
১৬.
মানুষ কি নিজের কাছে নিজেই ক্লান্ত বোধ করে না? কেউ করুক বা না করুক আমি তো করি। এমনকি প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভেঙেচুরে নুয়ে পড়ি। হাজার কাজের মাঝেও আমার তাই দম নেবার জন্য আলাদা স্পেস লাগে। লাগেই লাগে। নিজের কাছে নিজেকেই বেশ কিছু সময় একা করে দিতে হয়। নিজেকে দেখবার জন্য, জানবার জন্য। নিজের সাথে অযুতনিযুতকোটি বোঝাপড়ার জন্যও আমাকে একা হতেই হয়। ওয়ান কাইন্ড অব মেডিটেশন!
এ না হলে মস্তিষ্কের জট খোলা যায় না। এই ধরণীকে ভালো করে বোঝা যায় না। বাতাসের সুর শোনা যায় না, কিংবা বোঝা যায় না জলের ভাষা!
আমার কাজের মাঝে মাঝে / কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে…
ঢেরদিন হয়ে গেল এখানে আছি, তাই চাচ্ছিলাম দিবারাত্র পরিশ্রম করা মানুষদুটি সামান্য ব্রিদিং-স্পেস পাক। হোক না সে আমার নিজের সন্তান! নিজেদের মতো করে ওরা কোয়ালিটি টাইম কাটাক। নিজেদের আয়নার সামনে নিজেরা আপনমনে দাঁড়াক । নিজেদের মতো করে হাসুক বা কাঁদুক । কিংবা গলা খুলে গান করুক।
আমি যেখানেই যাই বা থাকি, সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয় ভয়ভাবনায়—আমার জন্য অন্য কারো প্রবলেম হচ্ছে না তো? আমি কারো জন্য লোড হয়ে যাচ্ছি না তো? আমি কাউকে বেকায়দায় ফেলছি না তো?
টরন্টো এয়ারপোর্টে প্লেন ল্যান্ড করলেও শহরটা ঘুরে দেখবার অবকাশ জোটেনি। তাই ওই শহর বারবার ডাকছিল আমায়। তাছাড়া ছোট ও বড়বেলার বন্ধুদের আন্তরিক নিমন্ত্রণ ছিল। তাদের সাথে ধুন্দুমার-আড্ডার হাতছানিও ছিল। ফলে ছুটতে হলো চক্ষু মেলিয়া দেখা হয় নাই যে-শহর, তাহার উদ্দেশে।
আমি আর ছুটব কী? আমার আগেভাগে ছুটলো মেঘেদের ঝাঁক। আকাশপানে তাকালে ঝাঁক ঝাঁক মেঘের ভুলভুলাইয়ার ভিতর ঘুরপাক খেতে লাগলাম। খানিক বাদেই ভুলভুলাইয়া ধুয়েমুছে দিয়ে ঝরতে লাগল তুমুল বাদল! নভেম্বর রেইন! ঝেঁপে নামলো চারপাশ আন্ধার করে দিয়ে। জল থইথই রাস্তাঘাট। গাড়ির দীর্ঘ বহরের ওপর বড়বড় বৃষ্টিফোঁটা পড়ছে। পড়েই ওরা ঝুমকোলতার সরু-পাপড়ি সদৃশ ফুটে উঠছে অপূর্ব কুসুম হয়ে!
আর দূর ব-দ্বীপের এক নভেম্বরদুহিতা অবাক হয়ে দেখছিল শীতের পূর্বাভাস। শীতের আগমনীঘণ্টা বাজিয়ে ঝরছিল অবিরল জলধারা।
নভেম্বর আমার জন্মমাস। এ নিয়ে আদিখ্যেতা করার তেমন কিছু দেখি না। এবং আমি তা করিও না। কারণ আমার জন্ম কি আমার ইচ্ছেমাফিক হয়েছিল? বরং জন্মদিন এলেই কেমন একটা ফাঁপরে পড়ে যাই। এন্ট্রি যখন একবার নিয়েছি এক্সিটও অবশ্যই নিতে হবে। এক্সিট, তুমি কতদূর হে?
আঙুলের কড় গুণে আয়ুর হিসাব করতে লেগে যাই। মুখের সামনে আয়না ধরে নিজের বুড়োটে চেহারাটা দেখি। কীভাবে ত্বক হারাচ্ছে তার লাবণ্য! শতসহস্র ফাইনলাইন আর রিঙ্কেল কতই না দ্রুততায় ঢেকে দিচ্ছে যৌবনের ছিটেফোঁটা!
আরেকটা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নভেম্বর এলেই ইয়াদ হয়—
জীবদ্দশায় ৩৭টি নাটক এবং ১৫৪টি সনেট লেখার পরও ইংরেজি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক শেক্সপিয়ার তাঁর কোনো রচনায় নাকি একবারও নভেম্বর মাসের উল্লেখ করেননি! চিন্তা উদ্রেককারী ব্যাপারই বটে! নভেম্বরের সাথে ওঁর কি এমন শত্রুতা ছিল কে জানে?
হতে পারে ওঁর কোনো প্রেমিকা ছিল নভেম্বরজাতিকা। যে হয়তো ছিল ওঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে। সঠিক তথ্য না জেনেশুনে অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার কোনো যৌক্তিকতা নাই। তাই আমিও এই চ্যাপ্টার ক্লোজ করেই রেখে দিই।
ঝুমতালে ঝরে যাওয়া বৃষ্টি মাথায় করে ছুটে চলছে গাড়ি। আর আমি দেখছি সেই গানের অপূর্ব দৃশ্যায়ন, লম্বা অমিতাভের সাথে ভিজে একসা হচ্ছেন নাতিদীর্ঘ মৌসুমি চ্যাটার্জি! যে-গানের হিন্দিটা বাংলা করলে দাঁড়ায়—
রিমঝিম রিমঝিম ঝরে শ্রাবণ, জ্বলে জ্বলে ওঠে মন, / বৃষ্টিভেজা এই মরসুমে, লাগল কি করে এই আগুন?…
উহু, ক্যানাডায় বৃষ্টি ঝরতে শ্রাবণ মাসের উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে না। এখানকার ওয়েদারের মন সদা উদাসী। বিষের বাঁশি বাজিয়ে যখন ইচ্ছা তখন সে সুর ছড়িয়ে দেয়। ওই সুর শুনে কে মরল কী বাঁচল তাতে তার কিচ্ছুটি যায় আসে না।
এই দেশে কার্তিক-হেমন্ত নাই। আষাঢ়-শ্রাবণ নাই। আছে কেবল দুইটা ঋতু, বছরের তিনভাগের দুইভাগ জুড়ে থাকে উইন্টার আর একভাগে যে থাকে ওর নাম সামার!
০৭ নভেম্বর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৬ || পাপড়ি রহমান - August 28, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৫ || পাপড়ি রহমান - August 22, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৪ || পাপড়ি রহমান - August 14, 2026

COMMENTS