সিলেটের মাটিতে কী যেন আছে! শুধু চা-বাগানের সৌন্দর্য নয়—গান ও গায়েনের সুরধর্মে, ফকিরিজ্ঞানের অমোচনীয় পরিচর্যা ও সাধনাগত ঐতিহ্যে এই জনপদের মানুষেরা স্নিগ্ধ, মরমি, সহিষ্ণু ও সহজিয়া| ইয়েমেনের হযরত শাহজালাল সুফিজ্ঞানের সাথে সাথে নিয়ে এসেছিলেন মিশর, ইরান, ইরাক ও আফগানিস্তানের সুরের ঐতিহ্য| তাঁর আগমনে মানবিক ও সহজিয়া ইসলামের আলোয় স্নাত হয়েছে সুরমা-কুশিয়ারা-বকার উপত্যকা| এমনিতেই এই মাটিতে বহমান ছিল প্রেম ও সহিষ্ণুতার ধারা| এই ধারাতেই যুক্ত হলো সুফি ও মরমিজ্ঞানের সুর| সৃষ্টির লীলায় ও সংকীর্তনে শ্রীচৈতন্যের প্রেমধর্মে জাগ্রত হলো নতুন সমাজ| গান যেমন সমাজ তৈরি করে, তেমনি সমাজও গান তৈরি করে| গান হচ্ছে জ্ঞান| সিলেটের একেকজন গায়েন গানের মাধ্যমে মূলত সমাজ তৈরি করতে চেয়েছেন| ফকির আরকুম শাহ-র গান মূলত বাংলার ফকিরিজ্ঞানের প্রতিচ্ছবি|
কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে
ফুলে বইলা ভ্রমরা
ময়ূর বেশেতে সাজইন রাধিকা।
সোয়া চন্দন ফুলের মালা
সখিগণে লইয়া আইলা
কৃষ্ণয় দিলা রাধার গলে
বাসর হইলো উজালা
বাসর হইলো উজালা গো
বাসর হইলো উজালা
ময়ূর বেশেতে সাজইন রাধিকা।
কৃষ্ণয় দিলা রাধার গলে
রাধায় দিলা কৃষ্ণর গলে
আনন্দে সখিগণ নাচে
দেখিয়া প্রেমের খেলা
দেখিয়া প্রেমের খেলা গো
দেখিয়া প্রেমের খেলা
ময়ূর বেশেতে সাজইন রাধিকা।
কৃষ্ণপ্রেমের প্রেমিক যারা
নাচে গায় খেলে তারা
কূল-মানের ভয় রাখে না
ললিতা আর বিশখা
ললিতা আর বিশখা গো
ললিতা আর বিশখা
ময়ূর বেশেতে সাজইন রাধিকা।
ফকির আরকুম শাহ এই গানে বাংলা বৈষ্ণব গীতিকার ঐতিহ্য ও আবহ নিয়ে হাজির হয়েছেন| সহজতা ও প্রেমের আন্তরিকতায় এই গীতিকবিতা বৈষ্ণব কবি চণ্ডিদাস কিংবা জ্ঞানদাসকেও ছাড়িয়ে গেছে| মিলনের কী অপূর্ব আয়োজন ও উচ্ছ্বাস! কূলমান, ভয়-ডর ত্যাগ করে রাধিকা ময়ূরবেশে বসে আছে| কৃষ্ণপ্রেমে সমর্পিত আছে| ফকির আরকুম শাহ-র উত্তরাধিকারেরা পরম ভক্তি ও নিষ্ঠায় এই গানের বাণী ও কর্তব্যকে ধারণ ও প্রচার করেছেন| আরবান মনের অস্থিরতা নিয়ে এই জ্ঞানকে স্পর্শ করা কঠিন| কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আরবান পিপলও এই গান গেয়ে উল্লাস ও মাস্তি করছে| কিন্তু ফকিরের এই গানে কিন্তু উল্লাস কিংবা মাস্তি নেই; আছে সমর্পণ| আত্মায়-পরমাত্মায় মিলন|

সম্ভবত ২০০২ কিংবা ২০০৩ সালে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের কম্পোজিশনে হাবিব ওয়াহিদ আরকুম শাহ-র ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’ গানটি রি-অ্যারেঞ্জ করলেন| মনে হয় তিনি একটা এক্সপেরিমেন্টই করেছিলেন| রি-অ্যারেঞ্জের ভেতরেও ছিল সিলেটের মাটির টোন, মায়া ও সুর| যেন সুরমা ও কুশিয়ারার বাতাস থেকে নেমে আসছেন বৃষ্টিস্নাত প্রেমের রাধিকা| হাবিবের হাতে মাটির রাধিকাও যেন আরবান রাধিকা হয়ে কৃষ্ণের প্রেমে ও মিলনে উল্লাস করছে|
‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’—এই গান বাংলা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে একটা নতুন ধারার সূচনা করেছিল| বাংলার লোকগান জয় করে নিয়েছিল আরবান তারুণ্যের মনোজগৎ| যদিও নতুন ঢঙ ও গায়কী তবুও কী এক জাদুবলে গানটা কিন্তু পুরো বাংলাকেই স্পর্শ করেছিল| না-রক, না-ফোক—ভক্তিবাদের ভেতরে না-থেকেও হাবিব গানটা দিয়ে একটা ইতিহাসই তৈরি করেছেন| এই ইতিহাস থেকেই নাগরিক মিউজিকের ফর্মে রি-অ্যারেঞ্জ হতে থাকল বাংলার ফোক ও সাধু ঘরানার গান|
আচ্ছা, এতে আরকুম শাহ-র কি কোনো প্রচার কিংবা প্রতিষ্ঠা এসেছে? আরকুম শাহ-র ফকিরি জ্ঞানের কোনো ধারণা কি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?—মনে হয় না| আরবান পিপল বড়জোর গানটা নেয়, গানের মজাটা নেয় কিন্তু গানের জ্ঞান ও বাণী গ্রহণের ক্ষমতা আরবান পিপলের নেই| আরবান পিপলের কোনো সাংস্কৃতিক শিকড় নেই| তারা আজ এই গানে ভাসবে, কাল অন্য গানে ভাসবে| নিজেকে ভাসানোতে তারা নিজের কোনো তরী খুঁজে পায় না| বা খুঁজতেও চেষ্টা করে না| অথচ এই গানটা তাদের মাটির গান; বাপ-দাদার গান|
ঢাকার নিউমার্কেট থেকে শুরু করে কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর চায়ের দোকানে এই গান কেন প্রাণ তৈরি করল? গেরুয়া কিংবা শুভ্র কাপড়ের আশ্রমসাধুর বাইরে নাগরিক ধ্যানের কিবোর্ডধারী হাবিবকে কেন বাংলার শ্রোতারা গ্রহণ করল? হাবিবের আয়োজনে কি অসাধারণ কিছু ছিল? ছিল—হাবিবের মধ্যে প্রজন্মের একটা কম্পোজিশন ছিল| কিন্তু গানের কথায়, ধ্যান ও ধারণার মধ্যে ছিল বাংলার শাশ্বত অভিজ্ঞতা; পরমের প্রতি সমর্পণ| ‘ময়ূর বেশেতে সাজইন রাধিকা’—এই কথার সুরে মনের অজান্তেই শ্রোতাগণ রাধারূপে বিচরণ করেছেন কিংবা রাধার সহজতায় কেউ-না-কেউ আচ্ছন্ন হয়েছেন| যখনই আচ্ছন্ন হয়েছেন, তখনই চোখের সামনে যেন ভেসে উঠেছে—‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে / ফুলে বইলা ভ্রমরা|’ ফুল ও ভ্রমরের মিলনের সেই মানবীয় মুহূর্তকে সহজ মানুষ মাত্রই অনুভব করতে পারে| দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার এই মিলন| তাই তো—‘কৃষ্ণ দিলা রাধার গলে, বাসর হইল উজালা|’ এই বাসর শব্দটার গূঢ়ার্থ অনেক অনুভবজাত| মিলনের চরম বিলীন মুহূর্ত|

এই গানের সেই মরমি বোধ ও আধ্যাত্মিক রহস্যকে কি গায়ক কিংবা শ্রোতারা অনুভব করতে চেয়েছেন? আমার মনে হয় না| প্রকৃত বাউলেরা কেউই গান করেন না; গান প্রচার করেন| গান মানে গানের জ্ঞানটা প্রচার করেন| গানের জ্ঞান প্রচার করা হাবিব ওয়াহিদের উদ্দেশ্য ছিল না| তিনি গান করেছেন; জনপ্রিয় হয়েছেন| এক্ষেত্রে তিনি সফল| তবে তাঁর গায়কীর মাধ্যমে একটা কিংবদন্তিপুরুষের জ্ঞান ও গৌরব বিস্মৃত প্রজন্মকে আরকুম শাহ-র গান ও জ্ঞানের জগতের দিকে তাকাতে অনুপ্রাণিত করেছেন—এটাও অনেক|
আরকুম শাহ গানটা লিখেছিলেন—সাধক ও সাধনের তাগিদ থেকে| এখানে তিনি কোনো পার্থিব প্রেমের গল্প বলেননি| বাউলতত্ত্বে রাধা হলো মানুষের দেহ বা আত্মা, আর কৃষ্ণ হলো সেই আত্মারই পরমাত্মা বা ঈশ্বর| আত্মা পরমাত্মার সাথে মিলিত হতে চায়| দীর্ঘ বিরহের ভেতরে চলে পরস্পরের প্রতীক্ষা| প্রতীক্ষার অবসান হয়| একদিন পরমাত্মা কৃষ্ণ আসে জীবাত্মা রাধার কুঞ্জে| পরস্পরে ধরা দেন| মিলনের আনন্দে বাসরঘরটা তখন উজালা বা আলোকিত হয়ে ওঠে| হাবিবের ইলেকট্রনিক বিটের পরশে কিংবা রি-মেইকে হাবিব কি বাংলার শাশ্বত জ্ঞানের বার্তাকে পৌঁছাতে পেরেছে? না-পারলেও ফকিরিজ্ঞানের বাইরের একটা লোক ভিন্ন ফর্মে গানটা গেয়েছেন| তাঁর স্বার্থেই তিনি গেয়েছেন| এতে ফকিরি জ্ঞানের কিংবা চর্চার কোনো লাভ হলো না| কিন্তু ফকির আরকুম শাহ-র ক্ষতিও হলো না| একটা প্রজন্ম হয়তো আরকুম শাহকে জানতেও পারত না—তারা অন্তত জানলো মহাজনী গান ও জ্ঞানের শক্তি|
জুলাই ২০২৬
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
- একটি গানের পুনর্বিন্যাস ও ফকির আরকুম শাহ || সরোজ মোস্তফা - July 9, 2026
- ফকির আরকুম শাহ || সরোজ মোস্তফা - July 5, 2026
- স্বাগত দুয়েন্দে || সরোজ মোস্তফা - May 19, 2026

COMMENTS