রেইন ইন দি গ্রেইভিয়ার্ড

রেইন ইন দি গ্রেইভিয়ার্ড

শেয়ার করুন:

বৃষ্টি হচ্ছে খুব। মাটি ভিজছে, মেদুর ঘাস ও লতাগুল্ম, কবরগাহের পাতাবাহার বেয়ে পানি পড়ছে প্লুতস্বর ঝিমঝিমি মিউজিকে। আমাদের মমতামানুষেরা ভালো আছে, বেদনাহীন আছে, এমন সঘন বৃষ্টির দিনে। গ্রেইভিয়ার্ডে এই বিষণ্ণ জুলাইয়ের বৃষ্টি কী নিরাধারায় ঝরে…


এত শূন্য মনে হয়, চিন্তা, লেখাপড়া, কাজবাজ, প্রার্থনার সকল সময়…


এই-যে এতকিছু, তোমারই জন্য তো! সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি যদি খোদার মেহেরবানি হয়, এই-যে এখন এ-মুহূর্তে এই শূন্য মনে হওয়া এই পণ্ড মনে হওয়া…‘কার ঘরে যায় করতালি / পুড়ছে আলোর বাজি’…যার ঘরেই যাক, উঠুক হল্লাহাসি যারই গ্যালারিতে, শান্তি হোক। স্বস্তি হোক। সবরমতী আশ্রম ও অযোধ্যা মসজিদের মেঝেতে ফরাশ পেতে হাঁসফাঁসা মানুষেরা ভাবুক,—কে বলে তা বহুদূর?…আপনার মাঝে হ্যাভেন অ্যান্ড হেল, আপনাতে সুরাসুর।


তৃষ্ণায় ফেটে যায় ছাতি, নিবারণী সংঘের লোকেদেরে ডেকো না আল্লার দোহাই! পারো যদি ডেকে আনো তৃষ্ণাপ্রজ্জ্বলক পরিবহনমালকিনটিকে। ‘ম্যেরে খায়ালোঁ কি মালকা / চারোঁ তরফ তেরি ছাইয়া / ম্যেরে খায়ালোঁ কি মালকা…


লু হাওয়া চারিধারে। হাভেলির বাইরে থেকে তেজি বাইসনের চামড়া-চাবকানো রইদ এসে ঘুলঘুলির চড়াইটাকেও ফুঁসলাচ্ছে অন্য কোনো ছায়াদিগন্তে যেতে। বেগমসাহিবানের ভ্রু ভিজে আছে স্বেদসলিলে, কর্পুরমাখা ঘাম ও গন্ধকের নেশালু হাওয়ায় ডুবুডুবু তরণী। গাধাটা বাঁধা সামনের রোয়াকের ভাঙা সিংহমস্তকের পাশের খুঁটিতে। আখাম্বা গাধার গা থেকে ঝুলিছে ঘুঙুরের ছড়া। অ্যারাবিয়ান দুপুর।


কোত্থেকে ভেসে আসে উড়ে উড়ে এই চিলডানা বাতাসরৌদ্রের দেশে ভাঁটফুল, তন্দুর-সেঁকা ঘ্রাণ। চনমনিয়ে ওঠে, ফের ধড়ফড়িয়ে, বেগমসাহিবানের বুভুক্ষু ছিপনৌকার জ্যামিতিক প্রাণ। দুপুর গড়ায়। বিকালটাও গড়াগড়ি দিয়া পাততাড়ি গোটায়। আসে সন্ধ্যা। আবার বৃষ্টি। জিনিপোকার পাখাগুলি ছিটায় বৃষ্টিফোঁটার ত্রাণ।


গোরস্থানের ল্যাম্পোস্টগুলি বিভিন্ন গাছগাছালির ফাঁক থেকে আলো দেখায় নাগরিক নিষ্ঠায়। সিটি কর্পোরেশনের বিকট আকৃতির আরসিসিঢালাই স্ল্যাবগুলি বিকট একেকটা ডাঁই করে একটু দূরে দূরে রাখা। প্রাচীন প্রপিতামহদের পূর্বসূরিদের হাতে লাগানো মহাবোধিবৃক্ষগুলি নিকেশ করে অ্যামাজনঘন অরণ্যের এক গোরস্থান দুইদশকের দুঃসহ উন্নয়নলুটপাটের আমলে একটি ডিস্টোপিয়্যান ড্রেনেইজের ভাগাড় হয়ে উঠেছে। এই এক গোরস্থানে গেলেই কেবল পায়ের পাতায় মাটির স্পর্শ ঘাসের স্পর্শ লভিতাম আমরা, তার বদলে এখন আরসিসিঢালাই স্ল্যাবের ড্রেনেইজ পায়ের তলায়। আর হাজার হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন মশা। বাংলাদেশের প্রবাদশ্রুত চৌষট্টিহাজার গ্রামের গঞ্জের মেট্রোপুলিসের গোরস্থানের হালনাগাদ একই চিত্র অভিন্ন দশা।


গাছ রাখি নাই গোরস্থানেও, কনক্রিটের সিমেন্টের সভ্যতা বানাবার ঠিকাদার আর ওয়ার্ড কমিশনারের কব্জায় গাছগুলি চিরতরে বেপাত্তা। ল্যাম্পোস্টগুলিরই শুধু উচা উচা মাথা। আরসিসিঢালাইয়ের উপর বৃষ্টিপাতের সাউন্ড ট্র্যান্সপোর্টউইন্ডোয় বৃষ্টিপাতের মতোই মিউট, মূক, নো অডিয়ো অনলি ভিডিয়ো। অন্ধকার নাই। নিশ্চয় একটা গন্ধরাজের ঝাড় পাবো, খুঁজে বেড়াই। গ্রিলে ঘেরা প্রাচীরতোরণ পেরিয়ে মাদ্রাসাবারান্দা ছুঁয়ে মসজিদকম্পাউন্ডে এসেও খুঁজি, নিদেন একটা হাস্নুহেনার ঝাড় যদি পাই। নাই।


জীবিতেরা কেমন আছে, কী স্ক্যান্ডালাস কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে, দেখতে চাইলে গ্রেইভিয়ার্ডে যাও। অমর মানুষেরা আরসিসিঢালাই থেকে বাদ রাখছে না তার গোষ্ঠীগাড়ার কবরখানাটাও।

১০
মসজিদেরই পাশে লেকিন লোভী মানুষের লকলকে লেলিহান লুটপাটের গ্রাসে ড্রেনেইজের গোলকধাঁধায় আমায় কবর দিও না ভাই। জীবনে পেটভরে খেয়েছি বলতে তো শুধু মশার কামড়টাই। কিন্তু নোংরামির নাগপাশ থেকে কাজী নজরুল ইসলামও তো রক্ষা পান নাই।

১১
বৃষ্টি সহসা থামবে না। আর খাড়ায়া থাকা যাচ্ছে না। আগাই।

জাহেদ আহমদ


জাহেদ আহমদ রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you