ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ২১ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ২১ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

২১.
কাচের চুড়ির মতো চুরচুর করে বরফ ভেঙে এলাম স্নোবুটের তলা দিয়ে। তাও এই সক্কাল সক্কাল! সামনের লনটা একমাস আগেও নিবিড় সবুজে মাখোমাখো ছিল। ঘাসের সবুজ মখমলে পা ডুবিয়ে হাঁটা যেত। মেইপল লিফের সতেজ স্নিগ্ধ পাতারা বাতাসে হাসত আর খেলত। অজানা ফুর্তিতে এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ত। কোন ভোজবাজিতে যেন সমস্ত সবুজ আজ উধাও হয়ে গ্যাছে। শুধু জেগে আছে গাছেদের ছায়া। নাকি ছায়ার মতো কঙ্কাল? কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছেদের শাখাপত্রে ঝুলে আছে বরফের ঝুমকো। ফ্লারির নোলক। জলহীরকের নাকছাবি। এসবই হয়তো মানুষের জীবনের ছায়াচিত্র। বেঁচে থাকতে এসব কেউ খেয়াল করে, কেউবা করে না। কেউ কেউ বেখেয়ালেই হারিয়ে যায়।

খেয়াল বা বেখেয়ালের লাভালাভ নির্ধারণ করা যায় না। বা সেটা জরুরিও নয়।

তুখোড় তারুণ্যে একদা যারা প্রেমে পড়ে, ঘোরগ্রস্ত আলিঙ্গন করে, উষ্ণতার লোভে ঘর পালায়, ঘর পালিয়ে সংসার যাপন করে, আহ্লাদে শিশুদের জন্ম দেয়, এরা কি কখনো ভেবে দ্যাখে পরিশেষ কী? এই জীবনের মানে কী? কারো কি মনে থাকে জীবনের মানে হলো মৃত্যু! জীবনের পরিশেষ হলো কঙ্কাল হয়ে যাওয়া। অতঃপর মিলিয়ে যাওয়া মাটিতে। জলের একটি ফোঁটা থেকে জন্ম নেয় মানুষ। যখন সে শেষ হয়, উজাড় হয়,  তখন ওই জলের ফোঁটাটিও দৃশ্যত দেখা যায় না। আদতে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ছাড়া জীবের আর ধর্মাধর্ম কী?

 আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে, / তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে। / তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সুর্য, চন্দ্র তারা, / বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে। / তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে, কুসুম ঝরিয়া পরে কুসুম ফোটে…

কুসুম ঝরিয়া যায়, তবুও কুসুম ফোটে। শরীরের স্বেদবিন্দু ক্লান্ত হয়। ক্ষয় এসে মুড়ে দিয়ে যায় যৌবনের উন্মাদনা। তবুও মানুষ কাতর হয়, অসূয়ার বিষে ফোঁসফোঁস করে, তবুও কিনা প্রেম, তবুও বাসনা, তবুও অনন্ত জাগে…

‘আলবার্টা ক্লিপার’ নামক ছুপা রুস্তম টাইপ এক ঝড় আৎকা নাজিল হয়ে বরফের স্তূপ বইয়ে দিচ্ছে তামাম শহর জুড়ে। ভোররাত থেকেই কুচি-কুচি বরফ অবিরাম ঝরছে। ঝরেছে অবিরাম তারা, ঝরছেই।

কিন্তু কোথাও দাপাদাপি নাই। ধ্বংসের চিন নাই। তাণ্ডব নাই। সামান্যতম শব্দ নাই। হাওয়ার অস্থিরতা নাই। আফিমের মতো ধীর লয়ে বইছে। আর ডেকে আনছে ক্ষয়, ক্রমে মৃত্যু।

ঘুমের পায়ের শব্দের মতো হেঁটে যাচ্ছে বরফের তীব্র ঝড়! ডাকাতদের মতো হইহই রইরই ব্যাপারস্যাপার নাই। নাই কোনো নিলর্জ্জ হুঙ্কার। আছে শুধু মৃদু লয়ে মৃত্যুকে চিনিয়ে যাওয়া। জীবনের পরিশেষ দেখিয়ে দেওয়া।

দিনের যাপনে আলোর কণা মাত্র নাই কোথাও। আবছা আবছা দৃষ্টিতে এই বরফকাল দেখে চলেছি। সাদাকালোধূসর মেঘে ঢাকা পড়ে আছে সমস্ত শহর। অবাক কাণ্ড হলো, এই শহর হাঁটু-অব্দি বরফ নিয়েও দিব্যি চলাচল করছে! অগণন গাড়ির সার্চলাইটের আলোয় দিবারাত্রির তারতম্য বোঝা বড় মুশকিল! তবুও অচল হয়ে কিছু নেই। চলছে সবই দুরন্ত গতিতে। যেন-বা  যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, আছে ছুটে চলা অবিশ্রাম, আপ্রাণ। গতিই জীবন। গতিই আশা আর ভরসা।

অজস্র জুঁইফুলের মতো ধবধবে সাদা সাদা ফ্লারি ঝরছে। নাকি রিয়্যাল জুঁইফুল থেকে খসে পড়ছে এন্তার পাপড়ি? পাপড়ি উড়ছে নাকি ফুল? ফুল বা পাপড়ি যা-ই উড়ুক না কেন, ওদের ঝরা ও ওড়ার মাঝে ফারাক নাই কিচ্ছুটি। ঝরুক বা উড়ুক নাকি মরুক সেসব জেনেবুঝে কাজ কী আমার? আমি বরং আফিমের নেশায় মগ্ন হই। নেশা জমে উঠলে ঝিমাতে ঝিমাতে চোখ খুলে একপলক তাকিয়ে নেবো। অনুভব করার চেষ্টা করব—আর কতদিন বাকি? আর কত পথ বাকি? প্রদীপ নিভিয়া আসিল বুঝি? এরপর অনন্ত আঁধার। ঘোরঘুট্টি তমসা।

 কত আঁখি-তারা নিভিয়া গিয়াছে / কাঁদিয়া তোমার লাগি‘ / সেই আঁখিগুলি তারা হয়ে আজো / আকাশে রয়েছে জাগি / যেন নীড়-হারা পাখি॥ 

না জানিলে তুমি, না বুঝিলে কিছুই। আমি তো জানি। আমি বুঝি।
আমি স্থির জানি—

আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে…

১০ ডিসেম্বর ২০২৫


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you