শ্রাবণবিদায়

শ্রাবণবিদায়

শেয়ার করুন:

ঢেউটিনে বৃষ্টি এঁকে রাখছে তার অপার্থিব আল্পনারাশি। বৃষ্টিপদশব্দে এই মধ্যযাম পার হলে আমারও তো পাবার কথা ঘুম, উল্টে দেখো পেয়েছে অঘুম! আমি বৃষ্টির বিস্তারিত বাদন শুনছি, আর বামকাত বালিশে আধশুয়ে লিখছি এই পাতাপঙক্তি। লিখছি আর ভাবছি, বৃষ্টির সঙ্গে আর-কিসের মিল দেবো অনায়াস আপ্লুতকর। এমনও শ্রাবণও দিনে মন-উচাটন মুহূর্তগুলো কোন যন্ত্রে কী ছন্দে বাঁধি?

দিন আজি বাইশে শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথ পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে লিখে গেছেন বহুভাবে বহুজায়গায়, কবিতায় গানে ছিন্নপত্রাবলিতে, কিন্তু বাইশে শ্রাবণ নিয়ে লিখে যেতে পারেননি প্রাকৃতিক কারণেই। সম্ভবত কবিগুরুর এই একটিমাত্র আক্ষেপ (!), মরণোত্তর আক্ষেপ অবশ্যই, জীবনে থাকতে পারে। এবং, বলা বাহুল্য, এমতো আক্ষেপ বোধকরি সমস্ত কবিরই রয়েছে। আক্ষেপ এ-ই যে, জন্মদিন নিয়ে কবিতা লেখা গেলেও মৃত্যুদিন নিয়ে লেখা যায় না, হায়!

নিজেই নিজের মৃত্যুদিন নিয়া আগেভাগেই লিখব! স্বরচিত মৃত্যুদিনবিষয়ক কবিতা, মানে নিজের মৃত্যুতারিখ নিয়ে নিজ হস্তে রচিত কবিতা/লেখা, একেবারেই অসম্ভব? না, সম্ভব। সম্ভব, যদি কেউ স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয়, যদি কেউ আত্মহত্যাব্রতী হয়। যা-ই হোক, আমাদের রবীন্দ্রনাথ জীবন ভালোবাসতেন বড়। ভালোবাসতেন বড় এই রঙ্গবঙ্গভব। খুব বোধগম্য কারণে স্বাভাবিকভাবেই জীবন ও জগতের রূপ-রস নিংড়ে ভুবনের ভাঁড়ার শূন্য করে তিনি পাড়ি দিয়েছেন অগস্ত্যযাত্রার পথে আশি বছর বয়সে।

অ্যানিওয়ে। অবশ্য জীবনানন্দ চাইলে পারতেন নিজের মৃত্যুদিনে কবিতা একখানা লিখে দেরাজে লুকিয়ে রেখে যেতে। কিন্তু ওই লোক তো জন্মদিন নিয়েও কোনোদিন একপঙক্তি লিখেছে বলে আজও নজির পাওয়া যায়নি। এই এক বান্দা, আপন সময়ের অনেক হিসাবের বাইরে এর দৃঢ় অবস্থান বরাবর। দুনিয়ার কোনো বাটখারা দিয়ে এর ব্যক্তিভাবসাব এখনও পুরোপুরি নির্ণয় করা গেল না। সারাটিজীবনই একপ্রকার অপ্রকৃতস্থ কাটায়ে গেলেন বরিশালের ব্রাহ্মসমাজের বাবু গুপ্তপদলোপী জীবনানন্দ দাশ।

প্রশ্ন উঠবে, ট্রামদুর্ঘটনার শিকার জীবনানন্দ স্যুইসাইড করেছিলেন বলে যে-কথাটা চালু আছে সেইটা আদৌ অত জোরালো নয়। এমন সময় দীপক রায়, আমার সহকর্মী দীপকদা, একবাক্যে এক অপিনিয়ন ব্যক্ত করলেন এই বলে যে রবিন-জীবন না হোক, “জাপানি সামুরাই কবি হয়তো লিখে থাকতে পারেন আপন জীবন সংহরণের কবিতা।”

হ্যাঁ, দীপকদা, তা-ই। হারিকিরি করা জাপানি সংস্কৃতিতে খুবই গরিমার, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের ব্যাপার। সেইভাবে মৃত্যুযাত্রার প্রাক্কালে লেখা হাইকু ও তানকা প্রভৃতি রয়েছেও অনেক। কিংবা রুশ কোনো কোনো কবি, যেমন সের্গেই ইয়েসেনিন বা ভ্লাদিমির মায়াকোভোস্কি, আত্মহত্যার আগমুহূর্তে কবিতা লিখে গেছেন। অথবা ইংরেজি কনফেশনাল পোয়েটদের অনেকেই এমনধারা লিখেছেন যারা পরবর্তীকালে স্বেচ্ছামৃত্যু খুঁজে নিয়েছেন। যেমন সিলভিয়া প্লাথ, অ্যান সেক্সটন, রবার্ট লোয়েল প্রমুখ এবং আরও অনেকে।

কিন্তু ওইসমস্ত লেখাপত্র স্যুইসাইডাল নোট হয়েছে শেষমেশ, মৃত্যুদিন উদযাপন করার মতো কোনোকিছু হয়ে ওঠে নাই। বিদায় নেবার আগে একটু করুণ বিউগলধ্বনি, অভিমানপ্রকাশ ইত্যাদি হয়েছে। কিন্তু আমি খুঁজছিলাম মৃত্যু সেলিব্রেইট করার কবিতা।

তা বোধহয় চায়না জাপানি কবিতা পাঠ করলে একটা দাঁড়াদিশা পাইতে পারব। প্রয়াণ উদযাপনের কবিতা আসলেই লিখে গেছেন কি না আমাদের বা তাহাদের ভাষার কবিরা। আবারও বলে রাখি, ট্রিবিউট বা এলিজি লিখে যে-সেলিব্রেশন, সে তো কবিরা সাহিত্যিকেরা অন্যের মৃত্যু নিয়ে লেখেন। আমরা খুঁজছি নিজের মৃত্যুদিন নিয়ে লেখা কবিতা, যা কবিরচিত টোম্বস্টোন বা এপিটাফও নয়।

শ্রাবণে থেকে থেকেই মৃত্যুর কথা ইয়াদ হয়।

জাহেদ আহমদ ২০১৩ অগস্ট ২২ শ্রাবণ

জাহেদ আহমদ
Latest posts by জাহেদ আহমদ (see all)
শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you