেন—স্পেনের যুদ্ধে যোগ দেন হেমিংওয়ে—কই রাজা রাজবল্লভের বংশধর এপারের একজন বাঙালি লেখকও তো ওপারে গিয়ে মুক্তিসেনাদের পাশে দাঁড়াননি! খালি পাত-পাত কবিতা! (এখন যান একুশে ফেব্রুয়ারি-শহীদ স্মরণে! একজন যদি ফিরে এসে বললেন, ‘সে কী একখান কই রে ভাই, কুয়ার্টার প্লেটে কুলায় না।’) আর ওপার বাংলার লেখকরা, সত্যি কথা বলতে কি, অনেকেই এ-দেশে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে দিন গুজরান করেছেন। তাঁরা অনেকেই লিখেছেন, রেডিয়োতে বলেছেন নাম বদলে—যদি মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হয়! অতএব সব দিক থেকেই, অনেকখানি আমার উত্তর কলকাত্তাইয়া ভূমিপুত্র-অভিমানের জন্য আল মাহমুদকে শুরুতে আমার দারুণ ভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। বরং, যে-সব লেখক শিল্পী, লিখুন না-লিখুন, রাইফেল তুলে নিন বা না-নিন, অন্তত দেশের চরম বিপদকালে সেখানে ছিলেন তাদের অনেক ভাল লেগেছে। ঢাকা পতনের পর মতি নন্দীর তারক চ্যাটার্জি লেনের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের কত কথা কার্টুন শোনালেন হাসান আজিজুল হক। যেন চার্লি চ্যাপলিন দেখাচ্ছেন গ্রেট ডিক্টেটর। হাসতে হাসতে আমি আর মতি মরে গেলাম।
যা-ই হোক, আল মাহমুদের সঙ্গে এখানে ওখানে আমার দেখা হতে লাগল। একদিন চাং-হুয়া রেস্তরাঁয় কেবিনে কলেজ জীবন থেকে গোমাংসসেবী এই ব্রাহ্মণ সন্তানকে সে বলল, আমি পর্ক খাই না। কাকতালীয় হয়ত, আর একদিন আমরা (আর কে কে ছিল মনে নেই) ওই চাং-হুয়া থেকে বেরুতেই, আনন্দবাজারের কেউ খবর দিল ‘ঢাকার পতন হয়েছে।’ শুনে চাং-হুয়ার সামনে একটা ল্যাম্পপোস্ট ধরে তার সে কি ভেউ ভেউ কান্না। যেন ওটাই তার ফেলে আসা স্ত্রী ও সন্তান—ওটাই বাংলাদেশ।
একদিন আমাদের বরানগরের ফ্ল্যাটে এসে সে রাতে থাকল। এবং পরদিন মধ্যাহ্নভোজন করে সে উঠল। যাবার আগে আমাকে দিয়ে গেল একখণ্ড ‘সোনালি কাবিন’।

৪.
আমি এত কথা কেন বললাম? নাকে ও কানে খৎ দিয়ে এই কথা স্বীকার করার জন্য যে, বাংলাদেশকে এই দেশত্যাগীর মত করে ভালোবাসতে কেউ পারেনি—কোনো কবি, যে-ভাবে আল মাহমুদ ভালবেসেছে। রূপসী বাংলার কবিও না। বাংলাদেশের প্রতি নিবেদিত তার মিনিবুকের ১৪টি চতুর্দশপদীর একটি, আসুন, এখানে সবাই মিলে পড়ে দেখি…
যে বংশের ধারা বেয়ে শ্যাম শোভা ধরেছো, মানিনী
একদা তারাই জেনো গড়েছিলো পুণ্ড্রের নগর
মাটির আহার হয়ে গেছে সব, অথচ জানিনি
কাজল জাতির রক্ত পান করে বটের শিকড়।
আমারও নিবাস জেনো লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশে
পূর্ব পুরুষেরা ছিলো পাট্টিকেরা পুরীর গৌরব,
রাক্ষসী গুল্মের ঢেউ সবকিছু গ্রাস করে এসে
ঝিঁঝির চিৎকারে বাজে অমিতাভ গৌতমের স্তব।
অতীতে যাদের ভয়ে বিভেদের বৈদিক আগুন
করতোয়া পার হয়ে এক কঞ্চি এগোতো না আর,
তাদের ঘরের ভিতে ধরেছে কি কৌটিল্যের ঘুণ?
ললিত সাম্যের ধ্বনি ব্যর্থ হয়ে যায় বার বার
বর্গীরা লুটছে ধান নিম খুনে ভরে জনপদ
তোমার চেয়েও বড়ো হে শ্যামাঙ্গী, শস্যের বিপদ।
তার ‘সোনালি কাবিন’ পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সেই থেকেই অধুনাতন ‘উড়ালকাব্য’ পর্যন্ত তার প্রায় সমস্ত কাব্যগ্রন্থই আমার কাছে থাকে। (সৌজন্য : শাহীন আখতার)। কিন্তু ‘সোনালি কাবিন’-এর মায়াপাশ আমি আজও ছিঁড়তে পারিনি।
আমি উপরে উদ্ধৃত কবিতা সহ কবির মিনিবুক অবিলম্বে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলাম। এর পূর্বে সুনীল, শক্তি, প্রকাশ, উৎপল, মৃণাল সেন ও আমার ৬টি মিনিবুক বেরিয়েছে। সদ্যমুক্ত মা-ভূমিতে সে ফিরে যাবার আগের দিন ওর হাতে বেশ কিছু কপি ধরিয়ে দিলাম। তখন আমার মিনিবুকগুলোর কোনো-কোনোটা ১১০০০ কপিও ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্মক্ষণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রকাশিত হলেও আল মাহমুদের মিনিবুক কিন্তু ২/৩০০-র বেশি কপি স্টলে দেওয়া যায়নি। কারণ, দপ্তরির ঘর থেকে বাকি কয়েক হাজার মিনিবুক চুরি হয়ে যায়। কে চোর জানলেও কোনো এফ.আই.আর করিনি। কারণ, সে এ-ভাবে আমার প্রতি তার একটি ন্যায্য প্রতিহিংসাই চরিতার্থ করেছিল। তবে আল মাহমুদের মিনিবুকের রিপ্রিন্ট বা ফোটোকপি একাধিক স্থান থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। লণ্ডনে প্রকাশ করেছিলেন উৎপলকুমার বসু। আল মাহমুদ নিজেই নাকি বলেছে, বাংলাদেশে তার মিনিবুক বিক্রি হয়েছে রেড বুকের মত। প্রতি মিনিবুকের প্রথম পাতায় লেখা থাকত একটাই শ্লোগান ‘মাস মিডিয়ার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী’। ভেতরের পাতায় থাকত আমাদের কোনও কপিরাইট নেই। এভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠত মিনিবুক, মাস মিডিয়ার। যেখান-সেখান থেকে যখন-তখন প্রকাশিত হয়ে। ঠিকই বলেছিল আল মাহমুদ রেড বুকের মত। মিনিবুক ছিল প্রতিষ্ঠানের কুক্ষিগত শিল্পসাহিত্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শ্রেণি সংগ্রাম। মিনিবুকগুলির ফোটো কপি আজও পুনর্মুদ্রিত হয়ে চলেছে। মিনিবুকে ‘সোনালি কাবিন’ এখনও পাওয়া যায়।

৫.
আল মাহমুদ কি পাপী না পুণ্যাত্মা, রেভোলিউশনারি, বুর্জোয়া, মৌলবাদী, দেশপ্রেমিক, গৃহস্থ, স্মার্ট না গেঁইয়া? জানি না। ক্রিটিকে এর মীমাংসা করবে। আমরা শুধু জানি, তার মত দোপাটি-চাষ আর কেউ জানে না। এই বাংলা ভাষাভূখণ্ডে।
গানপারে আল মাহমুদ
গানপারে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
- গ্রহান্তরের মানুষ || সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় - October 14, 2026
- নানা || সজীব তানভীর - October 9, 2026
- লোককবি জালাল উদ্দিন খাঁ ও তাঁর গানের হকিকত || আল-আমিন সালমান - October 7, 2026

COMMENTS