
১১.
মাস দুয়েকের বেশি হলো সেই চিরচেনা ভূমি, আমার অতি প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে এসেছি। যেই দেশেতে জন্ম আমার, যেন সেই দেশেতেই মরি…
উহু, মোর বীণা উঠছে না কোনো সুরে বাজিয়া। মোর মনে পড়ছে না অতীতের কোনো কিছুই। মানুষের করা অপমান বড় গভীরতর জখম। যে-জখম সারিয়ে তোলা যায় না কোনো ওষুধবিষুধে। যে-জখম ইরেজ করা যায় না কোনোকিছু দিয়েই। বা কোনো তন্ত্রমন্ত্র সাধন করে।
জীবন মানে কী তবে শুধুই অপমানের বুরবুরি তোলা? নাকি শুধুই বেগার খেটে মরা? অন্যের কাঁধে জোয়াল চাপিয়ে কতজনই যে সারাজীবন কত ফায়দা লুটে নিলো! নিজেদের আরাম-আয়েশ আর স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে বিপুল বিক্রমে উদযাপন করে গেল মুফতে-পাওয়া জীবন। আর লুজার করলো শুধু অন্যকে। এইসব দেখেশুনেবুঝে সহ্য করে দেহটাকে অসুখের আখড়া বানিয়ে ফেললাম আমি নিজেই। মানুষ কী করে পারে? কী করে পারে এতটা চক্ষুলজ্জাহীন বেপরোয়া হতে?
আদতে যে পারে, সে পারে। যে পারে না, সে পারেই না। এই পারা বা না-পারাতে পারিবারিক শিক্ষা অনেক বড় ভূমিকা থাকতে পারে হয়তো।
এখানে আসার পর থেকে কিছু অধরা মুক্তি উপভোগ করতে পারছি আমি। যেমন আমার ইচ্ছের টিভিচ্যানেলগুলি ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখতে পারা। বিগত কয়েক দশক টিভি দেখার কথা ভাবতেই পারিনি। কারণ বরাবরই টিভি থাকে গৃহকর্তার দখলে। টিভি দেখা বা অন্য যে-কোনো তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করার পাবলিক তো আমি নই। তাই নিজের মানসম্মান বিবেচনায় সরে থাকা। একপেশে হয়ে থাকা। তাই-ই থাকলাম জনমভর। অন্যের জীবনের নাটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইনি আমি কোনোদিনই। কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি, যে থাকার সে এমনিতেই থাকে। থাকবে। ধরেবেঁধে না-হয় প্রণয়, না-হয় ঘর। এই মর্মকথা সকলেই জানবে বা মানবে এমনও তো বিশ্বাস করিনি কস্মিনকালে।
বহু দিনের কাঙ্ক্ষিত, বড় দাম দিয়ে কেনা এই অধরা স্বাধীনতা উদযাপন করতে আজ দেখলাম অত্যন্ত পছন্দের একটা মুভি—‘টিকেট টু প্যারাডাইজ’। এই মুভির জুলিয়া রবার্টস আমার চিরকেলে ডিয়ারেস্ট নায়িকা।
‘টিকেট টু প্যারাডাইজ’ মুভির গল্পটি আশপাশের চেনাগল্প এবং কিছুটা পূর্বাভাসযোগ্য, তবে জর্জ ক্লুনি ও জুলিয়া রবার্টসের দুর্দান্ত কেমিস্ট্রি ও কমিক টাইমিং ছবিটিকে দেখার মতো করে তুলেছে।
জুলিয়ার মেয়ে লিলি বালি দ্বীপের এক সাধারণ সামুদ্রিক শৈবাল চাষী (সিউইড ফার্মার)-কে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন বাবা-মায়ের ভয়, মেয়ে তার ক্যারিয়ার নষ্ট করে ফেলছে, তাই ওরা বিয়ে ভাঙার জন্য নানান হাস্যকর ষড়যন্ত্র শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে বালিদ্বীপে স্থায়ীভাবে থেকে যায় জর্জ ক্লুনি ও জুলিয়া রবার্টস দম্পতি।
এই মুভির চিত্রনাট্য তেমন শক্তিশালী নয়। তবে অভিনয় ও সিনেমাটোগ্রাফি অতীব নান্দনিক। এবং একটি নির্ভেজাল কমেডি উপভোগ করার জন্য এই মুভিটি যে-কোনো দর্শকের জন্য উপযুক্ত পছন্দ হতে পারে। আমিও উপভোগ করলাম। একা একাই হেসে গড়িয়ে পড়লাম। আমার বেশ কিছু বদভ্যাস আছে, যেমন যারতার পাশে বসে মুভি দেখতে না পারা। যা-তা টাইপ মুভির দর্শক না-হওয়া। মুভি দেখার টাইমে অন্যকাজ না-করা। কী আর করা? আমি এমনই! এমন! বেলা যে ঢলে এল, তবুও নিজেকে বদলাতে আর পারলাম কই?
একেবারে পড়ে-পাওয়া চৌদ্দআনার মতো এইরকম অধরা স্বাধীনতা যদি না জোটে কভু আর? উড়িবার ডানাদুটি যদি ছিঁড়ে যায় টর্নেডোর ঘূর্ণায়মান হাওয়ার খপ্পরে পড়ে, তাহলে? তাহলে আর কী? পরিযায়ী পাখিদের ডানাদুটি বেঁধে রাখলে ওরাও নিশ্চয় উড়িবার কায়দাকানুন ভুলে যাবে। আমিও আমার এই অধরা স্বাধীনতা কোনোদিন হারিয়ে ফেললে খুব বেশি কী বিষাদক্রান্ত হয়ে উঠব? মনে হয় না। আমার স্বভাব জলের মতো। চিরকাল প্রবহমান ও বর্ণহীন!
নিজের এই স্বভাবদোষে আলাদা হতে হতে ছায়া হয়ে, ছোট্ট বিন্দু হয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার আগে বলতে কি চাই—
নিশ্চল নিশ্চুপ…
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ!
১৮ অক্টোবর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১১ || পাপড়ি রহমান - July 27, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১০ || পাপড়ি রহমান - June 25, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৯ || পাপড়ি রহমান - June 17, 2026

COMMENTS