কন্সার্ট, শিল্পী ও বর্বরের ভিড় || হাসান শাহরিয়ার

কন্সার্ট, শিল্পী ও বর্বরের ভিড় || হাসান শাহরিয়ার

শেয়ার করুন:

হাসানের গানে বোতল ছুঁইড়া মারা হইছে। প্লাস্টিকের বোতল হাসানের মুখে লাগছে। দেখলাম হাসান খুব অবাক হইছেন। জুলিয়াস সিজারের মতো—ব্রুটাসের ব্যাকস্ট্যাবে ছুরির আঘাতে যেই যন্ত্রণা, তার চেয়েও বেশি—বিস্ময়ের আর্তনাদ দেখতে পাইলাম হাসানের চোখে। এত-তু-ব্রুতুস? হাসান গান থামান নাই। গান শেষ করলেন। দ্য শো মাস্ট গৌ অন…মঞ্চ আর শ্রোতার সন্তুষ্টিই আর্টিস্টের নিয়তি—আর্টিস্টের মৃত্যুর চেয়েও…এমনকি আর্টিস্টের সমস্ত নিগ্রহ, সমস্ত অবমাননার চেয়েও…

মনটা খুব খারাপ হইছে আমার। ক্ষমতাহীনের যন্ত্রণা পাইয়া-বসছিল যেন। যেইটা আমি ভুইলা থাকি বরাবর, নিজের চারপাশে অনেক অনেক নিজেরে লইয়া ব্যস্ত থাকার ভিড়ে। ভালো খবর হইলো, অলমোস্ট সব মিউজিক কমিউনিটি পেইজে এইটা নিয়া প্রতিবাদ হইতেছে। গানঅলারা নিন্দা জানাইতেছেন। মেইন্সট্রিম মিডিয়াও এইটারে সিরিয়াসলি নিছে। হাসানের অবমাননায় শ্রোতাদের ক্ষোভের কথা বলতেছে।

কিন্তু আয়োজকরা কি এইটা নিয়া কিছু বলছে? দেশের সবখানে এই যে—এতএত ইম্বেসাইল ছড়াইয়া পড়তেছে, নেড়ি-পাটওয়ারীর মতো—গলাবাজি করা, ব্যক্তি-আক্রমণ করা, পরিবার নিয়া অশালীন কথা বলা, অন্যের অর্জনরে ফালতু যুক্তি দিয়া মুহূর্তেই বাতিল কইরা দেওয়া, নারীদের হয়রানি করা, উস্কানি দেওয়া, মববাজি করা, বিশৃঙ্খলা তৈরি করা—এইসব দূরীকরণে আরো বেশি তৎপর হইতে হবে দায়িত্বশীলদের।

আবার আগের প্রশ্নে আসি, আয়োজকরা কি দায়িত্ব এড়াইতে পারে? নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা কীভাবে এত শিথিল ছিল? শুনছি ওইটা ছিল ওপেন কন্সার্ট। আয়োজক কখন একটা ওপেন কন্সার্ট করতে পারে? প্রশাসনের অনুমতির পরে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হইলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। আয়োজকরা এইটা করতে ব্যর্থ হইছে। অতএব বোতল-ছুঁইড়া মারা ওই বর্বরদের পাশাপাশি আয়োজকদেরও পেনাল কোড আঠারোশষাটের আওতায় আনা উচিত। কিংবা আইনের আওতায় আরো কঠোর ব্যবস্থার জায়গা থাকলে, তা প্রয়োগ করা উচিত। প্রযুক্তির যুগে ওই বর্বরদের ধরা কি খুব কঠিন কাজ? কন্সার্ট আয়োজনে প্রায়ই বিশৃঙ্খলার কথা শুনতেছি। এইরকম কেন হবে?

হাসান, ব্যান্ড আর্ক আমাদের কৈশোরের মায়াবী অভিজ্ঞতা। এক নিশ্চিন্ত রেফিউজ। হাসানের গায়কী ভিন্ন। খুবই অথেন্টিক। অভাবনীয়। নব্বই আর ঠিক-তার পরের কিছু সময় আমরা যেইভাবে হাসানরে পাইছি, এই জেনারেশন সেইভাবে তারে পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। হাসান মন্ত্রমুগ্ধ-গায়কীর এক কুহকী বাঁশিওয়ালা, যে শুধু গান শুনাইতে পারে। হাসান যেন এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা। এরে কেমনে কেউ বিব্রত করতে পারে? অবমাননা? কী ঘটতেছে এইসব?

সময়টা মিডিওকারদের। ফুটেজখোর ইম্বেসাইলে ভরা দেশের অলমোস্ট সব প্লাটফর্ম। জানি, বাজাইরা এই কালচারের লগে আপোস একসময় হাসান, জেমস, বাচ্চুরাও করছিলেন। আর আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হইছিল নৃশংসভাবে। একজন চইলা গেছেন অসময়ে। হয়ত বাঁইচা গেছেন। অন্যরাও পরে নিজেদের খুঁইজা পাইছিলেন হয়ত। রিজিড হইছেন। আড়াল হইছেন সমস্ত রংবাজির হল্লা থেইকা।

ব্যাপার হইলো, সমস্ত গ্লোবালে ওপেন মার্কেটের প্রেশার—দেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যেইসব দূরদর্শী-নীতিনির্ধারণের জায়গা তৈরি করছিলো, সেইখানে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দায়িত্বশীলেরা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হইছিলেন। ফলে যেইখানে দরকার মানসিকভাবে সুঠাম নাগরিক—যার দর্শন আছে, চিন্তা আছে, ভাষা আছে, ওই ভাষার ভিতর একটা সিকিউরড সৃষ্টিশীল ভবিষ্যতের বাসনা আছে। কিন্তু এর বদলে প্রজারঞ্জনের দীর্ঘ অস্থিতিশীল রাজনীতি এবং এর ধারাবাহিকতা আজ এক হাওয়াই-জেনারেশনের মুখোমুখি। বনসাইয়ের শেকড়—ডেপ্থ নাই, শুধু ভাইরাসের মতো ছড়াইয়া পড়তেছে এইটুক টবের সবখানে।

সরকার, এইসব ঠেকান। এইভাবে কই যাইতেছি আমরা?

কেউ জানতো না, কত যতন করে
করেছি লালন এক বাসনা প্রতিটি ক্ষণে
এই সাধনা শত বাধা ভেঙে
গড়েছি সংগীতের জীবনটা তোমারি তরে
এত গান আজ গেয়েছি বলে—রেখেছো অন্তরে
এত সুর আজ গেঁথেছি বলে—দাও ভালোবাসা
একদিন তো আর গাইব না গান একাকী প্রহরে
সেদিনের সেই বেদনাবেলায় না-না-ভুলো না—
কভু ভেবো না মহাসুখে মেতে আছি আমি অহমিকাতে
কত যন্ত্রণা এ-জীবনে তবু বেঁচে আছি গানে গানে

(এত গান আজ, কারবালা)

(দৃশ্যের অলক্ষে—৫ আগস্ট ২০২৬, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, রাতে ওপেন কন্সার্টে হাসানের গায়ে পানির বোতল ছুঁইড়া মারছে দর্শকসারিতে থাকা জনৈক বর্বর।)

আগস্ট ২০২৬


হাসান শাহরিয়ার রচনারাশি
গানপারে হাসান

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you