ব্লগযুগ বলে একটা ক্যাটাগরি হিস্ট্রিতে টাইমবুকে আছে কি না জানি না, বাস্তবে এমন একটা টাইম পার করে এসেছি খিয়াল হয়। বাংলাদেশে। দেশজুড়েই। ভীষণ উজ্জীবক এক সময়। মানুষ মনে হচ্ছিল সোল্লাসে লিখছিল। বিচিত্র বিষয় এবং ভঙ্গিমায়। ব্যাকে গেলে এই সময়টা হাতের তালুতে দেখতে পাওয়া যায়। বেশি ব্যাকে যেতে হয় না, মাত্র বছর আটেক আগে গেলেই ইউফোরিয়াটা আঁচ করা যায়। নানাবিধ কমিউনিটি ব্লগে লেখালেখির ধুম। সত্যিকার অর্থেই ইউফোরিয়া। কার্নিভ্যাল। উতরোল সৃজনোল্লাস।
পরবর্তীকালে ফেইসবুকে এবং ওয়েবপোর্টালে সেই-সময়ের ব্লগযুগের ব্লগারদের লেখালেখির কন্টিন্যুয়েশন লক্ষ করা গেলেও ওই ইউফোরিয়াটা আর ফিরিয়া আসে নাই। বিপুলসংখ্যক লেখকের সমাগম ঘটেছিল ব্লগে লেখালেখির সুবাদে। এদের মধ্যে একভাগে যেমন পুরাকালে লেখালেখিলিপ্ত লোকেরা ছিলেন, কবি কথাসাহিত্যিক প্রাবন্ধিক অনুবাদক সাংবাদিক ইত্যাদি আইডেন্টিটি নিয়া কাগজযুগ থেকে লেখক হিশেবে পরিচিত, সবচেয়ে বড় অংশটায় একদল লোক নতুন একটা বর্গ ব্লগার হিশেবে পরিচিত হতে থাকলেন।
ব্লগসাইটগুলাকে কেন্দ্রে রেখে একেকটা আলগ কম্যুনিটি গড়ে উঠতে লাগল। ব্লগাররা নিজেদেরে লেখক বা রাইটার না-বলে ব্লগার ও সঙ্গে অ্যাক্টিভিস্ট পরিচয় দিলেন। পরে এই পরিচয় আরও খুঁটিনাটি বিবর্তনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে। সেসব কথা থাক আপাতত। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, অনলাইন অ্যাক্টিভিজম প্রভৃতি পরিচায়ক ব্যক্তিবর্গ ও বিষয়াদির সঙ্গে এনগেইজড হতে থাকে কাগুজে মাধ্যমে অভ্যস্ত পাঠকেরাও। যদিও ব্লগযুগের সময়স্প্যান খুবই ক্ষীণ, অল্প সময়, পাঁচ সাত বছরের বেশি নয় হিসাব করলে। এরই মধ্যে একটি বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী নিজেকে ব্লগার পরিচয় না দিয়েও ব্লগে লেখায় লিপ্ত হয়েছে। একসময় স্তিমিত ও নিস্তেজ হয়ে এসেছে ব্লগগুলা, তার আগে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গিয়েছে। ব্লেইম গেইম, আস্তিক নাস্তিক, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ বিপক্ষ প্রভৃতি আদ্দিকালের বাইন্যারিগুলার চাপে লেখার ব্যাপারটা সৃজনের মননের চর্চার ব্যাপারটা গৌণ হয়ে কেবলই রাজনৈতিক পরিচয় নির্মিতির কারখানা হয়ে উঠতে থাকে ব্লগগুলা। রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে ঝুঁকতে শুরু করার টাইমটায় নাশকতামূলক একের পর এক ঘটনায় ভেস্তে যেতে শুরু করে এই ক্রিয়েটিভ কম্যুনিটিগুলি। নিছক ব্লগার বা ডাইহার্ড ব্লগাররা ছাড়া যারা আগে থেকে লেখালেখিলিপ্ত কবিসাহিত্যিক সবাই ব্লগিং থেকে মুখ ফিরিয়ে ফেইসবুকে লেখা চালানো স্বস্তিকর মনে করতে থাকেন।
ব্লগযুগের অল্প কলেবর কালখণ্ডের মধ্যেই নিহিত যুগটির উন্মেষ, চূড়ান্ত বিকাশ ও বিয়োগান্ত পরিণতি। বিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে এই মাধ্যমে লেখা হয় নাই এমন বিষয় বাইর করা টাফ হবে। লেখা হয়েছে সব ধরনের বিজ্ঞান, দর্শন, কলা, শাস্ত্র, ধর্ম, পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব ও সাহিত্য নিয়ে। একসময় এত বিচিত্রমুখী সৃজনচর্যা প্রাণস্ফূর্তি নিয়ে ব্লগকম্যুনিটিগুলা কালের গহ্বরে ব্ল্যাকাউট হয়ে যায়। তার আগে ঘটে যায় দুইহাজারতেরো। অব্যবহিত পরের চোদ্দ ও পনেরো অব্দে দফায় দফায় রাষ্ট্রীয় মদতে চালিত হয় ব্লগারহত্যা। জায়েজ হতে থাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে একের পর এক ব্লগার খুন করা।
যা-হোক, বাংলাদেশে ব্লগযুগের প্রভাবে লেখালেখিজগতে খেয়াল করার মতো কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না তা জানি না, জানতে যদিও আগ্রহ আছে, এইটা জানি যে এদেশের রাজনীতিতে বা আরও স্পষ্ট করে এখানকার ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে এর একটা ইম্প্যাক্ট পড়েছে। লেখালেখির আধার ও আধেয়গত কোনো যোগবিয়োগ ঘটেছে কি না তা না-জানলেও প্রকাশনায় একটা বুম ঘটেছে এইটা খালিচোখেই ঠাহর করা যায়। কিন্তু ব্লগিঙের ইম্প্যাক্ট বাংলা ভাষার নতুন সময়ের গদ্যভঙ্গি নির্মাণে পথ দেখিয়েছে কি না তা জানতে এবং বুঝতে ব্লগারদের বই হবে প্রধান উৎস। সচলায়তন, সামোয়ারইন, মুক্তমনা, আমার ব্লগ প্রভৃতি বিচিত্র নামের ব্লগসাইটগুলো অচিরে নেমেছিল বইপ্রকাশনায়। এছাড়াও মূলধারা পাব্লিশার হাউজগুলো ব্লগারদেরে প্রেফারেন্সে রেখে বই ছাপাইতে থাকে। একে একে অনেক নয়া পাব্লিশারের পত্তনি ও প্রতিষ্ঠা ব্লগারদের বই ছাপিয়েই হয়। একটা স্যাম্পল সাইজ ঠিক করে কেউ যদি কিছু ব্লগারের গদ্যপ্রধান বই নিয়ে স্টাডি করে, দেখতে পারব কোথায় কি কি যুক্ত হলো কোথায়ই-বা হারাল।

২
অত কথা পাড়লাম বইতাকিয়ায় পেপারব্যাক একটা বই খুঁজিয়া পাওয়ায়। নাম ‘ব্লগাবলি’। লিখেছেন সৈয়দ আফসার। অবশ্য ব্লগে রেগ্যুলার লিখলেও সৈয়দ আফসার ঠিক ব্লগার ছিলেন বলা যাবে না। ভার্চুয়ালযুগ উদয়ের বহুকাল আগে থেকেই সৈয়দ আফসার মূলধারার লেখালেখিফিল্ডে লেখক হিশেবে অ্যাক্টিভ। নব্বইয়ের দশক থেকেই লিটলম্যাগে লেখা ছাপানো ও নিজে ম্যাগাজিন বার করার কারণে লেখক হিশেবে একটা আলগ পরিচয় তার আগে থেকেই ছিল। অনেক ব্লগেই তিনি লিখেছেন ‘অতিথি লেখক’ হিশেবে। সেইসব ব্লগ থেকে বেছে এই তিনচাইরপাতা-কম চৌষট্টিপৃষ্ঠা চাইরফর্মার বা আসলে আটান্নপৃষ্ঠার বই। দি ব্লগস। ব্লগাবলি।
চিলতে বই। চিলতে লেখাগুলি। চিলতে একটা ব্লার্ব বা যাকে বলে পুস্তিকাপরিচয় থেকে লেখাগুলি নির্মাণের পটভূমিকাটা আন্দাজ করে নেয়া যায়। নানাবিধ ব্লগক্ষেত্রে এগুলো প্রকাশিত হয়েছিল বলে এর কালেক্টিভ নাম ব্লগাবলি। নিবন্ধের প্রবন্ধের আঁটোসাঁটো ফর্ম্যাটিভ নর্মস থেকে বেরিয়ে এই চিলতে লেখাগুলি। শিরোনাম তাই ব্লগাবলি। বিনীত ও অনাড়ম্বর উপস্থাপন। পুস্তিকাপরিচায়িকায় জানা যায় এইটা একজন কবির প্রথম গদ্যবই। কিন্তু তার কবিতার এ-যাবৎ প্রকাশিত ছয় বইয়ের চারটাই গদ্যপুস্তিকাটা ছাপা হবার আগের একদশকে প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল।

৩
সৈয়দ আফসার কবিতা লিখছেন গত শতকের অন্তিম দশক নব্বইয়ের সংলগ্ন ও নতুন এক সহস্রাব্দের প্রথম দশকের গোড়া থেকেই, রয়েছে তাঁর একাধিক কবিতাবই, পরিচিতিও গড়ে উঠেছে মূলত কবি হিসেবে। এই প্রথম গদ্যবই তাঁর, ‘ব্লগাবলি’, ফোয়ারার ন্যায় মুক্তধারায় উৎসারিত হয়েছে কথার নির্ঝর।
কথা নানা প্রসঙ্গের নানা অনুষঙ্গের হলেও কথার উৎস কিন্তু এক ও অভিন্ন। উৎস কবিতা। কথা এখানে কবিতার, কথা কবির, কথা বাংলা ভাষানুষঙ্গ ও কবিতাকলাকুশলীর। অবশ্য পুস্তিকায় প্রত্রস্থ রচনাগুলোকে সেই অর্থে প্রবন্ধ বলা যাবে না হয়তো, বলছেনও না এর রচিয়তা, বলা হচ্ছে এগুলো ব্লগ।
অনলাইন প্রকাশনাগুলোতে লেখক অংশগ্রহণ করে আসছেন কখনো প্রদায়ক হিসেবে, কখনো মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যকারী নিষ্ঠাবান নাগরিক, কখনো-বা সাধারণ পাঠক হিসেবে পাঠোত্তর প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপনকারীর ভূমিকায়; এবং ব্লগ লেখার একটা সুবিধে এ-ই যে, এখানে কোনো প্রকার প্রকরণগত প্রাকার-পাহারা ছাড়াই লিখে যাওয়া যায়। এর ফলে এসব অন্তর্জালক্ষেত্রে এত মুক্তকণ্ঠের সমাবেশন সম্ভব হচ্ছে। এই বইটি সে-রকমই কিছু ব্লগের একটি নির্বাচিতা।
তাছাড়া কবির গদ্য সবসময় কবিতাপাঠকের কাছে একটি বিশেষ প্রাপ্তি। নিরাবেগ যুক্তিতক্কো কবির গদ্যে প্রত্যাশাও করা হয় না। স্ফূর্ত অনুভূতির স্বতোৎসারণই পাঠক প্রত্যাশা করেন কবির কাছে, যেমন কবিতায়, এমনকি তিনি যখন কবিতার বাইরে এটা-ওটা নানাকিছু নিয়ে নিরেট গদ্যানুচ্ছেদ রচনা করেন তখনও। কবির কলমে/কিবোর্ডে রচিত ধরণীতে প্রবেশের একটি দিগন্তদুয়ার হলো ওই কবিরই স্বীকারোক্তি/নিরীক্ষামূলক বিভিন্ন রচনাদি।

৪
সৈয়দ আফসার। কবি। জন্ম ও বেড়ে-ওঠা বাংলাদেশের সীমান্তজনপদ সিলেটের এক প্রসিদ্ধ অঞ্চল জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যবাসী। কবিতাকাগজ সম্পাদনা করেন, অর্কিড, দুইয়েরও অধিক যুগ ধরে। গদ্য লেখেন, অনানুষ্ঠানিক, ব্লগস্পট ও ওয়েবপত্রগুলোতেই প্রধানত। প্রকাশপ্রাপ্ত কবিতাবই এ-যাবৎ সাত। এ-যাবৎ মানে অ্যাজ অফ টুথাউজ্যান্ডটোয়েন্টিসিক্স। ‘ব্লগাবলি’ রিলিজের পরেও সৈয়দের আরও দুইটা কাব্যবই রিলিজ হয়। ‘সেলাই গাছের কারখানা’ ও ‘মুহূর্তমন্দিরা’। লাস্ট বইটা তাঁর কবিতার বেস্ট এপিটোম, ছয় পাব্লিশড কবিতাবইয়ের মধ্যে।
এই বইটা ছাপিয়েছে ‘কোলাজ’, ইন কোলাবোরেশন উইথ ‘সূনৃত’, বইটা বার হয়েছে বারুতখানা সিলেট থেকে ফেব্রুয়ারি দ্বিসহস্রতেরোয়। এত বছর পরে এই চিলতে বই ফিরে পেয়ে এর গায়ে দুই প্রকাশনালোগো দেখে মনে পড়ল, ওই সময়টায় ‘সূনৃত’-এডিটর কাম ‘কোলাজ’-প্রোপাইটর আহমদ সায়েম বেশকিছু বইপুস্তক প্রকাশ করেছিলেন। সম্পূর্ণ অলাভজনক এমন উদ্যোগ একসময় বাংলা সাহিত্যকে শেইপ-আপ করেছে। এদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড অফবিট প্রকাশনার ইতিহাসে এমন উদ্যোগসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা বাঞ্ছনীয়।

৫
সৈয়দ আফসারের কবিতা যারা ভালোবাসেন, তারা তাঁর গদ্যবই/ব্লগবুক সমাদরে টেনে নেবেন নির্জন পড়ার টেবিলে। এতদিনে এখন অবশ্য বইটা আউট অফ প্রিন্টস্টক হয়ে যাবার কথা।
জাহেদ আহমদ [রচনাকাল ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সংযোজন ও পরিমার্জন জুলাই ২০২৬]
গানপারে সৈয়দ আফসার
জাহেদ আহমদ রচনারাশি
- ব্লগযুগে এই চিলতে গদ্যের বইটি লিখিত - July 7, 2026
- কনফেশন ফ্রম লাস্টবেঞ্চ বাই আবুল হাসান - July 3, 2026
- চক্রবর্তী বিনয় - July 2, 2026

COMMENTS