ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৮ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৮ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

০৮.
আসি আসি বলে জোছনা ফাঁকি দিয়াছে টাইপ এইখানকার শীতের স্বভাব।

হিম হাওয়া মেঘ আর রোদের খেলায় এই শহর নানারকম ভুলভুলাইয়া সৃষ্টি করে। ভোর ভোর উঠে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি দেখি যদি, সকাল ১০ বাজতে না বাজতেই ১০ ডিগ্রিতে চড়ে বসে। ওয়েদার হয়তো ফোরকাস্ট করলো—আইজ কিন্তু ঝড়তুফান আইব। সতর্ক থাইকো হগ্গলে।

কীয়ের ঝড় আর কীয়ের কী? আসমান মুখ কালা কইরা থুইলো দুপুর তক। বিকাল নাগাদ ঝিমঝিমায়া ইলশেগুঁড়ি ঝরলো খানিক। ধুস! ফোরকাস্ট কয় কি না তুফান আইবো?

এইডারে নি কয় তুফান? তুফান তো আহে বরগুনার বিষখালি নদীতে। তুফান অয় আমাগোর সন্দ্বীপে। হাতিয়া  দ্বীপে। ঝড়বাদলা আছড়াইয়া পড়ে আমাগোর মোংলা বন্দরে। পশুর নদীতে হুড়মুড়াইয়া ডাকে বান। তুফান উডলে জলের ফণার তলায় মুখ লুকায়া থাকে ইয়া বড় বড় কুমির। আজদাহা সাপ। আর জঙ্গলের বাঘ গাছের খোড়লের খোঁজে এদিকওদিক ছুট লাগায়—যাতে পাওয়া যায় সামান্য ছাউনি। ঝড়তুফান যাতে তাগোরে কাবু করতে না পারে।

মনের চালে দুঃখের বৃষ্টি ঝুমঝুমাইয়া পড়ে / একলা ঘরে ভালোবাসা কেঁদে কেঁদে মরে / ডুবিয়া মরিলাম, মরিয়া ডুবিলাম / তোমারই প্রেমে পড়িয়া…

একেকদিন অবাক করা কাণ্ড ঘটে! মেঘপুচ্ছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় রঙের খেলা। অদ্য মেঘের হোলি খেলবার দিন, এমনতর কিছু নয়। কিন্তু থাকে রঙের বাহার! মেঘপুচ্ছের ফাঁকে, আলোর চিকন রেখা পাশ কাটিয়ে আসমানে রামধনুর রঙ ছলকে পড়ে। আহ! কী যে নয়ানাভিরাম দৃশ্য!

জোছনার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাব তোমার গায় / রামধনু হতে লাল রঙ ছানি’ আলতা পরাবো পায়। / আমার গানের সাত সুর দিয়া / তোমার বাসর রচিব প্রিয়া। / তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুলবুল।।

শোনো হে কবি নজরুল, এই যে তুমি আমারে তুকতাক চালান করে বশে রেখেছ, তোমার সুরের ইন্দ্রধনু দিয়ে আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছ, এইটা কীরকম কথা হে?

যাক না নিশি গানে গানে, বান ডেকেছে আমার মনে…দেখো হে কবি এ-রকম বান ডাকলে তো বিপদের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এই তিন কুড়ি বয়স পার করে এসে এসব গানের বাণী গলার ভিতর জেঁকে বসলে কোনো কথা কি আর বলা যায়? বলার থাকে? তখন বোবা হয়ে যেতে হয়। বোবা হয়ে থাকতে হয়।

For God’s sake hold your tongue, and let me love…

ওই যে নজরুল নামক এক কবি, বাঁধনহারা দোলনচাঁপা নিয়ে একজনম পার করে দিতে চাইলেন! কিন্তু মৃত্যুক্ষুধা এসে মিসম্যারাইজড করে দিলো তাঁর সকলকিছু!

সবার কথা বলে গেল সে, শুধু নিজের কথারা রয়ে গেল অব্যক্ত!

কবি, সবার কথা কইলে, এবার নিজের কথা কহ।  / নিখিল ভুবন অভিমানের আগুন দিয়ে দহ॥ / কে তোমারে হান্‌ল হেলা, কবি! / সুরে সুরে আঁক কি গো সেই বেদনার ছবি? / কা’র বিরহ রক্ত ঝরায় বক্ষে অহরহ॥ / কোন্ ছন্দময়ীর ছন্দ দোলে আমার গানে গানে, / তোমার সুরের স্রোত ব’য়ে যায় কাহার প্রেমের টানে গো— / কাহার চরণ পানে? / কাহার গলায় ঠাঁই পেল না ব’লে / কথার মালা ব্যথার মত প্রতি হিয়ায় দোলে, / হাসিতে যে বাঁশি বাজে, সে ত’ তুমি নহ॥

এখানের ঝড়তুফানের বারতা কবিস্বভাবের মতো। নিজের কথা বলে যায় অলখে।

যেদিন আসমান-ছেয়ে-থাকা মেঘেদের ফাঁক গলিয়ে সাত রঙের মাধুরী ছলকে পড়ে সেদিন আমি বড় আনমনা হয়ে যাই। ভরযুবতীকালে যে নিবেদিত প্রেমিক আমার পায়ের আলতারেখায় নির্দ্বিধায় ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিয়েছিল। আর বলেছিল—আমি যখন তোমার সামনে দাঁড়াব, এই পৃথিবীর সবচাইতে সুপুরুষ হয়ে দাঁড়াতে চাই।

কিন্তু এক পাষাণী তাঁকে দেয়নি অভয় বা আশ্রয় বা কোনোকিছুই।

উলটা তাকে অবজ্ঞা ভরে ফেলে এসেছিলাম পথের ’পরে। একদিন বুঝতে পারলাম মারাত্মক ভুলের ফাঁদে আটকে ফেলেছি নিজেকে। ততদিনে ঢের দেরি হয়ে গ্যাছে। পচা শামুকে পা কেটে গ্যাংগ্রিন বাঁধিয়ে অথর্ব  হয়ে বসে আছি। তাঁকে কোনোদিন বলাই হলো না আমার এই দুরারোগ্য ব্যাধির কথা! কীভাবে বলি? আমি যে হারিয়ে ফেলেছি তাঁর ঠিকানা…!

০৮ অক্টোবর ২০২৫


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you