ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৩ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৩ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

১৩.
সকাল ৭.৫০ ঘটিকায় তিনি তার পেখম মেললেন। আরেহ, তিনি একা নন, পাশে উনার স্ত্রী গোত্রীয় কেউ হবেন। বেশি বয়সে বিবাহিত পুরুষ যেমন স্ত্রীকে হারানোর ভয়ে আগলে রাখতে চায়, উনিও তেমন করে ট্রিকি কায়দায় পাশে স্ত্রীকে রেখেছেন। পাশে রেখেছেন ঠিকই, তবে স্ত্রীর রঙের বাহার অনেকটাই ম্লান করে দিয়ে।

এই দূরদেশের আকাশে রামধনুর কথা বলছিলাম। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম তার উজ্জ্বল রঙের উপস্থিতি। কী যে অপরূপ দৃশ্য! তখনো রবিমামা আসেননি উনার তীব্র আলোর রথ নিয়ে। না এলেই বা কী? আলো না থাকলেও লালিমায় ঢেকে রাখতে চাইছেন দশ দিগন্ত! কিন্তু আকাশ ভরা মেঘের কারণে পেরে উঠছেন না। মেঘে মেঘে ঢাকা পড়ে আছে এই অরণ্য-শহর।

“বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস / এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে / পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস / দুয়ার চেপে ধরে / অবনী, বাড়ি আছো?”

উহু বৃষ্টি এইখানে নিঃশব্দে ঝরে পড়লেও কেউ কাউকে জিজ্ঞাসা করে না—
‘অবনী বাড়ি আছ?’

দশক দুয়েক আগে এই একটি মাত্র বাক্যে আমি ঘায়েল হয়ে গিয়েছিলাম। ঘায়েল মানে আপাদপমস্তক বিদ্ধ। স্পষ্ট করে বললে হয়ে গিয়েছিলাম একেবারে লেইট, উন্নত বাংলায় যাকে বলে মরহুমা। আমি কি আর বেঁচে উঠতে পেরেছিলাম? কী জানি! বলতে পারবে আমার সোলমেটরা। কই হে উহারা? আমার হৃদয়রাজ্যের দোসরেরা, তোমরা কই?

‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’ / বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান…

আর আমি কিনা হয়েছিলাম তাহার বাক্যে খানখান! আর সুযোগ বুঝে এই ভঙ্গুর আমাকে সে আরও আচ্ছাসে পিষেছিল। পিষে করেছিল ধুলোবালি। এমনকি উড়িবার পাখা দুটিও কঠোর পুরুষালি হাতে ছিঁড়ে নিয়েছিল। সে-ইতিহাস অন্যত্র বলা যাবে।

বলছিলাম রামধনুর কথা। আজ এই পেখম-মেলা রামধনুর হয়েছে মেঘের ভিতর উত্থান।

এদিকে আসন্ন Fall-এর বার্তা নিয়ে বৃক্ষদের উদ্যত-মস্তকে আগুন লেগে দাউদাউ করে জ্বলছে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! আগুনে ছাওয়া পত্ররাজির ওপর জাফরানি রঙের ভোর জেগে আছে।

ভোরের হাওয়া এলে ঘুম ভাঙাতে কি / চুম হেনে নয়ন-পাতে। / ঝিরি ঝিরি ধীরি ধীরি কুণ্ঠিত ভাষা / গুণ্ঠিতারে শুনাতে॥ / হিম-শিশিরে মাজি’ তনুখানি / ফুল-অঞ্জলি আন ভরি’ দুই পাণি, / ফুলে ফুলে ধরা যেন ভরা ফুলদানি / বিশ্ব-সুষমা সভাতে॥

আমার দুর্বল হৃদয় সদ্য ঘুম ভেঙে হতবিহ্বল হয়ে আছে। উদোম বাহুদ্বয়ে লাগছে ভোরের হালকা হিমের আঁচ।

মুগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি প্রশস্ত ব্যালকনিতে। নিচেই কয়েকটা বার্চ আর মেইপল গলাগলি করে আছে। বার্চের শরীরে হলুদের স্পর্শ। পাতা ঝরার আগে পাণ্ডুর চোখ মেলে তাকিয়ে আছে রামধনুর অপরূপ উপস্থিতির দিকে।

আগুনরঙা বৃক্ষদের ফাঁকফোকর দিয়ে মসৃণ পথ চলে গ্যাছে অজানা গন্তব্যে। পথের ওপর মেঘেরা ছিটিয়ে গ্যাছে যেন কোনো পবিত্র জল। এ-জল পদ্মার নাকি গঙ্গার? নাকি টেমসের? কিছুই স্পষ্ট করে বলার বা জানার উপায় নাই।

ইদানীং এই বিদেশবাড়িতে কিছু লিখতে গেলে শতসহস্র সুর আমাকে আকুল করে তোলে। এর কারণ আমি জানি না। তবে এটা তো জানি, সুরেই উপশম। সুরেই সদগতি।

আর যে আমাকে পিষে করেছিল ধুলোবালি, এমনকি আমার উড়িবার ডানাজোড়াও ছিঁড়ে দিয়েছিল—সেও বুঝি ছিল এক গানের পাখি? গলায় সুর না-থাকলেও যে গান বাঁধতে চাইত। বেসুরে বন্দী থেকেও যে ছড়াতে চাইত সুর। সে-ও কি তবে জেনে গিয়েছিল—সংগীতেই উপশম? সংগীতেই সদগতি?

এই জাফরানি-রঙা ভোরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আমি কেন এ-রকম আবোলতাবোল ভাবি? তাহার কথা কেন মনে আনি? আর মনেই যদি আনি, তাহলে এত যাতনাই বা পাই কেন?

সখী, ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে। / তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ‘ভালোবাসা  ভালোবাসা’— / সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কী কেবলই যাতনাময়। / সে কী কেবলই চোখের জল? সে কী কেবলই দুখের শ্বাস? /লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ?…

ভালোবাসা আবার কী? ভালোবাসা হলো যত্তসব আজগুবি ভাবালুতা। ফুসমন্তর! ভালোবাসা হলো Fully Eyewash! ক্রন্দনরত শিশুকে যেমন কেউ খেলনা দিয়ে, নানা ছলে ভোলায়, ভালোবাসাও হলো তেমনি এক ছলচাতুরি। ছল ছাড়া আর কিছুই নয়! কেউ কৌশল খাটিয়ে ভোলায়। কেউ-বা আপনাআপনিই ভোলে! কেউ বাঁচার তাগিদে ঝাঁপ দেয়। কেউবা জেনেশুনে আত্মাহুতি।

নিত্য দেহ ভোগের উন্মত্ত লিপ্সায় যে পলকে মুছে দেয় শত জনমের বন্ধন! পায়ের তলায় গুঁড়িয়ে ফেলে বহু যত্ন করে গড়া প্রাচীন কোনো মন্দির বা মসজিদের মিনার, তাহার কথা স্মরণে আনাও কবিরাহ-গুনাহ। তাহার কথা মনে আনাও মহাপাপ! যে-পাপের শাস্তি হতে পারে শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ড!

২১ অক্টোবর ২০২৫


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you