পদ্মপুকুরপাড় ও আরকুম শাহ্‌-র মোকাম || জয়দেব কর

পদ্মপুকুরপাড় ও আরকুম শাহ্‌-র মোকাম || জয়দেব কর

শেয়ার করুন:

হাঁটার অভ্যাসটা আমার শৈশবকাল থেকেই শুরু। পঞ্চম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত চার কিলোমিটারের পথ হেঁটে আসাযাওয়া করতে গিয়ে দিনদিন লম্বা পথ হাঁটার অভিজ্ঞতা ঝুড়িতে জমেছে। কাজে অকাজে হেঁটেছি, আজও হাঁটি। হাঁটার আনন্দ বলে শেষ করার মতো নয়। একযুগের চাটগাঁবাসে সে-অভ্যাসটা অনেকটাই সীমিত হয়ে গেলেও হারিয়ে যায়নি। সিলেট গেলে সে-অভ্যাসটা পুরো মাত্রায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে। শহর ছেড়ে ছেড়ে চাবাগানের মেঠোপথে হাঁটা রোজকার বৈকালিক রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। পদব্রজে ভ্রমণের নিত্যসঙ্গী বিমানদা, মাঝেমধ্য স্বপন, মেকদাদ আর জাহেদভাই, কখনও কখনও রুবেল। জাহেদভাই হাঁটাপর্বে না থাকলেও প্রায়শই আড্ডাপর্বে থাকেন। যেখানেই বসি না কেন মোটর-দ্বিচক্রযান হাঁকিয়ে চলে আসবেন।

এমনই একদিন আমি আর বিমানদা পদব্রজে লামাবাজার থেকে আম্বরখানা হয়ে নতুন স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে ঢুকে বাংলাপাড়া, উজানভাটি, চিতলমাটি দিয়ে তারাপুর শিবচরণের দোকানে পৌঁছলাম। আমাদের সাথে যুক্ত হলেন জাহেদভাই। শিবচরণের দোকান রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের গেইটের সামনেই অবস্থিত। কাগজে সিরিয়াল নম্বর টুকে দিয়ে সিঙ্গাড়া খেতে হয়। তরুণদের ভিড় ঠেলে সিরিয়াল নম্বর মেনে চা-সিঙ্গাড়া খেলাম। সেখান থেকে হোস্টেলের ভেতর দিয়ে আবার ঢুকে পড়লাম চাবাগানের ভেতর। লক্ষ্য পদ্মপুকুরপাড়। যদিও ফুলগুলো শাপলাই বলেছিল কেউ একজন। তারপরও সেগুলোর পদ্মবর্ণের দরুণ পুকুরটি আমার নিকট পদ্মপুকুরই হয়ে গিয়েছে।

পদ্মপুকুরের পাড়ে যখন বসলাম, দেখি, চাঁদকে মাঝখানে রেখে কালপুরুষ ও বৃহস্পতি অবাক তাকিয়ে আছে। তিনদিকে চাবাগান, সামনে চাশ্রমিকপল্লী। বিমানদা দোতারায় মৃদু টোকা দিচ্ছেন। শীতরাত্রির জাদুময় জোছনামাখা আলোয় অপার্থিব পরশ লাগছিল দেহমনে। একে একে বাকিরাও এসে পড়ল। আমি, বিমানদা আর জাহেদভাই পূর্বপরিচিত হলেও বাকিদের সাথে চাবাগানের এই পুকুরপাড়ে পরিচয়। শ্রমজীবী মানুষ তারা। পরিচয়ের সূত্র ছিল গান। এদের মধ্যে জিয়াভাই তার গায়কী, লোকগানের স্মৃতিভাণ্ডার এবং বিনয়ে অনন্য। একটার পর একটা অপ্রচলিত বাউল গান তিনি গেয়ে যান স্মৃতি থেকে৷ ধীরে ধীরে গান-আলাপের আসর শুরু হলো। বেশ কিছুক্ষণ টানা গান শেষে বাউল আরকুম শাহ্‌-র গানের সূত্র ধরে শুরু হলো গানালাপ।

জাহেদভাই আরকুম শাহ্‌-র মাজার ও ওরসের স্মৃতিকথা শোনালেন। জাহেদভাই কবিমানুষ। তার কথা বলার ধরনটা শ্রবণসুখ দেয়। তার পিসিমা ছিলেন আরকুম শাহ্‌-র মুরিদ। মুর্শিদের প্রতি মুরিদের প্রেমভক্তি যে কত গভীর হতে পারে তা ফুটে উঠল তার আলোচনায়। মাজারের বাৎসরিক ওরসে পিসিমার সাথে তার যাতায়াতের সুখকর স্মৃতিটুকু বেশ জীবন্ত। পিসিমার মৃত্যুর পর আর তিনি ওপথে পা মাড়াননি। আলাপে আলাপে জানতে পারলাম আরকুম শাহ্‌-র মাজার তার বাড়ির পাশেই। দক্ষিণ সুরমার ধরাধরপুর গ্রামে। শহরের এত কাছেই যে মাজারটি অবস্থিত তা আমার জানা ছিল না। ছোটবেলা থেকে তাঁর কত কত গান শুনে বড় হয়েছি। মনের মধ্যে তখনই সেখানে যাওয়ার বাসনা জাগল। আর কয়েকদিনের মধ্যেই যে সে-বাসনা বাস্তব হয়ে যেতে পারে তা স্বপ্নেও ভাবিনি।

তখন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে আমি দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। একদিন দুপুরে বিমানদার সাথে হাঁটছিলাম। জিন্দাবাজার থেকে বন্দরের পথে যেতে যেতে বিমানদা জানালেন যে আমরা আপাতত হুমায়ুন রশিদ চত্বরে যাচ্ছি একজন গানপ্রিয় লোকের সাথে দেখা করতে। লোকাল সিএনজিতে করে চত্বরে পৌঁছলে সেখানে যুক্ত হলেন শাহীন বাউল। তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। বিমানদা পরিচয় করিয়ে দিলেন। শাহীন বাউলই আরকুম শাহ্‌-র মোকামে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। সেখান থেকে হাঁটা শুরু হলো আমাদের। বঙ্গবীর রোডে এসে একসময় ভাড়া-করা সিএনজি নিয়ে পৌঁছলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।

প্রথমেই চোখে পড়ল একটা মসজিদ। মসজিদে আরকুম শাহ্ ইমামতি করতেন। পাশেই তাঁর মাজার। শরিয়ত-মারফতের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। মাজারের সামনে এসে একটা ছোট নির্দেশনামা চোখে পড়ল। তাতে লেখা “নারীদের প্রবেশ নিষেধ”। এ কেমন কথা! যে আরকুম শাহ্‌ লিখেছেন—“আমরা প্রেমবাজারে থাকি, আমরা প্রেমবাজারে থাকি / আশেক ছাড়া পুরুষ-নারী হাবিয়া দোজখী”, তাঁর মাজারে এমন কথা লেখা! ঠিক সে-মুহূর্তে কানে ভাসছিল এক সুরেলা নারীকণ্ঠ। আরকুমের গান।

আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে মাজারগৃহে ঢুকলাম। সেখানে আরকুম শাহ্‌ ছাড়াও তাঁর পরম্পরার অনেকেরই সমাধি রয়েছে। দেখি একজন নারী গুনগুন করে গান গেয়ে গেয়ে ঝাড়ু দিচ্ছেন। তিনি আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। খুবই আন্তরিক মনে হলো। ঝাড়ু দেওয়া শেষ হলে তিনি আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চত্বরে বিভিন্নকিছু দেখালেন। আমি এর ফাঁকে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “মাজারে তো নারীদের ওঠা নিষেধ। আপনি তো উঠে ঝাড়ু দিচ্ছেন।” তখন তিনি জানালেন যে, এই আইন বেশিদিন হয়নি চালু হয়েছে। যারা এইটা চালু করেছে, তারা তা লিখেই খালাস। বৃদ্ধা জানালেন তার মুর্শিদের মাজার ধুলোবালিতে ঢাকা পড়ে থাকুক তা তিনি তার জীবদ্দশায় কখনোই বরদাশত করতে পারবেন না।

বৃদ্ধা স্থানীয় একটা ক্লিনিকে কাজ করেন। ফাঁকে এসে ঝাড়ু দিয়ে যান। আরকুম শাহ্‌-র প্রয়াণ হয়েছে এই নারীর জন্মেরও আগে। তারপরও তিনি তাঁকে মুর্শিদ মানেন। এমন ভক্তের সাক্ষাৎ পাওয়া আসলেই সহজ কি না জানি না। তার কণ্ঠে আমাদের শোনালেন “সোনার পিঞ্জিরা আমার কইরা গেলায় খালি রে / হায় রে আমার যতনের পাখি / ও মন সুয়া রে / একবার পিঞ্জিরায় আও দেখি।” কী দরদ নিয়ে গাইলেন, আহা, ভোলার নয়! তারপর আমাদের নিয়ে দেখালেন আরকুম শাহ্-র বাদ্যযন্ত্র, আসনঘর। ভক্ত ও শিষ্যদের নিয়ে ভাবগান করতেন সেখানে। দেখলাম তাঁর ব্যবহৃত দোতারা ও একতারা। এগুলোর বয়স দেড়শ বছরের অধিক।

সবচাইতে দুঃখের যে-বিষয়টি চোখে পড়ল সেটি হলো, সুফি চিত্রকলার ওপর টানানো পর্দা। আরকুম শাহ্ আজমির শরিফ থেকে সেগুলো নিয়ে এসেছিলেন। বোরাখ, হাসান-হোসেনের প্রতিকৃতি, ইব্রাহিমের কোরবানির দৃশ্য ছাড়াও আরকুম শাহ্‌ ও তাঁর শিষ্যের প্রতিকৃতি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ঢেকে দেওয়ার ইতিহাসও বেশিদিন আগের না। বছর দুয়েকের বোধহয়। এ বড় অপমানকর ঠেকল আমার কাছে। এসব কী! মাজারের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এমন জবরদস্তি কেন?

এক পর্যায়ে ওই বৃদ্ধা মা বিদায় নিলেন। জানালেন তার কাজের সময় হয়ে গিয়েছে। যাওয়ার সময় বারবার অনুশোচনা করছিলেন যে, আমাদের তিনি মেহমানদারি করতে পারেননি ঠিকমতো। বৃহস্পতিবার ধরে থাকা যায় মতো করে মাজারে আসতে অনুরোধ করলেন। জানালেন সারারাত ওরস হয়।

বৃদ্ধা চলে গেলে ইমাম সাহেব এলেন। ইমাম সাহেব একই গ্রামের সন্তান। আমরা কিছুক্ষণ গানবাজনা করলাম। শাহিন বাউলের গলায় মধ্যদুপুরের সুনসান নীরবতা ভেদ করে আরকুমের মঞ্জিল হয়ে উঠল সুরময়। কী অপূর্ব কণ্ঠ আর গায়কী! এরই ফাঁকে ইমাম সাহেব আমাদের চা-মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। তার আন্তরিক আপ্যায়ন সেরে গানপর্ব শেষ করে আমরা ফিরে এলাম তারাপুর চাবাগানে। ফের গিয়ে বসলাম পদ্মপুকুরের পাড়ে। আবার বসল গানের আসর। সেদিন জাহেদভাইয়ের পিসিমার কথা খুব মনে পড়ল, চোখে ভেসে উঠল অজস্র মাজারপ্রেমী নারীদের মুখ। মনে মনে বলে উঠলাম, মা, মুর্শিদের প্রেমে আজও কেউ ডুবে রয়। আজও কেউ সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হৃদয় নিংড়িয়ে দেয় প্রেমময় ভক্তি, যে-ভক্তির ডোরে বাঁধা থাকেন সাঁই।

১২ অগাস্ট ২০২৬

মোকাম জিয়ারতকালে ধারণকৃত তথ্যচিত্র দেখতে চাইলে এই দুই ভিডিয়োয় ক্লিক করতে পারেন—তথ্যচিত্র ১তথ্যচিত্র ২রচনার ব্যানার লেখকের সৌজন্যে পাওয়া।—গানপার


জয়দেব কর রচনারাশি

শেয়ার করুন:
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you