একটি রাতের জন্য সব উল্টোপাল্টা হোক
চুলোয় যাক এ আপোস-অভাব লাভ-লোকসান-ক্ষোভ
একটি রাতের জন্য সেই হারানো সুর বাজুক
এই রাতটা তোমার-আমার…
রাপ্পা রাপ্পা রাবাবা বাপ্পা রাপ্পা রাপ্পা হো…
—অঞ্জন দত্ত
আমেরিকায় একটা ব্যাপার রয়েছে—এইটা আমাদের মধ্যে যারা আংরেজি সিনেমা দেখে থাকেন নিয়মিত অথবা পপুলার পেপারব্যাক নভেলের পোকা ছিলেন বয়সকালে, তারা ব্যাপারটা কালচারাল কন্টেক্সট সহ উইথ মেরিট-ডিমেরিট বুঝবেন ভালো—ব্যাপারটাকে এককথায় বলা হয়ে থাকে ‘স্যাটার্ডেনাইট ফিভার’। বাংলা করলে কেমন দাঁড়াবে কথাটা?—শনিজ্বর? শনিবারী বুখার? ওই-রকমই। ব্যাপারটা হলো, শনি-রবি ওখানে সপ্তাহান্তের ছুটি। দুইদিনের নিস্তার। একজোড়া ছুটিদিন। সকলে যে-যার মতো উল্লাসে একাএকা বা পারিবারিক-অপারিবারিক সজোড়-বেজোড়-সবান্ধব-নির্বান্ধব তন্দ্রাহারা মাস্তিতে-মত্ততায় উইকেন্ড কাটায়। যে-যার মতো সমাগত-পরহপ্তার ফ্যুয়েল ভরে নেয়। কেউ বিচে, কেউ সরাইখানায় কম্বলতলে, কেউ খোলা-আকাশতলায় তারাশামিয়ানার নিচে, কেউ কলোরাডো-কালাহারি জঙ্গলে ক্যাম্পফায়ারটেন্টে, কেউ নিজ-বাসভুমে, কেউ রাত্রিডেরায় ক্যামেলিয়ায়-রঙ্গনে। কেউ নেচে, কেউ গেয়ে, কেউ হুল্লোড়ি হিক্কা তুলে সুরাসক্ত ভুলে থাকে কাজের চাপ, জীবনের জঙ্গম, অচরিতার্থতার দলা-পাকানো বোধ, ভুলে যায় মায়ামোহময় এ অপার জগৎ।
তো, শনিবার রাতে ওরা মত্ত থাকে—বেশিরভাগ আমেরিকানদের ক্ষেত্রেই এটা সত্য—মদে ও মাৎসর্যে মহিলায়। অথবা নারীরা/মহিলারা মত্ত থাকে পছন্দসই পুরুষে। এবং সমে। এবং বিষমে। এবং অসমে। এমন বহু মর্মে। এমনকি টিনেজারদের বেলায়ও শনিবারী জ্বর ক্রিয়াশীল। পারিবারিক পরিসরে, হাউজহোল্ড লেভেলে, জায়া ও পতি পরস্পরে নিমগ্ন হন বড় নচ্ছারভাবে, দ্যাট মিন্স কারণবারিবিক্রিয়ায় প্রটেকশন ভুলে গিয়ে। উইকেন্ডস্ফূর্তিতে বল্গাহারা যাপন করে সবাই শনিযামিনী মধু ও মক্ষিকায় মত্ত-মাতোয়ারা হয়ে। ব্যাপারটা স্ট্রাইক করেছিল প্রথম জন লেননের অটোবায়োগ্রাফি পড়তে যেয়ে।
লেনন, বিটলস খ্যাত, সবাই চেনেন। গিভ পিস আ চান্স…ইউ মে স্যে আ’য়াম আ ড্রিমার, বাট আ’য়াম নট দি অনলি ওয়ান…লুসি ইন দ্য স্কাই…ইত্যাদি। আজ থেকে পাক্কা আট বছর আগে পড়েছিলাম বইটা, কালেকশনে নাই, শিরোনামও ভুলে গেছি। বাংলা অনুবাদে, পেপারব্যাক বই, বেরিয়েছিল ওপারের মনফকিরা থেকে। একইসঙ্গে বেরিয়েছিল বব ডিলানের আত্মজীবনী, বঙ্গানুবাদিত, মনফকিরা থেকেই। দুটোই খরিদ করেছিলাম, নগদ কড়ি ফেলে, বন্ধুকে উপহার দেবো বলে। সমরখন্দের বদলে বই। বাঁচোয়া। না-হলে আমার মতো অল্পপ্রাণ কেরানির যে কী হতো! বহু বহু আট বছর আগের একদিন। যা-হোক, পয়েন্ট ছেড়ে যাচ্ছিলাম, ফেরা যাক।

শনিবারী জ্বরের ব্যাপারটা দারুণ চাঞ্চল্যকর জবানিতে লেনন বলেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে, বেদনার সঙ্গে, মারাত্মক মর্মস্পর্শী আত্মসমালোচনার ভঙ্গিতে। বলেছিলেন, বেশিরভাগ আমেরিকানই এই স্যাটার্ডেনাইটের সাময়িক জ্বরের জের! তিনি বলেছিলেন তাঁর প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে, বলেছিলেন তাঁর নিজের সন্তানের জন্ম বিষয়ে বলতে গিয়ে, এতদবিষয়ে এমনকি তিনি নিজের বাপ-মায়ের সম্পর্কেও সন্দিহান যে তাদের সানন্দ মিলনের ফল নাকি কোনো-এক উন্মত্ত মুহূর্তের অসচেতন উপগত হবার নিরানন্দের ফসল তিনি। সেই অর্থে, তাঁর মতে, প্রত্যেক আমেরিকানই জন্মগতভাবে অবাঞ্চিত, অনাকাঙ্ক্ষিত। অন্তত পিতামাতার প্রেমজ প্রসূণ যে তারা নয়—নিজের সন্তানজন্ম ও বন্ধুদের সন্তানজন্মের তথ্যাবলি ভিত্তি করে লেনন বলছেন—এইটা আন্দাজ করা যায়।
আমাদের এখানকার সন্তানেরা আশঙ্কার ভিতর থেকে জন্মায়। আশঙ্কার ভিতর দিয়া আকার পায়। আনন্দধৈবত বাজায়। আমাদের বাবামায়ের সন্তানের সন্ততির সকলেরই জীবন আগায় আশঙ্কায় আশঙ্কায়। আমাদের স্যাটার্ডেগুলা সানডের কর্মস্থলের কালিমায় ঘেরা। খামাখায় দিবারাত্র ঘুরে ফেরা। আমাদের ফ্রাইডেগুলা তার তুলনায় খানায়পিনায় মাস্তিমৌজে যায়।
স্যাটার্ডেনাইট ফিভার ফেনোমেনাটা লাস্ট সেঞ্চুরির সেভেন্টিসের দিকে অ্যামেরিকান আর্বান কালচারে ইমার্জ করতে থাকে জোরেশোরে। এই পিরিয়ড অফ টাইমেই ডিস্কোথেকগুলি ইউএস ইউকে হয়ে দেশে দেশে মেইনস্ট্রিমে জায়গা জুড়তে শুরু করে। এই সময়েই মানুষের সমাজে লেবার ডিভিশনে চেইঞ্জ সূচিত হতে থাকে। সেইটার কারণে ডেইলি ওয়েইজেস আর্নারদের দৈনিক থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা হ্রাস পায়। মানবেতিহাসে এই ঘটনাটা, এই পরিবর্তনটা, আমূল অভিঘাত রাখে। এক্স্যাক্ট টাইমটা অ্যারাউন্ড সিক্সটিস বা আরেকটু আগে লেইট ফোর্টিস আর্লি ফিফটিস থেকে, ফর দ্য টাইমস দ্যে’আর অ্যা চেইঞ্জিং, যেমন বিবরণ পাই ওই সময়ের বব ডিলান ছাড়াও পপ মিউজিকের আরও অন্যান্য প্রথিতযশাদের গানে। এই সময়েই ম্যাডোনা মাইকেল জ্যাকসন অ্যান্ড অন অ্যান্ড অন গ্লোব্যালি পপুলার আইকনদের উত্থান ঘটছে। এর আগে হিপি বিটনিক বহুকিছু পর্যায় থেকে পর্যায়ান্তর গিয়েছে। এই ফেইজগুলি বুঝতে হেল্প করে এমন কিছু বই বাংলায় আছে।
একই নামে একটি সিনেমা আছে, লেতিপেতি সিনেমা নয়, একেবারে কাল্ট, আমাদের অনেকেরই জন্মবছরে কিংবা তার আগে সেই সিনেমা রিলিজড, জন ট্র্যাভোল্টা কাস্ট, বিজিসের গানগুলা ব্যবহৃত হয়েছে এই সিনেমায়, অ্যামেরিকান ড্যান্স ড্রামা ঘরানায় ‘স্যাটার্ডে নাইট ফিভার’ ম্যুভিটায় ডিস্কোর ভিতর দিয়ে সেই সময়ের আমেরিকার ওয়ার্কিং ক্লাসটাকে এক্সপ্লোর করা হয়েছিল। তথ্য বলছে, এই সিনেমাটা বানানো হয়েছে একটা ফেনোমেনাল বই বেইস করে; সেই বইয়ের নামটা খেয়াল করবেন, ‘ট্রাইব্যাল রাইটস অফ দি নিউ স্যাটার্ডে নাইট’, নিক কন নামে এক রাইটারের বই। পড়ি নাই। কিন্তু সিনেমাটা কাল্ট এই কারণে যে, এর পরবর্তী দুই দশকে এই কায়দায় সারা দুনিয়ায় ফিল্মি প্রোজেক্ট হয়েছে। এইদিকটায় বাংলায় হিন্দিতে এবং অন্যান্য ভাষায় ডিস্কোর ভিতর দিয়া ছায়াছবি ডিজাইন ও প্রোজেকশন অত্যন্ত ঊর্ধ্বগামী ছিল তখনটায়। ম্যাসালা ম্যুভি সেগুলি। মিঠুন চক্রবর্তী ইন্ডিয়াপার্শ্ববর্তী ফিল্ম অ্যারিনায় একটা কাল্ট তৈরি করেন ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ সিনেমায়। একটা লম্বা টাইম ধরে এইটাই আঞ্চলিক প্রতিবেশী ভূখণ্ড ও ভাষাগুলায় রিপিটেডলি অনুরূপায়িত হতে দেখা যায়। ‘স্যাটার্ডে নাইট ফিভার’-এর জন ট্র্যাভোল্টা কায়দায়।

ফিভারটা আমাকে একদম তড়িতাহত করেছিল বইয়ের মারফতেই। কিন্তু সে অন্য বই। সিনেমা দেখার একযুগ দেড়যুগ আগে এক বই পড়েছিলাম। বাংলা বই। জন লেনন সম্পর্কিত ও সাক্ষাৎকারের সম্পাদিত সংকলন। অনুবাদের। ‘মনফকিরা’ নামে এক ইন্ডিয়ান প্রকাশনী সিরিজ করেছিল কয়েকজন মিউজিশিয়্যানের। লেননেরটার নাম ‘গান ছাড়া জানি না কিছুই’। সন্দীপন ভট্টাচার্য ‘মনফকিরা’ থেকে এমন অনেক কাজই করেছেন যা পাশ্চাত্য সত্তরের দশক ষাটের দশকটাকে আমার চোখে শেইপ দিতে হেল্প করেছে। স্যাটার্ডে নাইট ফিভার ব্যাপারটা আমায় ভাবিয়েছিল জন লেননের ইন্টার্ভিয়্যুয়ের কথাগুলায়।
আমেরিকানদের জাতিগত এই বেদনাদায়ক চিত্রটি তিনি নিদারুণভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ওই আত্মজৈবনিক রচনায়, এতটাই ভেতরগত বেদনার সঙ্গে, পড়তে পড়তে গা হিম হয়ে গিয়েছিল মনে আছে। এইটা শুধু আমেরিকীয়দের নয়, এখন, ইত্যবসরে এইটা প্রায় পৃথিবীজোড়া বাস্তবতা। আমরাও এই বাস্তবতার বাইরে নেই আর। আমরা মানে আমাদের সন্তানেরা। তারা আর আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত সচেতন-সপ্রেম সিদ্ধান্তের ফল তত নয় বোধয়, একটা মুহূর্তের ভুলের, একটা জালের অনুপস্থিতি কি একটা ছাতার চোরাফুটো গলে বেমক্কা আতঙ্ক এক। পরে মেনে নেয় পৃথিবী, পিতামাতার গোমড়া মুখ আলো হয় একদিন, কিন্তু কথা তো কথাই। শিশুটি না-জানিল, তার জিন বুঝি বহন করবে না এসব? তো, ফর্গেট ইট, লেট’স গো…চলো, আমাদের আজ বৃহস্পতিফিভার! চারিদিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি…
—জাহেদ আহমদ
- রচনাটা আজ থেকে একযুগ আগে দুইহাজারচৌদ্দয় ফেইসবুকে ইন পাব্লিক পোস্টেড।—লেখক, সেপ্টেম্বর দুইহাজারছাব্বিশ
গানপারে জন লেনন
- স্যাটার্ডেনাইট ফিভার - September 19, 2026
- জলিন, ননমেশিন বাংলায় : অ্যা ট্রিবিউট টু ডলি পার্টন - September 1, 2026
- কবিবন্ধুর পিতৃবিয়োগ ও দূরধ্বনিত রেলহুইস্যল - August 29, 2026

COMMENTS