ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ২০ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ২০ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

২০.
মন হয়ে থাকে ভোরের শিউলির মতো নাজুক। বড় বেশি সংবেদনশীল! পলকা বাতাস উড়ে গেলেই টুপ করে ঝরে পড়ে মাটিতে। ঝরে-পড়া শিউলির চোখে লেগে থাকে সারারাতের অশ্রুকণা।

সে আজও মনে রাখে কেন মোরে? কেন রাখো তুমি মোরে মনে?

যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তা’রে। / ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে॥ / আমি গান গাহি আপনার দুখে / তুমি কেন আসি’ দাঁড়াও সমুখে, / আলেয়ার মত ডাকিও না আর নিশীথ-অন্ধকারে॥

যেখানে-যেখানে আমার বইপত্র নিয়ে যতকিছু লেখাটেখা হয়, সেসব বড় যত্ন করে ওয়েবে আপ হতে দেখি! আর সেসব লেখার লিঙ্ক আমার হোয়াটস্যাপে এলে আমি একেবারে টলে উঠি, আমূল নড়ে উঠি। যেনবা পায়ের নিচের জমিন নাগরদোলার মতো ঘুরে চলছে। আর আমি ক্রমাগত দিকদিশা হারিয়ে ফেলেছি। আহ! কেন বারেবারে পিছু ডাকো তুমি? ও সজনি…

কেন পিছু ডাকো পিছু ডাকো / বারে বারে আমারে তুমি, কাঁদো কন্যা তুমি  / চক্ষের জলে কি ভাসাবে সাধের জমি? / হায় যাব না যাব না ফিরে আর ঘরে / পোড়া মন মানে না, সংসার কারই বা তরে / দেহ কাটি মুই বানাবো নৌকা তোমারই / দুটি কাটিয়া হাত বানাবো নৌকার দাঁড়ি, / আর বসন কাটিয়া দেবো, / পাল তুফানে আমি উড়াবো— / হবো ময়ূরপঙ্খি তোমারই, / তরে বুকে নিয়া সুদূরে যাবো গো ভাইস্যা…

আহা! যদি সত্যি হতো কোনো ভেসে যাওয়া! যদি আর না ফিরতে হতো পুরাতন সংসারে! কাঁদো কন্যা তুমি, চক্ষের জলে ভাসাও সাধের জমি।

এত বয়স হলো তবুও কিনা অযাচিত ভাবালুতা থেকে বেরোতে পারলাম না! হায় আমার দুর্দশা!

বন্ধু রত্না নিয়ে গেল এক লেখকআড্ডায়। নবীন লেখক সাব্বির কাজির সাথে বৃষ্টিভেজা দুপুরে আড্ডা হলো। সঙ্গে ওঁর স্ত্রী নিপা। শ্রীলঙ্কান রেস্টুরেন্টে দোসা খাওয়া হলো জমিয়ে। মশল্লা-চা। সাহিত্য নিয়ে ভাববিনিময়। কিন্তু আমি কেন যেন আগের মতো শত সুরে বেজে উঠতে পারি না। কোনোকিছুতেই সাড়া পাই না ভিতর থেকে। কেন যেন মনে হয় এই পৃথিবীর সবই বড় ক্ষণস্থায়ী।

সাব্বির কাজি ও নিপা দম্পতি আপাদমস্তক ভালোমানুষ। উনাদের সান্নিধ্য আড্ডার মৌতাত বাড়িয়ে দেয়। ভালো মানুষেরা যেমন গভীর হন, সাহিত্যও তেমনি গভীর হতে নিরন্তর গভীরে যেতে হয়।

যারা বুঝবার বা জানবার তারা ঠিকই জানে বা বোঝে—সাহিত্য কোনো ভেসে থাকবার মতো ব্যাপার নয়। সাহিত্য হলো মাটি। সাহিত্য হলো গাছের মূল, সাহিত্য হলো ভিতর থেকে আঁকড়ে থাকবার শিল্প। সাহিত্য যে বুঝবে সে বোবা হয়ে যাবে। হতেই হবে তাকে বোবা। বোবা না হলে অনুভূতিকে শিল্পে রূপান্তর করা যাবে না। যায় না। অনুভূতিকে ধরবার জন্য বড় শুদ্ধ হতে হয় নিজের কাছে নিজেকে। বড় নির্ভেজাল ভালোবাসতে হয় দেবী সরস্বতীকে।

বেশিরভাগ আড্ডাই জমে উঠতে না উঠতেই ভেঙে যায়। ঠিক যেন আমাদের জীবন। এই জীবনের নানান ভুলচুক শুধরে নিতে না নিতেই বিদায়ের ঘন্টাটি বেজে ওঠে।  আর আমরাও গল্প থামিয়ে উঠে পড়ি। লেখক সাব্বির কাজি আমাদের পৌঁছে দেন নির্ধারিত গন্তব্যে।

মাত্র পাঁচ কী ছয়দিন হলো এখানে এসেছি। অঞ্চিত সকালবিকাল ভিডিয়োকলে আমার সাথে কথা বলে।

বহুদূর টরন্টো শহরে বসে অঞ্চিতর শুকনো দুখী মুখ দেখতে দেখতে আমি বিষণ্ণ হই। কে এমন ভালোবেসেছে আমায়? কে কবে এমন করে ভালোবেসেছিল? এত যত্ন করে?

এই বাচ্চাটাকে ক্যানাডায় রেখে কীভাবে দেশে ফিরে যাব ভেবে বেদিশা হই। এত কোমল এই বাচ্চাটা! আহা, এখনো যে শিখে উঠতে পারে নাই জীবনজগতের কায়দাকানুন। শিখে নাই ছল আর জলের তফাৎ।

সেই দুইবছর বয়স থেকে প্রিয়জনদের ছেড়ে সে একলা হয়েছে!

অঞ্চিতর দিকে তাকালেই আকুল কান্না আমাকে আচ্ছন্ন করে ফ্যালে। এই বালককে এই বিদেশবাড়িতে ফেলে যেতে আমার হৃদয় কত শতসহস্র টুকরো হবে? এসব ভেবে আরও অসহায় মনে হয় নিজেকে।

১৫ নভেম্বর ২০২৫


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you