সোলস : বাংলা গানের বায়ান্ন বছর || প্রান্তর চৌধুরী

সোলস : বাংলা গানের বায়ান্ন বছর || প্রান্তর চৌধুরী

শেয়ার করুন:

বায়ান্ন বছরের সোলস কীভাবে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠল, যেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল রেনেসাঁ, এলআরবির মতো লিজেন্ডারি ব্যান্ড! সোলস যে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রগণ্য নামগুলোর একটা, এটা নিয়ে বোধহয় কেউই দ্বিমত করবেন না। এক দুই দশক নয়, টানা পাঁচ দশকেরও অধিক কাল ধরে এখনও সমান সক্রিয় প্রবহমান এই ব্যান্ড। চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয়েছিল যাত্রা, আজ বিশ্বের গানপ্রেমীদের কাছে পরিচিত নাম ‘সোলস’!

সকলেই জানে এই ইতিহাস যে এই ব্যান্ড থেকেই জন্ম নিয়েছিল পরবর্তীকালে একে একে রেনেসাঁ, এলআরবি প্রভৃতির মতো কয়েকটি কিংবদন্তি মিউজিক্যাল ব্যান্ড। সোলসের মিউজিক্যাল জার্নিটা বাংলাদেশেরও পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসের একটা জার্নি।

১৯৭২ সাল। যুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল আলম যুদ্ধ থেকে ফিরে চিটাগাং ক্লাবের এক কনসার্টে স্টেইজে উঠলেন। শো চলাকালে সেখান থেকেই মাথায় এল ব্যান্ড লাইনআপের চিন্তা। নাম ঠিক করতে গেলেন নিজের বাবা সাহিত্যিক মাহবুব উল আলমের কাছে। বাবা নাম দিলেন ‘সুরেলা’। প্রথম লাইনআপে ছিলেন লিড গিটারিস্ট সাজেদ, সাথে সুব্রত বড়ুয়া রনি, মমতাজুর রহমান লুলু, তৌহিদুল আলম ও আরও কয়েকজন বন্ধুবান্ধব। বিয়েবাড়ি, জন্মদিন এসব অনুষ্ঠানে সোজা কথায় খ্যাপ মারতেন তারা। পরে সাজেদ উল আলমের ভাগ্নে ফরিয়াদুল ইসলাম একান্তই নিজের ভালোলাগা থেকে একটা নতুন নাম সাজেস্ট করেন ‘সোলস’! ওই নামই থেকে গেল চিরকালের জন্য।

সত্তর দশকের শেষদিকে সাজেদ উল আলম দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান আর ব্যান্ডে লিড গিটারিস্টের জায়গায় তৈরি হয় বিশাল একটা গ্যাপ। অনেকেই আগ্রহী ছিলেন লিড গিটারিস্ট হিসেবে এই সেনসেশনাল ব্যান্ডে জয়েন করার জন্য। অবশেষে সুযোগ পান অনূর্ধ্ব ১৭-১৮ বছর বয়সী এক কিশোর, নাম যার আইয়ুব বাচ্চু! শুরু হয় বাংলাদেশের মিউজিকে এক ম্যাজিক অধ্যায়। এর মধ্যে এরপর নকীব খানও ঢাকায় পাড়ি জমান, সোলসের সুরের সেকশন তখন নকীব খান দেখতেন। অচিরেই সোলসের কম্পোজিশনের সুর করার দায়িত্বটাও এসে পড়ে এক কিশোরপ্রায় আইয়ুব বাচ্চুর কাঁধে। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি যে এই কিশোরই একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের এক কিংবদন্তি। সোলসের ইতিহাসের সবচেয়ে ইমোশনাল একটা অংশ রয়েছে এই কিংবদন্তির সঙ্গে।

সেই দিনগুলি নিছক সোলসেরই নয়, ছিল বাংলাদেশেরও উন্মেষকাল। সোনালি। গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর সঙ্গে ফরেস্ট হিলের এক আড্ডায় সেদিন স্রেফ মজার ছলেই একটা কবিতা লেখা হয় এবং আইয়ুব বাচ্চু সঙ্গে সঙ্গে সেই কবিতায় সুর বসিয়ে ফেলেন। গানের নাম রাখা হয় ‘একদিন ঘুমভাঙা শহরে’। কিছুদিন পর শহরের হোটেল ব্লু নাইলে সোলসের এক মিটিং শেষে মনখারাপ করে আইয়ুব বাচ্চু বেরিয়ে এসে জঙ্গীকে বলেন, ‘ভাই, সোলস ছেড়ে দিলাম। আর সোলস থেকে এই গানটাও নিয়ে গেলাম।’ এই গানটাই পরে হয়ে যায় এলআরবির প্রথম অ্যালবামের প্রথম গান। সোজা কথায়, বাংলাদেশের রকসংগীতের অন্যতম আইকনিক একটা গানের শেকড় লুকিয়ে আছে সোলসের মাটিতেই।

একটামাত্র ব্যান্ড থেকে এত এত লিজেন্ড বের হওয়া সত্যিই বিরল একটা ব্যাপার ছিল। নকীব খান আর পিলু খান মিলে গড়ে তোলেন রেনেসাঁ, যার সম্পর্কে আমরা সবাই কম-বেশি জানি। আইয়ুব বাচ্চু গড়ে তোলেন এলআরবি। তখন তপন চৌধুরী দীর্ঘ দুইদশক সোলসের সঙ্গে ছিলেন। বহুবছর পর্যন্ত তপনই ছিলেন টিভিতে সোলসের বাংলা গান গাওয়ার একমাত্র মুখ। কুমার বিশ্বজিৎও বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন সোলসের সঙ্গে। পরে বিশ্বজিৎ নিজের সলো ক্যারিয়ারেই বিশাল সফলতা পেয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে সোলসের সঙ্গে তার দূরত্ব বেড়ে যায়।

আরেকজনের কথা না বললেই নয়। তিনি নাসিম আলী খান! ১৯৭৮ সাল থেকে আনঅফিসিয়ালি সোলসের হয়ে ইংরেজি গান গাইতেন তিনি। ১৯৮০ সালে নকীব খান তাঁকে অফিসিয়ালি যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। শুরুতে ইংরেজি কাভারে তুমুল ডিমান্ড ছিল নাসিমের। পরে বাংলা গানেও কণ্ঠ দেন। জন্ম নেয় নাসিমের কণ্ঠ ও গায়কী ভর করে একের পর এক কালজয়ী গান। ‘চায়ের কাপে’, ‘মুখরিত জীবন’, ‘ব্যস্ততা’ প্রভৃতির মতো মাস্টারপিস গানে নাসিম আলী খানের ভয়েস আজও শ্রোতাদের কানে লেগে আছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর একসঙ্গে চলার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি সোলস ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আর যার কথা ছাড়া সোলসের বর্তমান গল্পটাই অসম্পূর্ণ, তিনি আর কেউ নন, নান আদার দ্যান পার্থ বড়ুয়া। আশির দশকে চট্টগ্রামের লোকাল ব্যান্ড ‘মেসেজ’-এ গিটার-কিবোর্ড শিখতে শুরু করেন তিনি। তারপর ১৯৮৯ সালে সোলসের সঙ্গে প্রথম অ্যালবাম দিয়ে তাঁর মিউজিক ক্যারিয়ার শুরু আর পরে তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনিই সোলসের ভোকাল ও লিড গিটারের নায়ক হয়ে ওঠেন। মিউজিকের পাশাপাশি নাটক, টেলিফিল্ম সহ আয়নাবাজির মতো সিনেমাতেও অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন পার্থ বড়ুয়া। ২০২০ সালে চট্টগ্রামের ২৬টা ব্যান্ড নিয়ে ‘বাংলাদেশ ব্যান্ডস জেন নেক্সট’ নামে নতুন একটা উদ্যোগও নেন তিনি।

অ্যালবামের দিক থেকে দেখলে, ১৯৮০ সালে আসে প্রথম অ্যালবাম ‘সুপার সোলস’। বাংলাদেশের ব্যান্ড সিনারিয়োর প্রথম ফ্যুল লেন্থ অ্যালবাম আর প্রথম রক অ্যালবাম হিসেবে গণ্য করা হয় এটাকে। এরপর একে একে আসে ‘কলেজের করিডোরে’, ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’, ‘East & West’, ‘এ এমন পরিচয়’, ‘আজ দিন কাটুক গানে’, ‘অসময়ের গান’, ‘মুখরিত জীবন’, ‘তারার উঠানে’, ‘টু লেট’, ‘ঝুট-ঝামেলা’, ‘জ্যাম’ প্রভৃতি শিরোনামে অ্যালবামের পর অ্যালবাম। সব একেকটা মাস্টারপিস!

২০২৩ সালে সোলস ৫০টা গান নিয়ে একটা বড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাদের সুবর্ণ জয়ন্তী সেলিব্রেইট করে। কিন্তু তার পরপরই ব্যান্ডে বড় দুটো পরিবর্তন আসে! নাসিম আলী খান ব্যান্ড ছেড়ে দেন ২০২৪-এর দিকে আর দীর্ঘদিনের ড্রামার আহসানুর রহমান আশিক সরে দাঁড়ানোর পর ২০২৫-এর শেষের দিকে ড্রামসে জয়েন করেন অভিজিৎ সেনগুপ্ত। সোলসের বর্তমান লাইনআপে আছেন পার্থ বড়ুয়া (ভোকাল ও লিড গিটারিস্ট), মীর শাহরিয়ার হোসেন মাসুম (কিবোর্ডিস্ট), মারুফ হাসান তালুকদার রিয়েল (বেজ গিটারিস্ট) আর অভিজিৎ সেনগুপ্ত (ড্রামার)।

বায়ান্ন বছরের এই পথচলায় সাজেদ উল আলমের ছোট্ট একটা স্বপ্ন থেকে শুরু করে নকীব খান আইয়ুব বাচ্চু তপন চৌধুরী নাসিম আলী খানের স্বর্ণযুগ পেরিয়ে আজকের সোলস  দাঁড়িয়ে আছে পার্থ বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল নতুন প্রজন্মের মিউজিশিয়্যান নিয়ে। শরীর হয়তো বদলায়, কিন্তু সোলস  নামের আত্মাটা তো অবিকল থাকে। এত লম্বা জার্নির পরেও সোলস  এখনো একই জায়গায় রয়ে গেছে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে।


প্রান্তর চৌধুরী রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you