রোদ আর বৃষ্টির এই হেঁয়ালিপূর্ণ আচরণের মধ্যে দুইটা শালিক উঠোন জুড়ে অতিথিনারায়ণ। তাদের হলুদ ঠোঁট আর হলুদ পা-জোড়া নিয়ে হেঁটে চলা মাটিতে কত-না অনাড়ম্বর। আমি বারান্দার সিঁড়িতে বসে ভাবছি, এত দেখার চোখ ভরে সুন্দর—তবু শূন্যতা, এত নহর তবু জীর্ণতা। ধূম ধূম আগুন-ডোবা টিনের চালের ফাঁকে। বাতাসে আলোর চেতনা। মায়ের হাতে লাগানো একটা নয়নতারাগাছে অনেকগুলো ফুল ফুটেছে। মনে করছি, ফুলের নিচে কেবলই ঘুমের দেশ। ফুল মানে মৌনী কোনো পোকার ঘর। যে-ঘরের আনন্দ আর ভালোবাসা আমাকে বুঝে নিতে হচ্ছে। এখন কি ফুলের মাস? ফুলের উপর চড়েছে ফুল আর দুলছে। কেবল দুলছে। মানুষ কেন ফুল তোলে? আমার মনে হয় এ অন্যায়। তখনো শালিক দুটিকে আমি দেখছি—যেভাবে পায়চারি করে মানুষ। তবু আকাশকে বলে রাখি, অনেক বছর। তার তো দেখা নেই—
আমড়াগাছটা নেই। সেই কবেই কাটা পড়েছে। গাছের গুড়িটা রয়ে গেছে। গাছের গুড়ি এক বিষণ্ণ মানুষের ধ্যান। যেন কোথাও গেঁথে আছে মৃত্যুর বিছানা। আর দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে যে-রক্তজবার গাছ—তার বাতাসের কাছে জমা হয়ে আছে না-জানি কত কত রক্তজবার নাম৷ গুড়ির পাশে পড়ে-থাকা একটা মৃত তেলাপোকাকে ঘিরে লাল পিঁপড়াদের আনাগোনা দেখে মনে হচ্ছে—কোনো উপলক্ষ নেই, তাই সর্বদাই আয়োজন। দুনিয়ার আকাশটুকু কত বড়, তবু কেন বাড়ির আকশটুকু ছোট হয়ে আছে। বাড়ি আচ্ছন্ন দু-চোখ—যেভাবে দারোয়ান বসে থাকে। আমিও দারোয়ান টাইপ হয়ে আছি। আমার মতো করে এই বাড়িটাকে দেখতে পাচ্ছে কে? একটা পেয়ারাপাতা সুর ভেঙে উড়ে গেল। সেই সুরের ভেতর আমার কিছুটা মনখারাপও ছিল।
মনে পড়ে গত মাসে এইখানে বসে ভেবেছিলাম—একটা ঠকে-যাওয়া জনম নিয়ে জন্মালাম বুঝি। তারপর হাতের তালুতে তাকিয়ে থেকে দেখেছিলাম—হাতের রেখা পরাজিত হয়ে বসে আছে৷ সেখানে একটা প্রজাপতির মুখ আঁকা৷ মুখের ঠিক উপরে লেখা—‘মন্দভাগ্য অন্ধরেখা’। ভাগ্য কখনো শুভ হতে চাননি, হয়তো মন্দও মন্দ না।
বাড়ির সাথে পুকুর। পুকুর মাঝেমাঝে ভুড়ভুড়ি ছেড়ে নিঃশাস নেয়। পুকুর যে নিঃশ্বাস নিতে জানে, তা আমি জানি৷ বাসি রাতের বদগন্ধ ভরা নিঃশ্বাসের ওঠানামা তখনো চলছে। পুকুরে এখন জল নাই তেমন-একটা। তবে বর্ষাকালে জলে থৈ থৈ করা ভরা পুকুর থাকে। মা, বর্ষা মৌসুমে পুকুরের দেহে কান পেতে শুয়ে থাকেন। যদি বাড়ির পাড় ভেঙে যায় ছোট ছোট ঢেউ এসে। তথাপি পুকুর আমাদের বাড়ির অনেকখানি জায়গা খেয়ে নিয়েছে। পুকুরের ঘাটলাটা এখনো আছে, তবে সেটা ব্যবহারের অনুপযোগী। সেখানে অনেক বুনো কচু জন্মেছে। কচুগাছের উপর কিছু ফড়িং কফিনবহনের স্মৃতি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বারান্দার দক্ষিণ কোনায় তালা-ঝুলানো পুজোর ঘর। পুবের দিকে একটাই জানালা, তাও বন্ধ। এই ঘরে এখন আর মা পুজো দেয় না। পুজোর ঘর—ঘরের ভেতর আরেকটা ঘরে সরিয়ে নিয়েছে, তাও তো অনেক বছর হলো। তবু বারান্দার পুজোর ঘরের দরজায় একটা শিশুকালের কৃষ্ণের ছবি আছে। আমি ভাবছি—শিশু কৃষ্ণের এই হাসি আমি কাউকে লিখে দিব না।
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- বাড়ি || শুভ্র সরকার - August 20, 2026
- মায়ের নিঃশ্বাস || শুভ্র সরকার - June 30, 2026
- ছায়ানৈকট্যে বসে থাকেন একজন দেবেন বিশ্বাস || শুভ্র সরকার - June 18, 2026

COMMENTS