ধবধবা দুধরাত্রি। ডিমকুসুম আর কম-সে-কম তিনবার-জ্বাল-দেয়া ঘনসর দুধের হাল্কা হলুদ আভা। শাদা, আবার শাদাও নয় ঠিক, যদিও-বা মানুষজন জ্যোস্না বলতেই শাদা ভেবে খালাস। হয়তো জ্যোস্না শাদাই, কিন্তু সর্বাংশে শাদাও নয় সে, একটু হলুদ দুধমালাইয়ের রঙ মেশানো। লোকে তো কতকিছুই ভাবে! যেমন লোকে মনে করে যে, জ্যোস্না মানেই হলো পূর্ণিমা, আসলে তো তা না। সব পূর্ণিমাই জ্যোস্না, আবার সব জ্যোস্না পূর্ণিমা না। আগে-পরে দুইতিনদিন—পূর্ণিমার—খুব জ্যোস্না হয়। এমনকি কখনো কখনো ভ্রম হয় দেখে যে, আজকেই পূর্ণিমা নয় তো! হচ্ছে যেমন আজকেও। ওদিকে মেঘাচ্ছন্ন রজনিতে পূর্ণিমাও উদ্ভাসিত হয় না ঠিকঠাক। ফলে, আলো দেখে তুই হোস নে উতল, পূর্ণিমা তা না-ও হতে পারে।
দ্যাখো উচ্চারণে কত ভিন্নতা, বৈচিত্র্য, যদিও জিনিশ একই। জ্যোৎস্না, জ্যোস্না, জোসনা, জ্যোছনা, জোছনা—তা, এদের মধ্যে তেমন ফারাক কিছু নাই অন্তত অর্থগত দিক থেকে। ক্যায়া ফার্ক পর্তা হ্যায় জ্যোৎস্না আউর জোছনায়! য্যায়সা মাজা আ রাহা হ্যায় একটায়, আরটাতেও তো তা-ই। কিন্তু ধ্বনিসাম্যগত বিবেচনায় কোথাও জ্যোৎস্না মানানসই, কোথাও-বা জোছনা। মাল তো ওই একই। বটে এইটা আমলে রাখা চাই, বিশেষত লেখার বেলায়, একেক শব্দের একেক উচ্চারের একেক মাত্রা—আলাদা শেইড থাকে যেমন একই রঙের, তেমনি শব্দেরও। শব্দের শেইড তো শুমারহীন, তৈরিও করা যায় শেইড অলমোস্ট অসীম পর্যন্ত। শব্দের, ধ্বনির, রয়েছে আলাদা নন্দন। শব্দের, আওয়াজের, রয়েছে রীতিমতো ওজন। রয়েছে আঞ্চলিক উচ্চারণের মধুরতা। জায়গা বুঝে লাগসই ব্যবহার জানা থাকা চাই। সকলের না-জানলেও চলে অবশ্য, আমার না-জানলেও চলবে, তবে লেখকদের আলবৎ জানা থাকা চাই, আর তারা তা জানেনও নিশ্চয়।
এখন দুইখানা গান শুনতে পারি, এই রাইতে, এই নিষ্পুর্ণিমা জ্যোস্নারাত্তিরে। একটা হলো : “জোছনা করেছে আড়ি, আসে না আমার বাড়ি / গলি দিয়ে চলে যায়, লুটায়ে আঁচল শাড়ি.”..ইত্যাদি গীতকলিবিশিষ্ট। অনুরূপে : “এই নীল জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি / দেখো ওই ঝিলিমিলি চাঁদ, আকাশে সলমা জরি”…ভিন্ন নয় শব্দদ্বয়ের উচ্চারণ, তবু দুই জোছনার দুই চিত্র যেন, ভিভিডলি ডেপিক্টেড। দুই জায়গাতেই জ্যোৎস্নাপাত সুপ্রযুক্ত। জ্যোৎস্না শব্দটির ত্রিমাত্রিক উচ্চারণব্যঞ্জনা নিয়ে ফরহাদ মজহারের একটা প্রবন্ধ-বিবরণ রয়েছে বেশ ইন্টারেস্টিং। বছর-কয়েক আগে এটি পড়েছিলাম কোনো অনলাইন পোর্টালে। সেখানে বেদের মেয়ে জোসনা সিনেমাটা হাতে নিয়ে এগিয়েছিলেন মজহার। শব্দোচ্চারের ভেতর দিয়া প্রকাশ-পাওয়া শ্রেণিচরিত্র উদ্ঘাটন করার একটা প্রয়াস ছিল সেই লেখাটার একটা বড় অংশ। অবশ্য ব্যাপারটা সবসময় মেনে নেয়া না-গেলেও, কম্পার্টমেন্টের ভেতর থেকে সবকিছু অবলোকনের বাতিকগ্রস্ত ব্যাপারটা, মজহারের ওই পার্টিকুলার দেখনভঙ্গি ভিন্নস্রোতা ভাবনার কারণে আমাদেরে প্ররোচিত করে চিন্তনে। এইটা একটা দশাসই প্রশ্ন, সবকিছুতে শ্রেণিখোপ উদ্ভাবন ও শ্রেণিচরিত্র উপস্থাপন বুঝি যথার্থ?
পূর্ণিমা হোক বা না, আজ জ্যোৎস্না। আজ কেউ বনে যাক বা না-যাক, বন তো জ্যোৎস্নাভাসা। জ্যোৎস্নাশাদা দুগ্ধরজনি আজি, ধবধবে এবং ডিমকুসুমের আভা ঠিকরানো হলদিয়া, কাল বা পরশু হবে হয়তো পূর্ণিমা। ভাদ্রপূর্ণিমা। আশ্বিন পর্যন্ত কোনোমতে বেঁচে যেতে পারলে, একটা মাস তো মোটে আর, পাবো লক্ষ্মীপুজো। দুর্গাপূজা শারদীয়। কোজাগরীবিমূর্ত হর্ষ। জ্যোৎস্নাযাম সফল হউক সকল ঘরে সকল লোকের তরে। ফরহাদ মজহার কী জ্যোৎস্নায় একটাবার ফিরে তাকাবার সময় পান আজকাল! নিশ্চয়ই পান। এবাদতনামা আর শিবানীবন্দনার কবি তিনি। ছিলেন খোকন ও তার প্রতিপুরুষ-এর কবি। কিন্তু প্রতিপুরুষই কী জয়যুক্ত হলো শেষাবধি? নিশ্চয় নয়…নিশ্চয় নয়…! যেন খোকনের জয় হয়। যার জন্য খোকন খোকন করে মায়। যার দুধমাখা ভাতের নলা পড়ে থাকে ফেরেশ্তানামানো জ্যোস্নায়। কাউয়ায় খায়।
আদিগন্ত অখিল চরাচর কোনো-এক স্বরাট কবির কণ্ঠ শোনার অপেক্ষায়।
জাহেদ আহমদ ২৬ অগস্ট ২০১৩
- ‘ম্যুনলিট স্যোনাটা’ নামে এই নিবন্ধ দুইহাজারতেরো অগস্টে পাব্লিক পরিসরে পোস্টেড।—লেখক
- জ্যোস্নারাইতের জারি - August 27, 2026
- অগস্ট পনরো - August 22, 2026
- শ্রাবণবিদায় - August 7, 2026

COMMENTS