
১৪.
আকাশের তারারা ঝাঁক বেঁধে মাটিতে নেমে এলে কীরকম অলৌকিক দৃশ্য জন্ম নেবে, স্বচক্ষে দেখবার সৌভাগ্য হলো আজ। তারা-বিছানো কোনো পথ ধরে হেঁটে গেলে কতটা আলো এসে মনের সব বদ্ধ দুয়ার খুলে দেয়, জানা হলো সেসবও। ক্যানাডার লন্ডন সিটিতে শুরু হয়েছে Fall। অবিশ্রাম ঝরে পড়ছে গাছেদের পাতা। মেইপল লিফই বেশি। আরও আছে বার্চ আর ওক গাছেদের পাতা। মেইপল গাছের পাতাদের আছে নানা রঙের বাহার।
হলুদ, হলুদাভ, লাল, লালচে, বাদামি, চকলেট হরেকরকম রঙ নিয়ে ওরা বিছিয়ে রয়েছে পাকারাস্তার দুইপাশ জুড়ে। মেইপল পাতার শেইপ দেখলে রাতের তারকারাজি বলে ভ্রম জাগে। নানা রঙের কারণে সেরকমই উজ্জ্বল ও মনোমুগ্ধকর এরা।
বাংলাদেশের দ্বীপ সেন্টমার্টিনে একবার তারা-ভরা-রাত দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সে-রাতে বাতাসে ছিল শুধু ঢেউয়ের হিসহিসানি, ফিসফিসানির গুঞ্জন। আর মাথার ওপরের নিকষ কালো আসমান। সেই আসমানে ছিল খইফুলের মতো অগণন তারকারাজি। যেন কেউ কালো জমিনের বেনারসী শাড়িতে বহু যত্নে ফুটিয়ে তুলেছে সলমাজরির কারুকাজ। আর সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারুকাজ নেমে এসেছিল একেবারে স্পর্শের বৃত্তে। হাতের নাগালে। আমি প্রচণ্ড বিস্ময় নিয়ে দেখছিলাম বড় বড় তারারা ফুটে আছে সূর্যমুখী ফুলের মতো। ফুটে আছে তাদের হলুদাভ পাপড়ি ছড়িয়ে। আহা! সে কী নয়নাভিরাম দৃশ্য! যেন এখুনি কোনো তারার ডানা ধরে আমি ভেসে যেতে পারব আলোর ঝর্ণাধারা হয়ে। ভেসে যেতে যেতে কিছু মেঘেদেরও ছুঁয়েছেনে নিতে পারব। আর নিচের দিকে তাকালে দেখব শাদা ফেনার ফণা দুলিয়ে রাশি রাশি উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে! ফেইরি টেইলে যে-রকম দৃশ্যাবলি দেখতে পাওয়া যায়, ঠিক সেইরকম।
ভারি অবাক ব্যাপার হলো স্প্রিংব্যাংক গার্ডেনের পাকারাস্তার কালোটুকু বাদ রেখে পাতারা ঝরেছে। হয়তো মানুষের পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঝরাপাতা সব গিয়াছে সরে। আর পথ করে দিয়েছে মানুষের হেঁটে যাওয়ার। মৃতবৎ পাতারাও জানে, কোনো পথচারীর পথ আটকে রাখা বড় অন্যায়। যে যেতে চায়, তাকে যাওয়ার জন্য পথ ছেড়ে দিতে হয়। আর যে থাকতে চায়, তার থাকবার ঘরটিতে আচ্ছাদন দিতে হয়। হোক-না সে আচ্ছাদন ভেন্নাপাতার!
এতকিছু জেনেবুঝে পাতারা এমন করে ঝরে পড়েছে, সে-রকম নাও হতে পারে। কিন্তু অস্বীকার করার যো নাই—সৃষ্ট হয়েছে অপূর্ব এক চিত্রকলার! কালোজমিন-বেনারসীর মাঝখানটা বাদ রেখে চারপাশ জুড়ে ফুটে আছে সলমা-জরির নিখুঁত এমব্রয়ডারি। ঝরাপাতাদের এমন করে ছবি আঁকতে দেখে মনের ভিতর সুরের ইন্দ্রধনু জেগে ওঠে—
এই মোমজোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে / এসো না গল্প করি / দেখো ওই ঝিলিমিলি চাঁদ / সারারাত আকাশে সলমা-জরি…
রাতের কালোকিষ্টি আকাশের জোছনায় সলমা-জরির কারুকাজ আমার আগে আরও ঢের লোকজন দেখে গ্যাছে। কিন্তু এখানে সমস্যা তো দেখাদেখিতে নাই, সমস্যা আছে দিনে আর রাতে। সূর্য আর চন্দ্রে। কারণ এখন এইখানে রাত কই?
এ-রকম ফটফটা দিনের আলোর মাঝে আমি কিনা জোছনা দেখি! অবশ্য না দেখেই বা উপায় কী? তারাধূলিপথ বেয়ে আমি যখন হেঁটে যাচ্ছি, আমার পায়ের নিচে কালোনদীর রেখা। খানিকটা গিয়েই এই নদীর দুপাশের তারারা কিছুটা সরে গিয়ে ঘাসের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। আর এই ঘাসেরা যেন ফিকে-সবুজ হয়ে ইন্তেজার ঘোষণা করছে মরে যাবার। ঘাসেদের মতো মানুষও কি মরে যাওয়ার আগে ফিকে-সবুজ হয়ে ওঠে? কী জানি! দেখা হয় নাই আমার।
ওই যে এক ঘোরগ্রস্ত কবি ঘাসের সবুজ আর লতাপাতার ভিতর, হেমন্তের কোমল আলোর ভিতর, ধানসিঁড়ি নদীর কাছে নিজেকে কেমন অবলীলায় সমর্পণ করে গেলেন!
কাঁচা বাতাবির মতো সবুজ ঘাস—তেমনি সুঘ্রাণ— / হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিড়ে নিচ্ছে। / আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো / গেলাসে গেলাসে পান করি, / এই ঘাসের শরীর ছানি—চোখে চোখে ঘষি, / ঘাসের পাখনায় আমার পালক, / ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার / শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।
উঁহু, না, আজকের দিনে আমি ঘাস নিয়ে কিছুতেই অবসেসড নই। আমি বরং ভাবছি এই তারাধূলিপথের মাঝে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে খানিকটা বিশ্রাম নেয়া যাক। আর আমার কানে এসে বাজুক মেইপললিফ, ওক আর বার্চের মর্মর…!
২৪ অক্টোবর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৪ || পাপড়ি রহমান - August 14, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৩ || পাপড়ি রহমান - August 7, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১২ || পাপড়ি রহমান - August 1, 2026

COMMENTS