কমল, এক মহান বাদক || প্রান্তর চৌধুরী

কমল, এক মহান বাদক || প্রান্তর চৌধুরী

শেয়ার করুন:

ইব্রাহিম আহমেদ কমল বাংলাদেশের সংগীত-ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর গিটারের জাদুতে আমাদের দেশের হেভিমেটাল ও হার্ডরক জেনারেশনকে পথ দেখিয়ে চলেছেন। যখন বাংলাদেশে পশ্চিমা ধাঁচের রক মিউজিকের চর্চা চলত, তখন সেই ১৯৮৪ সালে তাঁর হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে কিংবদন্তি ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’।

একজন গিটারিস্ট হিসেবে ইব্রাহিম আহমেদ কমলের অবদান শুধু ইন্সট্রুমেন্টাল তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এদেশের গিটারপ্লেয়িং স্টাইলে নিও-ক্লাসিক্যাল এবং স্পিডমেটাল টেক্নিকের প্রবর্তন করেন। তাঁর ‘বসে আছি’, ‘অসামাজিক’ বা ‘একটি ছেলে’-র মতো গানগুলোর গিটার রিফ অত বছরের বাদে এই সময়েও তরুণ গিটারিস্টদের জন্য পাঠ্যবইয়ের মতো কাজ করে।

গিটারের ফ্রেটবোর্ডে তাঁর ক্ষিপ্র আঙুল আর ইমোশনাল ব্লুজ নোটের যে অদ্ভুত সংমিশ্রণ, তা তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গিটারিস্টের মর্যাদা দিয়েছে। সংগীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের জীবনের আড়ালে রয়েছে কিছু অত্যন্ত মানবিক এবং আবেগঘন গল্প। পর্দার পেছনের মানুষটি সবসময় প্রচারের আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন, কিন্তু যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন তারা ভালো ধারণা রাখেন একটি দীর্ঘ সংগীতক্যারিয়ারে তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে কতটা ধকল গেছে।

এখানে কেবল উল্লেখ করি, বিশেষ করে গত কয়েক বছরে তাঁর আঙুলের লিগামেন্টে জটিল সমস্যা আর শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে কয়েক দফায় গিটার থেকে স্টেজ থেকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মিউজিকের প্রতি তাঁর যে অদম্য টান, তা তাঁকে বারবার মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছে আরো শক্তিশালী রূপে। একজন শিল্পী যখন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বাদ্যযন্ত্রটি ধরার শক্তি হারানোর শঙ্কায় থাকেন, সেই মুহূর্তের নীরব যন্ত্রণা কেবল একজন প্রকৃত সাধকই অনুভব করতে পারেন।

ইব্রাহিম আহমেদ কমল সবসময় নতুনদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছেন, যা তাঁর বিশাল হৃদয়ের পরিচয় দেয়। বর্তমান সময়ে যেখানে মানুষ নিজেদের প্রদর্শন নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে এমন গুটানো স্বভাবের সংগীতশিল্পীর শুধু কাজের ভেতর দিয়েই নিজের অস্তিত্ব। অনেক নতুন ব্যান্ড বা গিটারিস্টের বিপদে-আপদে তিনি কোনো প্রচার ছাড়াই মেন্টর হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, যা হয়তো অনেক ভক্তেরই অগোচরে রয়ে গেছে।

একজন টেক্নিক্যাল গিটারিস্টের চেয়েও ইব্রাহিম আহমেদ কমল একজন ইমোশনাল স্টোরিটেলার। তাঁর বাজানো একেকটি সোলো শুনলে মনে হয় গিটারটি যেন মানুষের ভাষায় কথা বলছে। বাংলাদেশের কন্সার্ট সংস্কৃতিতে যখন পর্যাপ্ত সাউন্ডসিস্টেম বা ভালো মানের গিটারগিয়ার ছিল না, সেই প্রতিকূল সময়েও তিনি বিশ্বমানের টোন তৈরি করে অবাক করে দিতেন অডিয়েন্সকে। ওয়ারফেজের প্রতিটি অ্যালবামে তাঁর দূরদর্শী মিউজিক-কম্পোজিশন এদেশের মেটাল মিউজিককে কতটা শক্ত ভিত্তি দিয়েছে তা বলা বাহুল্য।

ভক্তদের কাছে তিনি কেবল একজন গিটারিস্ট নন, বরং সংগ্রামের এক প্রতীক। তাঁর এই নীরব ত্যাগ, গিটারের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর অসুস্থতাকে জয় করে আবারও সুরের মায়াজালে ফিরে আসার লড়াই প্রতিটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ে আজীবন তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় জায়গা দেবে। তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ জার্নি আর গিটারের প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা সত্যিই তাঁকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে রূপান্তর করেছে।

ইব্রাহিম আহমেদ কমলের মতো সংগীতপ্রতিভা বারবার জন্মায় না। এমন এক জাদুকর মিউজিশিয়ানের সৃষ্টির সান্নিধ্য আমরা আমাদের আয়ুসীমায় পেয়েছি। জীবনে এ এক সার্থকতা। বাংলা ভাষায় যারা সৃজনশীল সংগীতের চর্চা করছেন এখন ও করবেন ভবিষ্যতে, এই মিউজিশিয়ানকে, এই মহান বাদককে, ইব্রাহিম আহমেদ কমলকে তারা নিশ্চয় অভিবাদন জানাবেন।


প্রান্তর চৌধুরী রচনারাশি
গানপারে বাদক
গানপারে ওয়ারফেজ

প্রান্তর চৌধুরী
শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you