
১৯.
ব্যাটে-বলে মিলে যাওয়া বন্ধুত্ব খুব অল্প জুটেছে এ-জীবনে। হয়তো আমি নিজেরই স্বভাবদোষে হয়েছি আলাদা। নিজেরই শতসহস্র দোষে ছিটকে পড়েছি পথের প্রান্তে। কখনো-বা কাঁটাঝোপে। তখন নিজেকে মনে হয়েছে—
বিশাল আকাশ হতে কিছু তারা খসে পড়ে যেমনি,
পৃথিবীতে আমি যেন তেমনি…
স্যাপিওসেক্সুয়ালিটির দিকে হেলে আছি বিধায় কথাবার্তা বলেও আনন্দ পাই খুব কম মানুষের সঙ্গে।
যে অল্প কয়েকজন বন্ধুর সাথে জগতের আনন্দযজ্ঞ উপভোগ করি, উম্মে কুলসুম রত্না তাদের অন্যতম। সে হলো আমার নিজের ছায়ার মতন বন্ধু। ‘ক’ বললেই যে বুঝতে পারে আমি অসময়ে কোকিলের ডাকের কথা বলছি। বা কাকের বাসায় ডিম পেড়ে যায় কোকিল এই প্রাকৃতিক রহস্য নিয়ে কথা বলছি।
ছোটকালের বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আমার লাগেজপত্র রত্নাই টেনেটুনে নিয়ে গেল ওর বাসায়। সুদীর্ঘকাল ধরে আমি অস্টিওপরোসিসের রোগী। তাই ভারী কিছু বহন করাতে আছে ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা। এক্স ক্যাডেট রত্নার কাছে সব কাজই ডালভাত। তবে ও যা-ই করুক না কেন, সবকিছুতেই বড় যত্ন, আন্তরিক ভালোবাসাটা স্পষ্ট হয়ে ফুটে থাকে।
ওর বাসায় গিয়ে দেখি সব মোগলাই ব্যাপারস্যাপার। আমি মাছ খেতে পছন্দ করি বলে স্যামন থেকে রুই, বাছা (ক্যানাডিয়ান মাছ। আমাদের পাংগাস টাইপের কিছু একটা হবে। খেতে সুস্বাদু), পুটি-পাবদা কিছুই সে বাদ রাখে নাই। আর সকালে দিলো দারুণ নিউট্রাসিউটিক্যালস ও ডেকোরেটিভ ব্রেকফাস্ট। তাতে এভোকেডো থেকে ড্রাগনফ্রুট সবই পরিমিত ছিল। ওর হাতে সাজানো চারকিউরি-বোর্ড দেখেই চোখে জল চলে এল। এত যত্ন করে কে কবে আমাকে খেতে দিয়েছে? আতকা মনে পড়ে গেল একজন তার আনাড়ি হাতে এক সকালে এক ট্রে ফল সাজিয়ে দিয়েছিল আমার সম্মানে। আমি সেদিনও কেঁদেছিলাম তার অগোচরে।
টরন্টো শহরে যা যা পেয়েছে রত্না সব কিনে ঘর বোঝাই করে রেখেছে আমার জন্য। পারফিউম থেকে গলার পেনডেন্ট পর্যন্ত। আমি বহুকাল ধরেই জানি, এই নারীর আছে অত্যন্ত পিসফুল-সউল!
আগেই মানা করে দিয়েছিলাম ওকে—আমি থাকাকালীন সময়ে নো কিচেন, নো রান্নাবান্না। থাকবে শুধু আমাদের বাকবাকুম আর বকরবকর। লাগাতার হাহাহিহির সাথে অনিদ্রা। আগেভাগে বলে দেয়াতে কারো কাঁধেই নেই কোনো বোঝার ভার। আজ তাই বেরোলাম টরন্টো শহর টইটই করতে। বিশ হাজার স্টেপ হাঁটলাম দুইজন তেঁতুলপাতার নৌকো চেপে।
সাবওয়ে ধরে রত্না আমাকে নিয়ে গেল ওর ক্যাম্পাসে। টরন্টো ইউনিভার্সিটি। যেখান থেকে ও পিএইচডি করছে। ওর বসবার একান্ত রুম, সেমিনার, লাইব্রেরি। আমি ছবি তুললাম ওর টেবিলের ওপরের দেয়ালে লেখা উম্মে কুলসুমের। হিমের বাড়াবাড়ি ছিল। স্নোজ্যাকেট পরা ছিলাম দুজনই। আমার ছায়ার মতো বন্ধু—সে কী আমাকে খালি হাঁটিয়েই তৃপ্ত হবে নাকি? সে তখন আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফার। কত শত অ্যাঙ্গেলে যে ছবি তুললো আমার! ফুলের সাথে, পাখির সাথে। গাছের ছায়ায়। ঝরা পাতায়। উদাসী বনের বাঁকে। টরন্টোর বিশাল মনুমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে, পেছনে ছাড়িয়ে। হা ভগবান! এত পেশেন্স কেন এই নারীর?
আমাদের সমান্তরাল ভ্রমণ কি সহসা ফুরোবার কথা? যেই শুনেছে আমি এদের ট্রামে চড়তে চাই (ট্রামকে এরা স্ট্রিটকার বলে থাকে), অমনি ট্রামে উঠে পড়ি দুইজন মিলে। আমি ভাবি এমন অন্তবিহীন চলা যদি আর না ফুরাতো?
এই পথ যদি না শেষ হয় / তবে কেমন হতো তুমি বলো তো? / যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয় / তবে কেমন হতো তুমি বলো তো…
রত্নার সাথে আমার বহু মিলঝিলের মাঝে প্রধান যেসব—অন্যকে মন থেকে সম্মান করা, ভালোবাসা। প্রিয়বন্ধুকে কোনো বিষয়ে আহত না করা। বন্ধুর কাছে মিথ্যাচার থেকে দূরে থাকা বা মিসগাইড না করা।
মাত্র এই কয়েকটা বিষয়, ব্যাস এটুকু নিয়েই তেঁতুলপাতায় বসবাস করতে আমাদের আর কোনো সমস্যাই হয় নাই কোনোদিন।
(তবে ভবিষ্যতেও হবে না, এটাও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। ইয়ে মানে কেউ ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে কালোযাদুটাদু করলে সমস্যা হলে হতেও পারে!)
আরও দুই-একজন বন্ধু যদি ওর থাকতো আমার? নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, কিন্তু মেলে নাই কোথাও (তার মানে এই নয় যে, আমি আমার অন্য বন্ধুদের ছোট করছি, মোটেও তা নয়। যা সত্য তা অকপটে বলছি)।
একটা বড়সড় লুনি স্থির হয়ে বসে আছে। আদতে ওটা লুনির ভাস্কর্য! রত্না বলে—ওর পাশে দাঁড়ান, আপা।
অক্লান্ত এই নারী আমার সহস্র ছবি তুলে ফেলেছে ইতোমধ্যে। এবার ক্ষান্ত দাও হে শান্তিপূর্ণ হৃদয়ের মানুষ! কে শোনে কার কথা? আমরা ফের হাঁটি। খিদে পেলে খাই ড্রাইফ্রুটস আর আধখানা করে গ্যানোলাবার। এনার্জি বহাল রাখতে হবে যে!
হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে টরন্টোর ডাউনটাউন দেখা হয়ে যায়।
আমি আনমনে বলি, ক্যানাডা দেশের বাসে তো চড়া হলো না। হবেও না হয়তো। যখন আমার বড়কন্যাটি নিজের গাড়ির চালক নিজেই। তাহলে আমার বাসভ্রমণের কী হবে?
রত্না বলে—চলেন এইবার তাইলে বাসেও যাই।
বুঝতে বাকি থাকে না, এই নারীর সামনে অপূর্ণ থাকিবে না আমার একটি ইচ্ছাও!
সাবওয়ে থেকে নেমে বাসে উঠে পড়ি দুইজন। একসময় আমাদের বাসভ্রমণও সাঙ্গ হয়।
এবং সাঁঝের পাখিরা ফিরে আসে আপন কুলায়…
১৪ নভেম্বর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৯ || পাপড়ি রহমান - September 19, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৮ || পাপড়ি রহমান - September 11, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৭ || পাপড়ি রহমান - September 4, 2026

COMMENTS