ইন্টারনেটে থাকা আজকের নতুন কোড বা ডেটার কত ভাগ অ্যাআই-জেনারেইটেড? অনেকখানি, তাই না? আরও পাঁচ-দশ বছর পর? হয়তো ইন্টারনেটে থাকা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ডেটাই অ্যাআই জেনারেইটেড হবে এইটা তো মানেন? শুধু কোড না, লেখা, ছবি, ডকুমেন্টেশন সবকিছুতেই একই স্রোত—৫-১০ বছরের ভিতর সব অ্যাআই-জেনারেইটেড হয়ে যাবে।
এই ব্যপারটাই ২০২৪ সালে অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজ সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখলেন। তারা একটা অ্যাআই মডেলকে ট্রেইন করালেন। এই ট্রেইন্ড মডেলের আউটপুট ডেটাকে আবার ইনপুট হিসেবে নিয়ে ট্রেইন করালেন আরেকটা মডেল। তারপর সেটার আউটপুট দিয়ে আরেকটা। এভাবে চলল জেনারেশনের পর জেনারেশন।
শুরুর দিকে তেমন সমস্যা দেখা যায় নাই। ৯ নম্বর জেনারেশনে গিয়ে হইলো চরম অবস্থা। এখানে মডেলের উত্তরগুলা ধীরে ধীরে বিকৃত হইতে শুরু করল। সেই মডেলকে প্রশ্ন করা হলো ‘মধ্যযুগের স্থাপত্য’ নিয়া, সেটি তার উত্তরে ‘খরগোশের লেজ’ নিয়া কথা বলা শুরু করল।
কি বুঝলেন? যদি একটা মডেল তার নিজের জেনারেট-করা ডেটা দিয়ে পরবর্তী মডেল ট্রেইন করা হয়, এবং এটা জেনারেশনের পর জেনারেশন চলতে থাকে, তাহলে মডেলের আউটপুট ধীরে ধীরে ‘ক্ষয়’ হয় এবং শেষে গার্বেজ আউটপুট দেয়। গবেষণাটা ছাপা হলো ‘ন্যাচার’Nature জার্নালে এবং নাম দেওয়া হলো ‘মডেল কল্যাপ্স’।
এবার আমার প্রশ্ন হইলো, ৫-১০ বছর পর যখন মডেল ট্রেইন হইতে যাবে, তখন সে শিখবে কোথা থেকে? অর্থাৎ তার ট্রেনিং ডেটার উৎস কি হবে? সে তো ইন্টারনেটের কন্টেন্টই খাবে, তাই না? কিন্তু সেই ইন্টারনেটে তখন তো থাকবে তারই আগের ভার্শনের মডেলের জেনারেটেড করা কোড/লেখা। মানে সে শিখবে নিজের কাছ থেকে। নিজের লেখা পড়ে নিজে ‘নতুন’ কিছু বানাতে যাবে।
আর ঠিক এখানেই সে ধরা খাবে। ওই এক্সপেরিমেন্টের মতো।

কারণ, মানুষের হাতে তৈরি নতুন আর আসল কনটেন্ট যত কমবে, অ্যাআইয়ের শেখার জন্য নতুন জিনিসও তত কমে যাবে। নতুন জিনিস কমলে শেখাও ধীর হয়া যাবে। আর শেখা ধীর হয়ে গেলে গত কয়েক বছরে অ্যাআই যেভাবে লাফায়ে লাফায়ে উন্নতি করসে, সেই গতিটাও একসময় কইমা আসবে। যে-জিনিসটা তাকে এত শক্তিশালী বানায়সে, সে ধীরে ধীরে সেই উৎসটাই শেষ করে ফেলতেসে।
সাপ যেমন নিজের লেজ কামড়ে খায়।
আর এই চিন্তাটা শুধু আমার না। ট্রিলিয়ন ডলারের অ্যাআই কোম্পানিগুলা অনেক আগেই এই হিসাব বুইঝা গেছে। তাই তারা এখন কী করছে, একটু খেয়াল করেন।
- গ্যুগল বছরে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে রেডিটকে। কেন? মানুষের লেখা কোটি কোটি কমেন্ট ব্যবহার করার জন্য।
- ওপেনঅ্যাআই, নিউজ কর্প-এর সঙ্গে শত শত মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করসে মানুষের লেখা সংবাদ ও প্রতিবেদনের জন্য।
- আবার স্কেইল অ্যাআইয়ের মতো কোম্পানিগুলো পিয়েইচডি-করা মানুষ, গবেষক আর বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের ঘণ্টা হিসেবে টাকা দিতেসে, যাতে তারা অ্যাআইয়ের জন্য একদম নতুন করে লেখা আর ডেটা তৈরি করেন।
যে কাজটা আমরা গত ২০ বছর ধরে ফ্রিতে কইরা আসছি, সেই কাজের এখন বাজারদর তৈরি হয়েছে। সামনে মানুষের হাতে তৈরি আসল কন্টেন্টের দাম আরও বাড়বে। আমরা যেটা বইলা আসতাম, অ্যাআই আমাদের চাকরি খায়া দিলেও নতুন চাকরি তৈরি করবে।

তাই, অ্যাআই কোম্পানিগুলা এই সমস্যা সামলাতে কয়েকটা পথ ফলো করতেসে।
প্রথম পথ, সিন্থেটিক ডেটা। তবে যে-কোনো সিন্থেটিক ডেটা না। যেখানে উত্তর ঠিক না ভুল, সেটা যাচাই করার উপায় আছে, আর সেই যাচাইয়ের পেছনে আবার ডোমেইন-এক্সপার্ট মানুষ আছে। এজন্যই কোডিং আর রিজনিং-এর মতো জায়গায় অ্যাআই এখনও ভালো উন্নতি করতেসে, এবং প্রোগ্রামার ডেভেলপারদের ভাত মাইরা দিতেসে। কিন্তু ইতিহাস, সংস্কৃতি, মতামত বা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো বিষয়গুলোতে এই পদ্ধতি ততটা কাজ করে না। কারণ সেখানে ঠিক-ভুল মাপার কোনো সহজ যন্ত্র নাই। এখানে হিউম্যান টাচ লাগে।
দ্বিতীয় পথ, লাইসেন্সিং। অর্থাৎ মানুষের লেখা কন্টেন্ট সরাসরি টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া। যেমন আপনি ফেসবুকে কোনো বিষয়ে পোস্ট করবেন, সেই পোস্ট টাকা দিয়ে অ্যাআই কোম্পানিগুলো কিইনা নিবে। গ্যুগল, ওপেনঅ্যাআইদের বিভিন্ন চুক্তিই তার উদাহরণ।
তৃতীয় পথ, এক্সপার্ট ডেটা। সাধারণ ইন্টারনেটের তথ্য অনেকটাই ব্যবহার হয়ে গেছে। এখন ডাক্তার, আইনজীবী, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক এমন মানুষের কাছ থেকে নতুন জ্ঞান/ইনোভেশন তৈরি করায়ে অ্যাআইকে শেখানো হইতেসে।
এই তিনটা পথের একটা মিল খেয়াল করসেন?

শেষ পর্যন্ত সব ইন্ডাস্ট্রির মানুষের কাছেই অ্যাআই ফিরে আসবে।
অ্যাআই মানুষকে রিপ্লেইস করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বুঝসে, মানুষ ছাড়া তার নিজেরও চলবে না। যেই গাছ সে কাটতে গেসিলো, এখন সেই গাছেই সে পানি দিতেসে।
অবশ্য এটাও সত্যি, অনেক আগাছা অ্যাআই ইতোমধ্যেই সরায়ে দিছে, সামনে আরও দেবে। আপনি গাছ হবেন, নাকি আগাছা—সেটা নির্ভর করবে আপনি আপনার জন্য নতুন কোয়ালিটি তৈরি করতে পারেন কি না, তার ওপর।
তাই একটা কাজ করেন। আপনি যা জানেন, সেটা লিখে রাখেন। নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের কাজ, নিজের শেখা জিনিসগুলো ডকুমেন্ট করেন। এমন সমস্যা নিয়ে কাজ করেন, যেগুলোর ডেটা এখনও ইন্টারনেটে খুব কম। দরকার হলে অ্যাআইকে পাশে বসিয়েই কাজ করেন। চিন্তাটা যদি আপনার হয়, তাইলে অ্যাআই শুধু সেই চিন্তাকে গুছিয়ে দিতে, দ্রুত এগিয়ে নিতে আর ভালোভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করবে।

এই পুরো লেখাটাও আমি অ্যাআইকে পাশে রেখেই লিখসি।
একটা কথা মনে রাখবেন। গ্লোব্যাল অ্যাআই এখনও আমাদের কৃষকের বাস্তব সমস্যা পুরোপুরি জানে না। আমাদের আইনের অনেক সূক্ষ্ম বিষয় বোঝে না। আমাদের লোকাল ভাষা, আঞ্চলিক টোন বা স্থানীয় বাস্তবতা তার কাছে এখনও অসম্পূর্ণ। যারা এই লোকাল জ্ঞান দিয়া লোকাল সমস্যার সমাধান বানাবে, তাদের সঙ্গে সিলিকন ভ্যালির প্রতিযোগিতা হবে না। বরং একদিন সিলিকন ভ্যালিই তাদের সঙ্গে কাজ করতে চাইবে।
গুড লাক!
- অ্যাআই বিজ্ঞান || সাইফুল ইসলাম - July 10, 2026
- ম্যাডোনার নয়া অ্যালবাম - July 7, 2026
- আল মাহমুদের কবিতায় প্রকৃতিনিমগ্ন নারী || মেকদাদ মেঘ - June 29, 2026

COMMENTS