ফিরে ফিরে এন্ড্রু কিশোর || ইলিয়াস কমল

ফিরে ফিরে এন্ড্রু কিশোর || ইলিয়াস কমল

শেয়ার করুন:

এন্ড্রু কিশোর চলে গেলেন। একটা মোটামুটি দীর্ঘ সময় ক্যান্সারের সাথে লড়ে। আমাদের দেশে ক্যান্সার থেকে ফিরে সুস্থ হওয়ার রেকর্ড খুব বেশি নেই। তার বেলায়ও ব্যতিক্রম হলো না। ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই নিউজরুমে তিনি প্রোফাইল শিল্পী হয়ে গেলেন। এইটা বোধকরি সব নিউজরুমেই করা হয়। গুরুতর অসুস্থ বা অনেক বেশি বয়সী কোনও শিল্পী বা বিশিষ্টজনের জন্য বায়োগ্রাফি স্টোরি রেডি থাকে। যাতে ওয়ান ক্লিক হাজির করা যায়। তিনিও সে-অবস্থায়ই ছিলেন বহুদিন ধরেই। সে যাক, তার আত্মা শান্তি পাক।

আমরা যারা আশির দশকে জন্মেছি, বাংলাদেশের সিনেমার উত্থানের চরম সময়টায় আমাদের জন্ম। আর আমাদের চোখের সামনেই দেখেছি সিনেমা হলের যে সিনেমাপরিবেশ ছিল, তা হারিয়ে গেল। ছোটবেলায় আমরা নায়ক দেখতাম রাজ্জাক-আলমগীরদের। আর যখন নিজে নিজে সিনেমা হলে যাইতে শিখছি ততদিনে সালমান শাহও মরে গেছে কয়েক বছর আগেই। ফলে আমরা এন্ড্রু কিশোরকে একটু কম পাইছি সিনেমায়। তবে এই একটু কম মানে খুব কম না। হলে সিনেমা দেখতে গেছি, আর প্লেব্যাকসিঙ্গারের লিস্টে তার নাম ছিল না, এইটা খুবই কম দেখছি তখন।

সহপাঠী বা সহদর্শকদের (সিনেমা হলের পাশের সিটে) দেখছি স্ক্রিনে এন্ড্রু কিশোরের নাম আসা মাত্রই সিটি বাজাইতেও। এর একটা বড় কারণ ছিল, আশির দশকের সেরা প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে এন্ড্রু কিশোরের চূড়ায় থাকা। আশির দশকের পর থেকে যখন মফস্বল-গ্রামে রেডিও অ্যাভেইলেবল (বলাই বাহুল্য, টিভি অ্যাভেইলেবল হইছে নব্বইয়ের শেষ দিকে)। আর বাংলাদেশ বেতারের ‘অনুরোধের আসর’-এ এন্ড্রু কিশোরের নামে যত চিঠি যাইত এইটা বোধহয় বলে শেষ করা যাইত না। আগে যাদের বাপ-চাচারা তরুণ আমলে লিখত, তাদের পরবর্তী জেনারেশন হিসেবে এন্ড্রু কিশোরের গানের জনপ্রিয়তা তখনও তুঙ্গে। এদের কাছে এন্ড্রু কিশোর ছিল একেবারেই সত্যিকারের তারকা। তাই তাদের নতুন গান পাওয়া মানেই অনেকটা গরম ক্ষীর পাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার ছিল।

নব্বইয়ের শেষ দিকের সিনেমায় প্লেব্যাক করা শুরু করেন আইয়ুব বাচ্চুও। আমরা যারা একটু মফস্বল শহরে বড় হইছি, আমরা আগে থেকেই ব্যান্ড মিউজিকের সাথে একটুআধটু পরিচিত ছিলাম। আইয়ুব বাচ্চুদের মতো ব্যান্ডশিল্পীরা যখন সিনেমায় গান গাইলো, তখন দেখলো তাদের জন্য অডি গানের বাজার আরও বড় পরিসরে বেড়ে যায়। ঠিক তেমনি সিনেমার বাজার ধরার জন্য ‘বিয়ের ফুল’ নামে সিনেমায় জেমসের ‘মিরাবাঈ’ গানটাও ব্যবহার করলেন মতিন রহমান। সেই সিনেমাও ব্যাপক হিট। কিন্তু এইসব হিট সিনেমা ও হিট গান কখনোই এন্ড্রু কিশোরকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। জীবনের প্রথম তার যে গান শুনছিলাম শেষবারও যে গান তিনি গেয়েছন (অসুস্থতাজনিত কারণ ছাড়া) সবখানেই তার গলা একই রকম ছিল। এত ভরাট এত ভালোবাসা দরদ ভর্তি একটা কণ্ঠ, বাংলাদেশে আবার কবে পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। আশঙ্কা করি, পাওয়াই যাবে না। আমাদের আগের যে-প্রজন্মটা, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশু-কিশোর ছিলেন, তাদের কাছে তো এন্ড্রু কিশোর আরও বড় কিছু।

ব্যান্ডের শিল্পীরা যখন সিনেমায় গাইতে শুরু করলো, তখন অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমার পুরনো গানগুলো রিঅ্যারেঞ্জ বা রিমাস্টার্ড করে নতুন অডিও অ্যালবাম প্রকাশ পেতে শুরু করলো। সাউন্ডটেক  একটা অ্যালবাম করলো ‘ফিরে ফিরে আসি’। এন্ড্রু কিশোরের আশির দশকের সেই সেরা গানগুলো, যেগুলো এখনও মানুষের মুখে মুখে, এন্ড্রু কিশোরের নাম নিলেই যেসব গানের কথা মনে আসে সেসব। থানা শহরের অডিও অ্যালবাম বিক্রির দোকানে একটা সংস্কৃতি ছিল পুরনো ক্যাসেটে গান রেকর্ড করে নেয়ার। নতুন ক্যাসেট না কিনে বাতিল বা অপছন্দের ক্যাসেটে নতুন অ্যালবাম কপি করার। ‘ফিরে ফিরে আসি’ অ্যালবামটা মনে হয় আমাদের এলাকায় তখন সবচেয়ে বেশি কপি হইছে ওইভাবে। আর বিক্রি তো হইছেই।

এত বিশাল কলেবরের একজন শিল্পীর সিনেমার বাইরে গান খুবই কম। এইটা তার জন্য যতটা ক্ষতির তারচেয়ে বেশি ক্ষতির বাংলা গানের জন্য। এত ভার্সেটাইল কণ্ঠকে বাংলা গান কেবল সিনেমায় আটকায়ে রাখছে, ভাবতে মন খারাপও হয়। যদিও কিছু কিছু সংগীতপরিচালক চেষ্টা করছে তারে দিয়ে গান গাওয়ানোর, কিন্তু সেগুলো সিনেমার গানের চেয়ে জনপ্রিয়ও হয়নি, ভালোও হয়নি।

সেই এন্ড্রু কিশোর আর নতুন গান গাইবেন না। বাংলাদেশের সিনেমার, সিনেমার সংগীতপরিচালকদের ও সর্বোপরি দর্শকশ্রোতাদের জন্য ঘটনাটা যে কত বড় হতাশার, তা বলে বোঝানো যাবে না।

০৭ জুলাই ২০২০


ইলিয়াস কমল রচনারাশি
গানপারে এন্ড্রু কিশোর

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you