নোলানের ওডিসি আর হোমারের ওডিসির মধ্যে পার্থক্য কি?
এই রকম প্রশ্ন পরীক্ষার খাতায় আসতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের সিরিয়াস পাঠকদের অনেকের কাছে ‘দ্য ওডিসি’ অনেকটাই কুৎসিত। যেমন নোলান যেই অনুবাদকের লেখাকে সামনে রেখে গ্রিক মহাকাব্য থেকে এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন সেই এমিলি উইলসন তো বলেই দিয়েছেন, নোলানের ওডিসিতে সেইসব উপাদানের অনেকগুলিই নেই, যেগুলো হোমারের মহাকাব্যকে অসাধারণ করে তুলেছে। খুবই স্বাভাবিক বিষয়। লিখিত মহাকাব্য আর ভিস্যুয়াল সিনেমা দুইটা পৃথক বিষয়। আমি বরাবরই বই থেকে অনুপ্রাণিত বা অবলম্বন করে নির্মিত সিনেমাকে নতুন শিল্পকর্ম হিসেবে দেখি। কিন্তু ক্লাসিক সাহিত্যানুরাগীদের প্রথম পছন্দ বইয়ের মতোই হতে হবে সিনেমা। যা আসলে কোনোভাবেই সম্ভব না, সেই অসম্ভবকেই তারা প্রত্যাশা করেন। প্রত্যাশা করলেই তো আর কিছু করার নেই। সে যাকগে।
সিনেমা দেখলাম। সিনেমা মুক্তির তৃতীয় সপ্তাহে এসে। গত দুই সপ্তাহে অর্ধসুস্থ শরীর ও কয়েকদিন শয্যাশায়ী থেকে শেষ পর্যন্ত একটা স্বাভাবিক ছুটির দিনে। তদুপরি তুমুল বৃষ্টির মাঝে। কিন্তু সিনেমা তো আমার ভালো লেগেছে। এই কথা বললেই আমার সাহিত্যানুরাগীদের পছন্দ হবে না। কিন্তু তাদের পছন্দের কথা তো আমি বলতে পারছি না। তাই আমারটাই বলি।

আমি নোলানের ওপেনহাইমার দেখিনি। দেখা উচিত ছিল। যদিও ওপেনহাইমারের সাবজেক্ট আমার পছন্দের না। কিন্তু তারপরও উচিত ছিল কেন বলছি, তা হলো নোলানের এই যে সিনেমা, ওপেনহাইমার বা দ্য ওডিসি —এর মাঝে একটা কানেক্টিভিটি আছে। নোলান যেহেতু সিনেমায় ভিস্যুয়াল ইফেক্টের ব্যবহার করে না, পুরোটাই মানুষ্যনির্মিত, সেক্ষেত্রে আমি নোলানকে একটু ভিন্ন পার্সপেক্টিভ থেকে বর্ণনা করতে চাই।
আমি মনে করি, নোলান আদতে তার সিনেমার মাঝ দিয়ে মানুষের প্রতি আরও মানবিক আরও পরিবারকেন্দ্রিক হবার আহ্বান জানান। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন যেমন পৃথিবীতে আরও সব সংকটের পাশাপাশি তার সৃষ্টিকর্তার বিপরীতে হাজির হয়েছিল তেমনি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন আবিষ্কার বা উদ্ভাবন, জীবনযাপনের নানা চাপ মানুষকে আরও বেশি এককেন্দ্রিক বা আরও বেশি অমানবিকও করে তুলতেছে। এমন পরিস্থিতিতে নোলানের সিনেমা আদতে এর বিপরীতে যাওয়ার আহ্বান। আমি তা-ই মনে করি। ওপেনহাইমারের পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পর তার যে অনুশোচনা, এইটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা আদতে শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায়নি অন্য সব কর্মকাণ্ডের জন্য। যেমন ইন্টারনেটে পপআপ বিজ্ঞাপনের জনক যেমন, এই জিনিস আবিষ্কারের জন্য ইন্টারনেটগ্রাহকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল এই জন্যে, এটার এত বিস্তৃত ব্যবহারে মানুষ বিরক্ত হবে তা তিনি চাননি।
নোলানের দ্য ওডিসি তেমনি পরিবারের প্রতি আরও কমিটেড ও নিজের সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার গল্পই আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে। নয়তো ওডিসিয়াসকে বিশ বছর পর তার ভূমিতে ফেরার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। যদিও এই গল্পের কাঠামোও আদতে হোমারেরই। কিন্তু সিনেমা যখন আলাদা ভাষা ও আলাদা শিল্পের দুনিয়া, সেখানে আলাদা করে দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভিন্ন ভিন্ন নির্মাতা ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে মানুষের ফান্ডামেন্টাল উৎপত্তিস্থল পরিবারের প্রতিই মনযোগ দিয়ে যাচ্ছে সম্প্রতি। এমন সিনেমার উদাহরণ তো অজস্র। কিন্তু সেইসব অজস্র উদাহরণের দিকে না গিয়ে এটি সেইসব সিনেমার সাথে নোলানের বা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নাগরিকদের কাছে নোলানের একটা আর্জি বা আহ্বান হিসেবে দেখি দ্য ওডিসি।
৭ অগাস্ট ২০২৬
ইলিয়াস কমল রচনারাশি
গানপার ম্যুভিরিভিয়্যু
- দ্য ওডিসি, ক্রিস্টোফার নোলানের || ইলিয়াস কমল - August 9, 2026
- ফিরে ফিরে এন্ড্রু কিশোর || ইলিয়াস কমল - July 7, 2026
- মুস্তাফা মনোয়ার, আপনাকে আমরা কোনোদিন ভুলব না - June 29, 2026

COMMENTS