পশ্চিমের আকাশে যেন অভিন্ন এক পর্যটক পথ। মেঘে মেঘে উড়ে যাচ্ছে জলসমুদ্রের প্রাণ। হায় বৃষ্টি, হায় চৈতন্য। বৃষ্টি কেন বলে যায়—পরিযায়ী পাখিরা আজ দূরে কোথাও! নিমুরিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটির শেষে শিশুরা একে একে পথ ধরে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আর এই দৃশ্য দেখার পর আমার কেবল মনে হচ্ছে—‘অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।’
সবুজ ঘাসের দেশে দেখো—আমি তো কেবল তার বেড়ে ওঠার চারপাশকেই কবর জেনেছি। বাতাসকে একটু শান্ত, থমথমে এবং গম্ভীর বলে অনুভব করেছি। কখনো কখনো ভেবেছি—বাতাসও আর্তি বা কাতরতায় নষ্ট হয়ে যায়। একবার বনের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর সময় এক কালো প্রজাপতি আমার আঙুল স্পর্শ করে আমাকে জানিয়েছিল—‘জোর যার সত্য তার’। সত্যের ভেতর অজস্র ভোর, কিন্তু তাতে আলো নেই। তুমি কেবল দুঃখ জেনে নাও।
চারপাশে শরৎকাল। কামিনীগাছটায় যত্নআত্মি হয়ে বৃষ্টি বসে আছে। শাদা শাদা ফুলগুলো আমাকেও ভুলতে বসেছে যেন। তার পাশে বাড়ি যাবার পথে একটা পুবমুখো বাড়িও দখিনমুখো কাৎ হয়ে পড়ে আছে। বাড়ি একই রকম, অথচ কত আলাদা। এমনটাই ভাবছে হয়তো বাড়ির ঝোপঝাড়। আমি দেখলাম—ছায়ার ভেতর আত্মীয়তার ফল ঝুলে আছে তাদের। আর ফলগুলো দাঁড়িয়ে নাচের ভঙ্গি করছে।
অনেকদিন আগে। তখন স্কুলে পড়ি। খুব সাধারণ স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে স্কুলে যেতাম। মনে পড়ে—খুব বৃষ্টিতে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটা স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেল। এভাবে চলতে যাওয়া বা চাওয়া ছিল অস্বস্তিকর। তবু ছেঁড়া স্যান্ডেল টেনে নিয়ে গেলাম মুচির দোকানে। নিবারণকাকা মুচি। স্যান্ডেলখানা সেলাই করতে করতে আমাকে গল্প শুনিয়েছিল—জানো তো, গুলিস্তানে পরী নামে। তখন গুলিস্তান চিনতাম না আমি। নামও শুনি নাই কোনোদিন। শুধু মনে আছে—নিবারণকাকা, স্যান্ডেল সেলাইয়ের পয়সা নেয়নি কোনো।
আমার স্মৃতির ভেতর আমি প্রণাম করি, রঘুনাথপুর। যে-গ্রামের বাতাসে নামে সুরের মতো দরদ। ঘাটে বাঁধা থাকে রতন দাসের টেরাকোটা নৌকা। কৃষিজমির উপর দিয়ে নেমে গেছে বিকেলের ছায়াপথ। কখনো দেখা মেলে বাঁকবদল করা শাদাবক। আর প্রচুর বৃষ্টিতে ভেঙে যায় টেরিডোফাইটা গাছের ভ্রূণ। যেখানে আমি গোধূলিতে পা রেখে একটু দাঁড়াই। আকাশ ভারী হয়ে বৃষ্টি নামে।
মরা মাসে একা একা—কথারা মরে যায়।
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- আমি আমার স্বপ্নে, বৃষ্টির কথা লিখেছিলাম || শুভ্র সরকার - September 26, 2026
- বাড়ি ২ || শুভ্র সরকার - September 16, 2026
- বাড়ি || শুভ্র সরকার - August 20, 2026

COMMENTS