কিছুদিন আগে সোনার বাংলা সার্কাস ব্যান্ডের ‘মহাশ্মশান’ অ্যালবামের ‘প্রেম ও শকুন’ গানটা শুনতেছিলাম। প্রবর রিপন গাইতেছিল—“ভালোবাসলে মৃত্যুর আগে বাসো / মৃত্যুর পর তো ভালোবাসে শকুন”…গানের এইরকম কথার সাথে সহসাই দেখা হইলো—যে-জীবন ফুলেদের, পাখিদের…অনেকটা সেইরকম এক মোমেন্টের মতো। হিট দ্য বুলস-আই। আমার মনের বিলাপ এইভাবে যেন ভাষা পাইলো। নইলে মৃতের কাছে ভালোবাসা কী? এই যে আমি বাঁইচা আছি, টু বি ল্যভড—এইটুক নশ্বর অস্তিত্ব কি যথেষ্ট না? আমার অনুপস্থিতিতে—আমার স্মৃতি নিয়া কোনো অপরিচিত বর্তমান বা কোনো অদেখা ভবিষ্যৎ—কী করতেছে বা করতে থাকবে, তাতে কী আসে যায়…
আমি ঠিক করলাম, এই লাইফে যতজনরে ভালোবাসছি আমি—মানে যাদের সাথে দেখায়, কথায় বা যাদের লেখায়, সৃষ্টিতে, কাজে কোনো-না-কোনোভাবে আমার রুহ শান্তি পাইছিলো, আই শ্যাল লেট দেম নো দ্যাট ইট হ্যাপেন্ড সামডে…ইন্সাইড মি…
সায়েমভাইয়ের, কবি আহমদ সায়েম, ‘রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ’ কবিতার বই শেষ করলাম। শেষবার যখন উনি দেশে আসেন, আমার বাসায় আসছিলেন আর বইটা দিছিলেন। আমার ঠিক মনে নাই, সিলেটে ঠিক কবে উনার সাথে পরিচয় হইছিল…কোনো একদিন।
সায়েমভাইয়ের ফটোগ্রাফির হাত খুব ভালো। দুইহাজারতেরোচৌদ্দয়ের দিকে লাক্কাতুরা স্টেডিয়ামের কাজ চলতেছিল তখন—জাহেদভাইরে লইয়া উনি আমার বাসায় আসছিলেন। আমি তখন চৌকিদেখি-বাদামবাগিচায় থাকতাম একটা সাব-লেট বাসাতে। আলাপে আলাপে সায়েমভাই আমার কিছু ছবি তুলছিলেন স্টেডিয়ামের ভিতর। সম্ভবত আমার কবিতা ছাপাবেন কোথাও। মানে নতুন-পরিচিতের নিস্তরঙ্গ ফটোশ্যুট।
আমার এখনো ঠিক মনে নাই, কীভাবে সায়েমভাই এবং জাহেদভাইয়ের সাথে পরিচয় হইছিল। এই মনে হওয়াটা দরকার। দেখা হইলে তাদের ফের জিজ্ঞাস করবো। মনে কইরা দেখেন দেখি…

সায়েমভাই তখন ছোটপত্রিকা ‘সূনৃত’ চালাইতেছেন। ইতোমধ্যে সূনৃতের বেশ কয়েকটা বড় বড় সংখ্যা বের হইয়া গেছে। সায়েমভাই সূনৃতের সব-সংখ্যা আমারে আইনা দিলেন। সাথে সিলেটের আরো কিছু লিটলম্যাগ। ওই সময়টায় জাহেদভাইয়ের বাসায় বইসা সূনৃত সম্পাদনা ও প্রকাশের অনেক পরিকল্পনা আমি দেখেছি। ঠিক কবে থেকে শুরু আর কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা আজ আর বলতে পারব না। আরো একজন মানুষের সাথে তখন পরিচয় হইছিল। কবি সৈয়দ আফসার। আফসারভাইয়ের গল্প অবশ্য অন্য আরেকদিন করা যাবে।
তখন সিলেটে আমার দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তন। ছাত্রজীবন শেষ। মনে আছে, দুই বছর অনেকটা উদ্দেশ্যহীন ছিলাম। উদ্ভ্রান্তও। নিজের ইচ্ছামতো চলতে চাইতেছিলাম। কিন্তু আমার মিডল-ক্লাস পিতা মানতে পারতেছিলেন না। ঠিক ওই সময়—ছাত্রাবস্থায় ছুটাইতে থাকা রাজনীতির ঘোড়াটারে প্রথমবারের মতো নিজের ভাষা দিয়া বুঝতে চাইলাম। দেখলাম নিজের ভাষার সাথে অভিজ্ঞতার ভাষা মিলতেছে না। মানে স্বপ্নভঙ্গ। এই ব্যাপারটা আমি এখন কেউরে আর বুঝাইতে চাইতেছি না।
সত্তরআশির দশকে ব্যর্থ বিপ্লব-পরবর্তী অনেক ট্র্যাজিক নায়ক-নায়িকাদের ধাওয়া-খাওয়া রূপকথার রঙ এই জেন-জিযুগে নতুন কইরা আর-কিছুই বিল্ড-আপ করতে পারবে না। আমার শৈশব-কৈশোর আরো দুইদশক পরে তৈরি। আমি যখন তাগড়া তরুণ, পৃথিবী তখন ডিজিটাল যুগে চইলা-আসছে। লাইফে যা করতে চাইছিলাম, তার-বেশিরভাগ ছিল স্বপ্নের মতো। রিয়ালিটিতে স্বপ্ন একটা দামি জিনিস। দরদামে আমি এখনও খুবই করুণ।
সিলেটে দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনে—প্রফেশনাল লাইফে নিজেরে আটকানোর আগে, ভিতরের জিদটারে আরো কিছুদিন লাগামহীন থাকতে দিছিলাম, মনে পড়তেছে। কিছু এক্সপেরিমেন্ট করতেছিলাম লাইফ নিয়া। আমার চারপাশে তখন সিকিউরিটি ছাড়া আর-সব ছিল। যেমন দ্বিধা, আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা, পাগলামি। নিশ্চিত কইরা বলতে পারতেছি না—ওই ট্রাঞ্জিশন পিরিয়ডটা কি উপভোগ করতেছিলাম নাকি মনে মনে বিরক্ত হইতেছিলাম? কবি আহমদ সায়েমের সাথে ঠিক ওই সময়টাতে পরিচয়।
‘রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ’ বইয়ের অলমোস্ট সব কবিতা লেখা হইছে দুইহাজারতেইশ টু দুইহাজারপঁচিশ সময়ে। কয়েকটা কবিতা এর-কিছু আগে লেখা। বইটা নিয়া কী লিখবো ভাবতেছিলাম। চব্বিশের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানকালীন এবং এর পূর্ববর্তীতে আর পরবর্তীতে উত্থিত বিবিধ বয়ান, আস্ফালন, তর্ক-প্রতর্ক, সম্ভাবনা বা সম্ভাবনার অপমৃত্যু, ফ্যাসিস্ট-রেজিম-পতন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষা, অনিয়ন্ত্রিত ভায়োলেন্স, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীশক্তির সমান্তরালে রাষ্ট্রীয় ঊন-ভূমিকায় ধর্মব্যবসায়ী উগ্র রাজনীতির মব এবং আশাবাদের বিপরীতে নৈরাশ্যের পুনরাবির্ভাব—মূলত এইসবের খুবই সরলরৈখিক কাব্যরূপ ‘রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ’।

সতেরো বছরের দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক-ফ্যাসিস্ট রেজিমে কীভাবে তরুণরা অস্তিত্ব-সংকটে পইড়া-যাইতে-থাকে, কীভাবে তরুণদের-চিৎকার ক্ষমতা দিয়া অবদমিত-অপমানিত হইতে থাকে এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কেমনে তরুণ-তরুণীরা অল-আউট মুভমেন্ট তৈরি করে—যেইখানে ফ্যাসিজমবিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তি অ্যালাইন একজোট হইয়া ফ্যাসিস্ট-শক্তিরে শেষমেশ ধরাশায়ী করে—এইসব নিয়া বিভিন্ন জিজ্ঞাসা ও আশঙ্কায় কবি আহমদ সায়েম ‘রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ’ বইয়ে নিজের বাস্তব এবং চেতনাজগতের ট্রাঞ্জিশন সময়টারে যুগপৎভাবে নিজেরই মুখোমুখি করতে থাকেন অনাড়ম্বর ও সরল বয়ানে।
কবিতায় দার্শনিকতা করতে নাই। বরং কবির দেখা বাস্তবতা কবিতায় দার্শনিকতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। দার্শনিকতা মূলত বস্তুজগতের প্রতিফলনে তৈরি হওয়া চিন্তা যার স্পেইস-টাইম অনেক বিস্তৃত—ভাষা যেইটারে অপরের কাছে কৌতূহলী কইরা তোলে। আহমদ সায়েমের কবিতারে এইভাবে দেখলে, কবিতা উপভোগ করা যাবে না। কারণ দার্শনিকতার ভাবে কবির তৈরি করা কাব্যরূপের ছোট অংশটা অপরিণত। কোথাও অস্পষ্ট, আবার কোথাও যেন অনর্থক।
সায়েমভাইয়ের একটা বৈশিষ্ট্য হইলো তিনি চড়া গলায় কথা বলেন না। আচমকা উচ্ছ্বাসে স্বর কিছুটা লাউড মনে হইতে পারে, কিন্তু অন্যসবখানে উনি বেশ ফর্মাল। উনার প্রথম কবিতার বই ‘অনক্ষর ইশারার ঘোর’ প্রকাশিত হয় দুইহাজারপনেরো সালে এবং কিছু কবিতার ইংরেজি-অনুবাদে দুইহাজারআঠারো সালে ‘The Layers of Dawn’ নামে একটা বই বের হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কয়েক পৃষ্ঠা ভোর’।
সায়েমভাই উল্লেখিত তিনটা বই-ই উপহার হিসাবে দিছিলেন আমারে, অটোগ্রাফ সহ। উনারে একদিন বলছিলাম বোধ হয়—ভালো হইতো, কোথাও বইসা একদিন কিছু কবিতা পড়া গেলে। যদিও আবৃত্তির ব্যাপারে নিজের ভিতর কোনোদিন সেইভাবে ড্রিফট ফিল করি নাই। কৈশোরে একটা কবিতাই আবৃত্তি করতাম চোখ বন্ধ কইরা, যখন অপরিণত যন্ত্রণা ঘিইরা ধরতো আচমকা, নির্বিচারে। জন কিটসের ‘ঔড টু নাইটিঙ্গেল’ কবিতার বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক হুমায়ুন আজাদ। “আমার হৃদয় ব্যথা করছে / আর নিদ্রাতুর বিবশতা পীড়ন করছে আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে / যেন আমি পান করেছি হেমলক…
এক শহরে থাকলেও সায়েমভাইয়ের সাথে মোটেও নিয়মিত দেখা হইতো না। বছরে দুই-তিনবার বড়জোর। উনার সম্পাদনায় প্রকাশিত অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা ‘রাশপ্রিন্ট’-এ লেখা নিতেন হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে যোগাযোগ কইরা। ‘সাহিত্যিক আড্ডা’ বলতে যেইটা বোঝায়—এইরকম কিছু কোনোকালেই ছিল না আমার। বরং এই জগতে যারা আছেন এবং যাদের সাথে এই ইহকালে ঘটনাক্রমে পরিচয় হইছে আমার—তাদের কাছে একজন দলছুট-সঙ্গ ছাড়া, আর-বিশেষ-কিছু কোনোদিন থাকি নাই আমি।

মঞ্চনাটকে সায়েমভাইয়ের সম্পৃক্ততা ছিল একসময়। উনার অভিনয় দেখতে নজরুল অডিটোরিয়ামে গেছিলাম একদিন। ‘ভানুসিংহের পদাবলী’। উনি ছিলেন এই কাব্য-নাটকের ভোকাল। আমি খুব বেশি মঞ্চনাটক দেখি নাই । এখন মনে হয়, লাইফের এই ইন্টারেস্টিং জায়গাটা মিস করলাম শুধুমাত্র অবহেলা আর অসচেতনতায়। বেখেয়ালেও হইতে পারে। অতএব মাঝেমধ্যে নিজেরে এক অলীক-কাঠগড়ায় দাঁড় করাই আমি। কেন দেখলাম না? এইরকম এক অপরাধবোধ। স্যামুয়েল বেকেট, হ্যারল্ড পিন্টার বা ব্রেখটের নাটক পইড়া এই-বোধ আরো বেশি পাইয়া-বসে আমারে।
সায়েমভাইরে কখনো আমার খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হয় নাই। কখনো মনে হয় নাই, উনি সবসময় স্বাধীন চিন্তা করতে পারেন। মানে অন্য লোকে কী ভাববে—এইরকম এক পিছুটান উনার মধ্যে সবসময় ছিল। একবার এমন হইছিল, উনার পত্রিকায় এক ভদ্রলোক লেখা দিছেন। উনি লেখাটা নিলেন কিন্তু ছাপাইলেন না। ব্যাপারটা জানতে পাইরা আমি উনারে জিজ্ঞাস করলাম—এইটা ছাপাইলেন না কেন?
উনি উত্তরে বললেন—ওই লেখকের পলিটিক্যাল পজিশন নিয়া অন্য এক-লেখক আপত্তি জানাইছে।
আমি জিজ্ঞাস করলাম—তাতে কী হইছে, ভাই? আমি এই লেখক সম্পর্কে শতভাগ কনফিডেন্ট যে, উনি ওই ধরনের পলিটিক্স করেন না। সুফিবাদ দিয়া খুব প্রভাবিত উনি…
উনারে এইটাও বললাম যে, কে কোন পলিটিক্স করে, এইটা দিয়া কি লেখক নির্বাচন করা ঠিক? লেখকের লেখার কন্টেন্টই মূল। এইটা যদি কোনো দলীয় প্রোপাগান্ডাভিত্তিক না-হয়, তাইলে সব সৃষ্টিশীলতারে ওয়েলকাম জানানো উচিত।
সায়েমভাই আমার কথা শোনেন নাই।
ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে নাই। মানুষের সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই কারো সাথে চলতে যেয়ে তার সীমাবদ্ধতার খোঁজ করেন না! অতএব আপনারে হোঁচট খাইতে হয়। আমি এইটা নিয়া ভাবছিলাম পরে। উনি কীভাবে অন্য লোকের কথায় পইড়া একজন লেখকরে বাদ দিয়া দিলেন? একজন সম্পাদক কেন অন্যের কথা দিয়া প্রভাবিত হবেন? কেন তিনি অন্যের অযৌক্তিক দাবিরে নিজের চিন্তা ও পজিশন দিয়া বাতিল কইরা দিতে পারেন না? এই দুর্বলতা কীসের?
ফ্যাসিস্ট রেজিমে অনেকের জন্য সময়টা এইরকমই ছিল। তারপর সাহিত্যের ভিতর বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল, উপদল, লিটলম্যাগভিত্তিক ক্যাডারগিরি ইত্যাদি নিয়া ওইসময় বেশ শোরগোল ছিল নতুন হাজির হওয়া স্যোশাল মিডিয়ায়। শোরগোলই ছিল। যেইখানে ভাষা ছিল খুবই রূঢ় এবং ইন্ডিসেন্ট। ব্যক্তি-আক্রমণ, ব্যক্তি-তোষণ চলতেছিল সমানে। সোসাইটিতে নারীদের যে-শুধু মোল্লারাই অবদমিত কইরা রাখতে চায়, ব্যাপারটা তখন মনে হইতেছিল আংশিক সত্য। শুধুমাত্র মতের মিল না-হওয়ায় এইখানকার তথাকথিত সাহিত্য-করা প্রগতিশীলরা বিভিন্ন নারীদের কী পরিমাণ ক্রুর-নিকৃষ্ট ভাষায় আক্রমণ করতো, তা এই মুহূর্তে মনে করতে চাইতেছি না। সাহিত্য-সমালোচনা কোথাও ছিল না, বরং ব্যক্তি-আক্রমনে পারদর্শিতা-প্রদর্শনী ছিল মহামারীরূপে।
সায়েমভাই শান্ত স্বভাবের মানুষ । বাস্তবে যেমন, স্যোশাল মিডিয়াতেও। অযথা কেওসে উনি কখনোই জড়ান না। আমাদের সহসা দেখা হইলে, মূলত কী লিখতেছেন, কী লেখা দিবেন বা বই করতেছেন কি-না, এইসব নিয়া আলাপ হইতো। কোনো বিশেষ টপিক নিয়া একে-অন্যের মতামত শুনতে চাইতাম আমরা। এবং আলাপের এই অংশটাই আমার ভালো লাগতো বেশি।

একদিন দেখি, ফেইসবুকে খুবই হতাশার একটা স্ট্যাটাস দিলেন তিনি। স্যুইসাইডাল স্ট্যাটাস। ভয় পাইয়া গেলাম। আমি মানুষের লেখায় এমনিতে খুবই কম প্রতিক্রিয়া জানাই কিন্তু এই স্ট্যাটাসে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সাহসই হইলো না। দেখি অলরেডি অনেক মানুষ কমেন্ট করতে শুরু করছে। বিস্ময়ের, সমবেদনার, আতঙ্কের। ভাবতেছিলাম, এমন কী হইলো সায়েমভাইয়ের লাইফে যে ঘোষণা কইরা মরতে যাইতেছেন কোথাও…
সিলেট শহরটা খুবই ছোট। তবুও শহরের সব অলি-গলি এখনো চিইনা উঠতে পারি নাই। নয়াসড়কের একপাশের গলিতে সায়েমভাইয়ের বাসা। এক-দুইবার গেছিলাম আমি। ভয়ে ভয়ে ছুটলাম বাসার দিকে। মনে আশঙ্কাটা ছিল—বাসাটা খুঁইজা পাবো ত? বাসায় সায়েমভাইরে কি পাবো?
বাসায় গেলাম। দরজায় নক করলাম। সায়েমভাই ছাড়া উনার বাসায় কেউ পরিচিত না আমার। বাচ্চাদের কান্নার শব্দ পাইলাম। একটা শোর শুনতেছিলাম ভিতর থেইকা। কেউ একজন আইসা জানাইলো—সায়েমভাই বাসায় নাই। মনটা খুব খারাপ হইতেছিল। কী করবো? জাহেদভাইরে ফোন দিবো নাকি? আর-কারো কথা মনে পড়তেছিল না আমার। জাহেদ ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা হইলো। অ্যানিওয়ে, সেদিন রাতে ফেইসবুকেই সিলেটের চিত্রশিল্পী সত্যজিৎ রাজন নিশ্চিত করলেন—সায়েমভাইরে পাওয়া গেছে। উনি ভালো আছেন।
লাইফে এইরকম মুহূর্ত আসতে পারে। অস্বাভাবিক কিছু না। কেন সায়েমভাইয়ের লাইফে এইরকম এক সিন তৈরি হইছিল—এরপরে বেশ-কয়েকবার দেখা হওয়ার পরেও জিজ্ঞাস করি নাই। কিন্তু এরপর কখনো উনারে বিষণ্ণ দেখি নাই।
দেশের বাইরে যাওয়ার বেশকিছুদিন পর একরাতে সায়েমভাইয়ের ফোন পাইলাম। গাড়ি চালাইতেছেন। জিজ্ঞাস করলাম—নিউইয়র্কের লাইফটা কেমন? বললেন—হিসাবের। কিছুদিন পর দেখলাম, সায়েমভাই ওইখানেও বেশ অর্গানাইজড হইয়া উঠছেন। আমেরিকায় বাঙালি সাহিত্যিকদের এক করতেছেন, আড্ডা দিতেছেন, বই করতেছেন, পত্রিকা করতেছেন। যেইটা এইখানে, এই সিলেট শহরে অলওয়েজ উনি করতে পারতেন। একটা অসাধারণ সাংগঠনিক গুণ উনার মধ্যে আছে। সায়েমভাই সবার জন্য একটা কম্ফোর্ট স্পেইস হইয়া ওঠেন।

যা-ই হোক, লেখাটা শেষ করবো সায়েমভাইয়ের একটা কবিতা দিয়া।
…সকল আলোর মুখ এখন স্মৃতিকথার মতো
বিকেলের ম্লেচ্ছিত আলোয় জরার নগর
বৃষ্টির হাতগুলো কতশতবার জ্বলে-জ্বলে উঠেছে
আর খোলা বুকে গাওয়া হয় তৃষ্ণার গান
তৃষ্ণার নিবিড়তা নিয়ে তৈরি করি নবীকৃত সব দৃশ্য…
আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে
এঁকে রাখি শিশুর কান্নার সৌন্দর্য
(সৌন্দর্যের সূচিপত্র)
উপরের কবিতাটা আহমদ সায়েমের ‘অনক্ষর ইশারার ঘোর’ কাব্যপুস্তকের পনেরো সংখ্যক পৃষ্ঠায় পাওয়া যায়। আবার, একই বইয়ের অন্যত্রও কবিতাটা ব্যবহৃত হয়েছে এপিগ্রাফ আকারে। তেমনি কবির দ্বিতীয় বই ‘কয়েক পৃষ্ঠা ভোর’-এর একটি সিরিজ কবিতায় কাব্যাংশটা আরেকবার পাওয়া যায়।
আগস্ট ২০২৬
হাসান শাহরিয়ার রচনারাশি
গানপারে আহমদ সায়েম
- নিস্তরঙ্গ মুহূর্তের জারমুনি || হাসান শাহরিয়ার - August 27, 2026
- কন্সার্ট, শিল্পী ও বর্বরের ভিড় || হাসান শাহরিয়ার - August 7, 2026
- মা ইন্তি বাঙ্গারাম, সামান্থা রুথ প্রভু অ্যান্ড হার ফাইটিং মোমেন্টস || হাসান শাহরিয়ার - July 26, 2026

COMMENTS