ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৭ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৭ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

১৭.
পাঁচতলায় কাচের বিশাল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। মনোযোগ দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছি—সরু সরু, প্রায় সুতার মতো তুলো উড়ছে। ফ্লারি! ফ্লারি! ফ্লারিরা উড়তে উড়তে চলে যাচ্ছে নিচের দিকে। খানিক বাদেই ওইসব সরু-সুতা একপাল প্রজাপতি হয়ে উঠল। আর ঝাঁক বেঁধে উড়তে শুরু করল। শাদা-শাদা অজস্র প্রজাপতির ঝাঁক গিয়ে স্তূপ হতে লাগল গাছলতা আর ঘরবাড়ির মাথায়। মুহূর্তে বয়স্ক হয়ে উঠল তরুণ অথচ ব্যস্ত এক নগরী। টরন্টো শহরে এ-বছরের প্রথম স্নোফল। আমার তিনকুড়ি লাইফের প্রথম স্নোফল।

যেন অজস্র শিমুলফল ফটাফট ফেটে চলেছে। আর বুকের ভেতর ছোট্ট বীজ পুরে হাওয়ায় ভেসে চলেছে তুলার রাশি।

নিয়তির হাতে বরাবর মার-খাওয়া আমি আজ এক দুর্লভ দিনের সাক্ষাৎ পেলাম। দুর্দান্ত হ্যান্ডসাম ও মারাত্মকরকম স্মার্ট পুরুষ আমাকে নিয়ে চলল বরফ-ছাওয়া শহর ঘুরে দেখাতে। যেন কোনো ক্ল্যাসিক মুভির দারুণ ক্ল্যাসিক দৃশ্য! কিছুটা করুণও বটে!

যদিও আমার কোনোকালেই কোনো অপ্রাপ্তি নিয়ে আহাজারি করার টাইম জোটে নাই, অথচ আজ কেন যেন নিজের করা ভুলগুলি কঙ্কালের মতো দাঁত বের করে হাসছে! এতদিন বাদে মনে হচ্ছে, ফালতু আবেগে ভেসে গিয়ে নিজের কী বিপুল পরিমাণ ক্ষতি আমি করেছি—যার মূল্য আমাকে সারাজীবন ধরে চুকাতে হয়েছে! আজ অদ্ভুত সুন্দর একটা দিনে, উচ্ছলিয়া ওঠা বেদনার ভার সয়ে ভাবতে হচ্ছে—

জীবনের গাড়িখানি মসৃণ চালাতে হলে পাশে একজন দক্ষ ড্রাইভার থাকা দরকার। যে হাতের কৌশলে বরফ-ঢাকা পথ অনায়াসে পার করিয়ে দিতে পারে। যে বড় যত্ন করে জ্যাকেটের জিপার টেনে বন্ধ করে দিতে পারে। আর তার টংকার যেন হয় নিঃশব্দ। আমার সম্মানের যথার্থ মূল্য দিতে যেন তার আঁজলা পরিপূর্ণ থাকে। যখুনি প্রয়োজন পড়বে, সে যেন অকাতরে সেসবের সদব্যবহার করতে জানে।

কিন্তু হায়! কী করেছি আমি আমার এত সাধের জীবনখানি? আজ বড় আফসোস হয়! আজ নিজেকে বড় দীনহীন মনে হয়! মনে হয়, জ্বলে জ্বলে এমন অঙ্গার হওয়ার তো কথা ছিল না! সাপকে রজ্জু ভেবে ধরা খাওয়া পাবলিক আমি—এখন সারাজীবন ধরে সেসব মর্মান্তিক ভুলের মাশুল দিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণ হবে না। ক্ষতি পূরণ করা যাবে না। নিজেকে শুধু এটুকু বলতে পারা যায়—

ভুল, সবই ভুল! এ জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা আছে ভুল…

মাথা কুটে রক্তাক্ত করে ফেললেও সেসব ভুল শোধরানোর আর কোনো উপায় নাই! একবার মরে গিয়ে বারবার জন্মালেও কিছুই শোধরাবার নয় আর।

আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য—সমস্ত শহর যেন এস্কিমোরা দখল করে নিয়েছে! দখল করে বরফ ঢেলে ওদের সুবিধামতো সাজিয়েগুছিয়ে নিয়েছে!

ঘুরতে ঘুরতে কত নদী আর কথ পথ যে পেরিয়ে যাই। কত কথা আর গান। ভারী বুট পায়ে আমি বরফে পিছলে পড়ার ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকি। কিন্তু ওইরকম দুর্দান্ত স্মার্ট পাশে থাকলে ভয় কী মরণে? মাতঙ্গ মেতে থাকে সমর রঙ্গে।

কিংবা, হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে পথ চিনি না…

আহা! জীবনের ঘাটে ঘাটে পোড়-খাওয়া দুইমানুষের পথ আর কতটাই বা আগাতে পারে। দামাল হাওয়া আর হিমের দিনে ওরা আরেকটু ন্যুব্জ হয়। একই পথের পথিক হলে হয়তো হাতখানিও ধরা যায়। বা, হাওয়ার প্রকোপ বাড়লে খামাখাই নিজেকে শোনানোর মতো করে বলা যায়—আই লাভ য়্যু।

অ্যাজ্যাক্স ওয়াটারফ্রন্ট পার্কের লেকের আশেপাশের সবই বরফ-আচ্ছাদিত। ইচ্ছেমতো ঝরছে তারা। আগেও যেমন ঝরেছে…!

অশ্রুর একটি ফোঁটায় জন্ম আমার, আমার মরণ / নীরবে জাতিস্মরের গল্প বলা তোমার ধরন / ঝরেছো আগেও তুমি বৃষ্টি হয়ে, আবার ঝরো— / এ কেমন কান্না তুমি আমায় যখন আদর করো!!

সে আমার হাত বড় যত্ন করে ধরে বরফপথ পেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। দাঁড় করিয়ে দেয় অ্যাজ্যাক্স লেকের সামনে। আমি ভয়ে ভয়ে তাকাই—উত্তাল জলরাশি আছাড়িবিছাড়ি করে আছড়ে পড়ছে তীরে। দামাল হাওয়ায় যেন ওরা অস্থির হয়ে উঠেছে।

লেকের জলকে উদ্ভ্রান্ত করে দিয়েই ক্ষান্ত নয় আজকের হাওয়া, আমাকেও উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। এ বরং ভালোই হয়। উড়ে যাক যা-কিছু পুরাতন আমার! উড়ে যাক যা-কিছু অপ্রাপ্তি আমার!

ওগো বৈশাখী ঝড়! ল’য়ে যাও অবেলায় ঝরা এ মুকুল / ল’য়ে যাও বিফল এ জীবন—এই পায়ে দলা ফুল॥ / ওগো নদীজল লহো আমারে / বিরহের সেই মহা-পাথারে, / চাঁদের পানে চাহে যে পারাবারে—অনন্তকাল কাঁদে বিরহ-ব্যাকুল॥

০৯ নভেম্বর ২০২৫


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you