শোনো পুঁইপাতা, জাকির জাফরান ও এক গার্ডেনারের গান

শোনো পুঁইপাতা, জাকির জাফরান ও এক গার্ডেনারের গান

শেয়ার করুন:

শোনো পুঁইপাতা : পাণ্ডুলিপির কবিতা

অপরূপ অন্তরঙ্গ এক গুপ্ত সব্জিবাগানের খোঁজ পাওয়া গেল ‘শোনো পুঁইপাতা’ পাণ্ডুলিপি রিড করবার সময়টায়। ট্রেজার অর্থে গুপ্ত, সমকালের আবিলতাযুক্ত অর্থবোধিনীর গুপ্ত নয়। যেমন ট্রেজার আইল্যান্ড, তেমনই ট্রেজার গার্ডেন। আবার, জেনেসিসের সঙ্গে সংযুক্ত গার্ডেনটার কথাও ইয়াদ করায়। প্রায় পঞ্চাশ, চল্লিশোর্ধ্ব সংখ্যায় চিহ্নিত, কবিতার সমাহারে ম্যানাস্ক্রিপ্টের ড্রাফট। সর্বশেষ খবর অনুসারে ইয়েট টু বি এন্ডেড, অসমাপ্ত, সমাপ্তির-অপেক্ষায় পাণ্ডুলিপির ফাইলপত্র কবি এখনও প্রকাশকের টেবিলে পাঠান নাই।

স্টিল ভার্জিন একটা পাণ্ডুলিপি, রিডারভ্রমর যার উপর এখনও উপবেশন করেন নাই, তা নিয়া আলাপ চালাবার আগে এই নিবন্ধের রেলেভ্যান্স ও কন্সিক্যুয়্যান্স দুনো সম্পর্কে একটা আভাস দিয়া রাখা আবশ্যক। প্রথমত, যৌক্তিকতার কথাটা আগে পাড়ি। প্রকাশিতব্য বইয়ের সম্পর্কে একটা আগাম প্রচারণার গরজের চেয়েও বড় অব্লিগ্যাশন তৈয়ার হয় গানপারে ম্যানাস্ক্রিপ্টের একটি মিনি প্রেজেন্ট্যাশন হাজিরার বেলায়। এত বড় একটা পাণ্ডুলিপি থেকে গুটিকয় ছিঁড়ে এনে ছাপাবার সময় গিল্টি ফিল হয়। যেমন হয় একটা মালা থেকে ফুল কিংবা পুঁতি ছিঁড়ে নেবার সময়। একটা ভূমিকায় সেই অপরাধবোধের যদি কিছু উপশম হয়, তাই নিবন্ধের অবতারণা।

তাতে সমস্যা একটাই। নিবন্ধে ব্যবহৃতব্য পয়েন্টগুলি বিবেচনাগুলি ঠিকঠাক প্রতিষ্ঠা পাবার আগে রেফারেন্স গরহাজির হয়া যাবার আশঙ্কা। পাঠক যখন বই হিশেবে এন্ডপ্রোডাক্টটা হাতে পাবে, ম্যানাস্ক্রিপ্টের সঙ্গে সেই ফাইন্যালাইজড ভার্শনের মিল দুর্লক্ষও হয়ে উঠতে পারে। এহেন কন্সিক্যুয়্যান্স মাথায় রেখেই নিবন্ধে ব্যাপৃত হয়েছি। কিন্তু নতুন নয়, এমন আরও হয়েছি এই কবির আগের বইটার সময়। পাণ্ডুলিপি পর্যায়ে ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ পাঠপূর্বক কোনো-একটা সাময়িক পত্রিকার প্রয়োজনে একটা পাঠভূমিকা লিখতে হয়েছিল, পরে যেইটা গানপার আর্কাইভ করেছিল, বর্তমান প্রযোজনা ডাইরেক্ট গানপারেরই। ইন ফ্যাক্ট, কন্সিক্যুয়্যান্সের কথায় এইটাও বলে নিতে হবে যে এ-ধরনের রচনায় টেক্সটের ক্রিটিক কাম্য নয়। কাম্য অ্যাপ্রিসিয়্যাশন। বলা যায় এ এক ওয়েলকাম নোট। ওয়েলকাম টু দি টেক্সট রিটেন ইন দি স্ক্রিপ্ট। ওয়েলকাম টু ‘শোনো পুঁইপাতা’। অ্যা গ্রিটিং স্পিচ। বা, নাম বদলে যেতেও পারে বইপ্রকাশের সময়, লাইনে স্ট্যাঞ্জায় নানাবিধ পরিবর্তনও হতে পারে বাই দ্যাট টাইম, তারপরও মনে হয় এই নিবন্ধটা জাকির জাফরানের নতুন রচিত কবিতায় যাবার পথে একটা স্বাগততোরণ হিশেবে এককোনায় থাকতে পারে।

টেক্নিক্যাল আরেকটা দ্রষ্টব্য উল্লেখ করলেই নিবন্ধে পাঠকের প্রবেশ নির্বিঘ্ন হবে। সেইটা হচ্ছে, এই নিবন্ধের সঙ্গে সাপ্লিমেন্ট আকারে গানপার পাব্লিশ করছে দশটি মাত্র কবিতা, যা কবিনির্বাচিত, পাণ্ডুলিপিতে যেগুলি নিউমেরিক ডিজিটে এক থেকে একটানা সাত ও আটত্রিশ ঊনচল্লিশ চল্লিশ, গণিতচিহ্ন উঠিয়ে সেগুলি চিত্রিত হয়েছে এখানে একেকটা ক্যারেক্টার সাইন দিয়ে, অ্যাস্টেরিক্সে, এ সত্ত্বেও নিবন্ধবক্তব্যে এর বাইরেকার গোটাচল্লিশেক কবিতার অভিঘাত পড়েছে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। এইবার অল্পপায় নিবন্ধের পানে আগানো যায়।

এক আশ্চর্য পুষ্টিবাগানের আবিষ্কর্তা পাঠক শোনো পুঁইপাতার সব্জিবিচ্ছুরিত অক্ষরমালায় ট্র্যাভেল করে যেতে যেতে এভরি বিট অফ ইট, এর প্রত্যেকটা বাকস্পন্দন, ক্রমশ রস নিয়ে ধীরে ধীরে টের পেতে থাকবেন। গোটা পাণ্ডুলিপি দৃষ্টিসীমায় আপাতত অনুপস্থিত হলেও দশটা মাত্র কবিতার আওতায় আলতো রেখায়, প্রায় রেখাহীনই বলা যায়, যেভাবে সমকাল উঁকি দিয়ে যেতেছে দেখবেন, এইটাই আলোচ্য বইয়ের চারিত্র্যগত অনন্যতার অনেকের মধ্যে একটি নিদর্শন মনে রাখবেন। বজায় থেকেছে এ-চলন শুরু থেকে এই কাব্যের উপান্ত পর্যন্ত। অন্ত দেখি নাই এখনও।

উচ্চকিত ওভারটোন নয় একটুও। অতি নিরুচ্চারের নিরিবিলিতায় বাঙময় এই লিটল রিভার ব্যান্ড এই ল্যভ রান্স ব্লাইন্ড কবিতামালা। আর পড়তে পড়তে এও মনে হতে পারে যে এ এমনই লিরিক্যাল র‍্যাপ্সোডি যে এখানে এমনকি সমকাল উহ্য রইলেও অসুবিধা নাই। শিল্পকলার কাছে এই জিনিশটাই আমরা চাই। সিস্টেমিক বাইন্যারি মিনিঙের বাইরে এক ঝটকায় বের করে নিয়া যাওয়াটাই আজকের ও চিরকালের কবিতার সাহিত্যের শিল্পকলার কাজ। কবিতার একটা আলাদা আবহমানকাল দিয়ে এই কাব্য শুধু নয় যে-কোনো কাব্যই গৃহীত বা বর্জিত হয় বলে আমি বিশ্বাস করি।

কিন্তু এখানে, এই দশটায়, যে-নির্লিপ্তি যে-নিরাসক্তি নিরখ করে গেলাম তা যেন বজায় থাকে শেষ পর্যন্ত, কবির কাছে এইটাই আমাদের চাওয়া। আর বাগানিয়া হিশেবে, গার্ডেনার হিশেবে, যে-প্রেজেন্টেশন করেছেন কবি নিজের, দুর্ধর্ষভাবে সস্ত্রীক, এইটা আরও এক্সপ্লোর করবেন কামনা করব। সব্জিনামগুলা যেভাবে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠতেসে, কেবল লনগার্ডেন কিচেনগার্ডেন না থেকে এইটা যেভাবে ব্যাপ্ত পরিসর হয়ে উঠতে চাইতেসে, যেন গ্লোব্যাল এক গার্ডেন, কবি এখানে নিজে থেকে কোনো মিনিং পুরে দিচ্ছেন না তারপরও সব্জিসমস্ত সপ্রাণ ইঙ্গিতপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং মুহুর্মুহু উঠতেসে, খেয়াল করলেই বুঝতে পারব কবি নিজে থেকে মিনিং পুরে দিচ্ছেন না বলেই জিনিশগুলা অ্যালাইভ হয়ে উঠতেসে। এইটা, এই ম্যাজিকটা, আগাগোড়া ম্যানাস্ক্রিপ্টে টের পাওয়া যায়। এই নিরাসক্তি, এই নিরাবেগ নিষ্প্রেম অথচ গভীর অন্তর্লগ্ন অবলোকনের ভঙ্গি, নিশ্চয় একটা বাঙময় বাংলা কবিতার যাত্রা সফল করে তুলতে চলেছে। এই পাণ্ডুলিপির অগ্রসরমানতার দিকে নির্নিমেষ তাকায়া থাকা যায়, যেখানে অ্যাভ্যাইল্যাবল এমন উচ্চারণ, “হে অসাধারণ, আমি এক বেগুনের গাছ মাত্র, করুণ!”

উপরের প্যারায় বেগুন বলায় মনে পড়ল, ছফার ‘পুষ্প, বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ’ বইটার কথা। জাফরানের পাণ্ডুলিপির কিচ্ছুটির সঙ্গে ছফার কোনো সংলগ্নতা নাই। কিন্তু বইটা আরেকবার পড়ে নেবার এইটাই সময়। এ এমন টেক্সট যা আপনাকে বেহদ্দ পক্ষবিপক্ষ প্যাঁচপয়জার থেকে এক লহমায় বাইরে বের করে নিয়া যায়। এমনই এক ক্রান্তিকালে, ১৯৯০ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরের দিন সন্ধায়, শাহবাগ থেকে এই অকৃতদার লেখক বাসায় ফেরার পথে একটা আলতো উশ্টা খায়া ফুটপাথে পড়ে গেলে অন্ধকারে সেখানে একটা বেগুনের চারা দেখতে পান। সত্যি বলতে বেগুনগাছের সঙ্গেই ধাক্কা খান। পরে আশেপাশে আরও কয়েকটা, আহমদ ছফা দেখতে পান, ছালাদিয়া হোটেলের ফেলে দেয়া তরকারির ঝোল থেকে সেদ্ধ বিচির মাধ্যমে বেগুনতরুগুলার জন্ম অনুমান করা যায়। এই বেগুনচারা বাসায় এনে রোপণ করা থেকে এর পরিচর্যা ও পরিণতি ঘিরে আবর্তিত হয় ছফার অতিশয় কৃশতনু মহাকাব্যিক উড়ানের এক পুরাণ। এপিক আসলে। গদ্যে। এই দশটা কবিতা বা আদ্যোপান্ত কবিতাপাণ্ডুলিপিটা আত্তারের সেই বিহঙ্গপুরাণ মনে পড়ায়। ফরিদুদ্দিন আত্তারের বার্ডস কনফারেন্স। অথবা জালালুদ্দিন রুমি।  ঠিক ক্রান্তিকাল না-হলেও হতচকিত একটা সময়ে এসে এই দশ ও দশের অন্তরালের প্রোজপোয়েমগুলি লেখা। আহমদ ছফা বা আত্তারের বা জালালুদ্দিনের নামাবলি নিলাম এই নির্মীয়মাণ টেক্সটের জন্রা বা জাত বুঝাইতে যেয়ে। এইটা, আমি আবারও বলছি, বেগুনগাছের উপস্থিতিতে মনে পড়েছে, এবং ছফা জাফরান উভয়ের দুই ক্রান্তিকালের দুই হিস্যা তাদের দুইজনের দুই পাণ্ডুলিপিতে ধরা থাকল, মনে হচ্ছে সেই বইটার মতো এইটাও একটা এপিক একটা দার্শনিক বোধোদয়ের রিভিল্যাশন হতে চলেছে।

“ঢেঁড়স ফুলের চোখ দিয়ে আমি দেখছি আকাশ”—কবির এই উক্তি দিয়া কাব্যপ্রবেশের সময় এই ইঙ্গিত প্রতিষ্ঠা পায় ‘ঢেঁড়স ফুলের চোখ’ মানে অসহায়ের চোখ, নির্বাক নয়ন ইত্যাদি। ডিনোট করতে হয় না আর কবির জগৎসংসার। অবশ্য এমনিতে একটা আজদহা বাইন্যারিপীড়িত নন্দনচর্চার ঘেরাটোপে এদেশের শিল্পসাহিত্য পর্যুদস্ত। ‘শোনো পুঁইপাতা’ তা থেকে মুক্ত মনে হয়েছে। এইটা ব্যক্তিক প্রেমাবেগের জিনিশও নয়, যেমন নয় গার্ডেনিঙের ম্যানুয়াল বইয়ের মতো কিছু। বলা যায় এইটা নাগরিকের ন্যুব্জ সময়ের সংহিতা। আধ্যাত্মিক অনুবোধনের অম্লান উপাখ্যান। হতে চলেছে, দেখতে পাচ্ছি।

ছিন্নপঙক্তির চয়নিকা না বানায়া কাব্যের বিভিন্ন মুহূর্তের ব্যঞ্জনায় এইবার একটা সাধারণ শোকেইস অর্গ্যানাইজ করা যায়। একটা কবিতায় গৃহসংলগ্ন নিমগাছের ফ্রেইম ঢোকান কবি। ইট ইজ জাস্ট লাইক অ্যা ওয়াও। জ্বলন্ত রইদের দুপুরবেলায় ছাদের নিমগাছ থেকে একটা পাতা নেমে এসেছে ছাদে—এমন মনোরম মুহূর্ত তৈয়ার হলে কে না আকৃষ্ট হবে! এই কবিতাতেই পৃথিবীকে অ্যাড্রেস করে কবিকে বলতে শোনা যায়, “ও আমার পিরথিমি! গ্রহের ছলনা থেকে দেখে রেখো আমাদের সবুজ পটল!!” বুঝতে বেগ পেতে হয় না কাব্যের এই পটল কীসের দ্যোতক। দুঃখিনী না-বলে এই পটলটাকে সবুজ বিশেষণে স্পেসিফাই করতেসেন কবি। বিউটিফ্যুল! সবুজ বললে দুঃখিনী বলতে হয় না আর। সবুজ সংসার। সবুজ বিষেরও রঙ, ধুতরাপাতার। সবুজ স্মার্ট। সবুজ দুঃখও বোঝায়। স্বদেশচেতনায়। এই কাব্যপ্রবাহ অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ হয় স্যাঁতসেঁতে স্বদেশচেতনা থেকে বেরোতে পারায়। আর পুরো কবিতায় এই যে একটা আল্লার হাওলা করে রেখে যাওয়া, এই অসহায়তা, এইটাই এই কবিতার ও গোটা কাব্যপ্রবাহের স্ট্রাইকিং অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ ড্রাইভিং ফোর্স। এইখানে সবুজ পটলটাকে কে বাঁচাবে? কবি পৃথিবীর হাওলা করে যাচ্ছেন পটলটাকে। হেল্পলেস হলেও হোপলেস নন কবি, রিডারের মতো, বোঝা যায়। আরেকটা কবিতায় তেমনি ‘পৃথিবীর খানিক উপর থেকে রোজ, এসব ঘটনা আমি দেখি’—বিহঙ্গনেত্রের এই ইঙ্গিত, খানিক উপর থেকে দেখার এই ইঙ্গিত, পুরা কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে একটা বার্তা দেয়। বার্তাটা কাব্যিক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও অত্যন্ত সৎ।

বঁটিদাও দিয়া পাতাকপি বা আভিধানিক বাঁধাকপি কাটার প্রশ্নে এই গার্ডেনার আরেক কবিতায় তার বউকে বেদরদ ভাবতেসেন লক্ষ করব, খুনখারাবির জন্য গোনাহগার ভাবতেসেন বেচারিকে, একটু ধন্দ হয় পড়তে পড়তে।  এর অব্যবহিত পরেই ‘বউ, তোমার কী পরকাল নাই’ লাইনটা পড়ে ধন্দ কাটে। এ সেই বিরলপ্রায় সেন্স অফ হিউম্যর, যা বাংলা কাব্যের গড়পরতা কবিরা ব্যবহার করতে জানেনই না। জাকির জাফরানে সেন্স অফ হিউম্যরের অনাবিল একটা স্মার্ট উপস্থিতি তার অভিষেককাব্য ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ থেকেই খিয়াল করে এসে থাকব। “বরবটিসিঁড়ি দিয়ে নামছ যে পিপীলিকা, তোমার পোশাক গেল কই!”—এমন অনেক লাইন বর্তমান কাব্যপ্রবাহিকায় তাদের চকিত উপস্থিতি দিয়া পাঠককে যেন বলতে চায়, এই তো! তোমার জীবন, রঙিন, সম্পূর্ণ! গোমড়া নয়, হাসো! অট্ট নয়, আলতো।

সহস্রাব্দের প্রথম দশকে আবির্ভূত কবির কমবেশি তিনদশকের কাব্যচর্চায় ডেব্যুবই ও পরবর্তী জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়পূর্ব সমুদয় বই নিয়ে একটি পর্যায় কল্পনা করা গেলে ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ দ্বিতীয় পর্যায় এবং ‘শোনো পুঁইপাতা’ তার তৃতীয় ও টু বি কন্টিন্যুড নবপর্যায়। আমার বিবেচনায়। ব্যাখ্যা কে চায়। জিগাইলে দেয়া যায়। সেইটা আজকাল অ্যাআই আরও উমদা দ্যায় বলে শুনতে পাই। সৃষ্টিশীলেরাও গর্বিত পরিচয় দিয়ে বেড়ায় তারা অ্যাআইয়ের বেয়াই। বিরাজ করবে ভবের মেলায় খালি নিমর্দা বালপাক্নারাই।

কিন্তু উপস্থিত কোট করতে না-পারলেও কোনো-এক কবিতায় দেখলাম পোকার প্রতি যেই মায়া দেখানো হলো, শোনো পুঁইপাতায়, তা আশ্চর্য মর্মান্তিক। চ্যালেঞ্জও এইখানেই। ফাইন্যালি একটা সময় এই সব্জিবন্ধু কবিটিকে পোকাদমনের একচেটিয়া এম্পাওয়ারমেন্ট প্রয়োগ করতে হবে। কেম্নে এই ডিলটি তিনি করেন, সামনের কবিতাগুলায়, সেইটাই দেখার। থ্রিলিং হবে, এইবার। পোকানাশ অথবা সব্জিচাষ। খাদ্যচক্রের শৃঙ্খলায় ন্যায়ের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে পোকারও অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা, তা রাখেন কেমন করে দেখব, ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটায় কেমন করে হয় সংগতি সাধিত। কবি বিপদে পড়বেন সন্দেহ নাই। বিপদ উতরাবেন কি না তা আমার কাছে বিবেচ্য নয়, বিপদকালে তার আচরণ আমার কাছে বিবেচ্য। কথাটা জানায়া রাখলাম।

ও, আরেকটা কথা মনে হচ্ছিল। চল্লিশে পেরিয়ে পঞ্চাশ ছোঁয়া পাঠকশ্রেণির আমরা/আমি এখন যে-কোনো সাধারণ টেক্সটের ভিতর থেকে আধ্যাত্মিকতা পাইতে চাই এবং সেহেতু যা পাইতে চাই তা পাই। কিংবা তা বাইর করে ফেলি। কিন্তু এই আমি চব্বিশ থেকে চল্লিশের ভিতরের পাঠক হলে টেক্সট থেকে আধ্যাত্মিকতা চাইতাম না, সমস্ত আধ্যাত্মিক রচনাকে সেই বয়সে আমরা কামনাবাসনার টেক্সট হিশেবে পড়েছি, লিপ্ত হয়েছি টেক্সটের লগে, প্রেম পেয়েছি। অগাধ। অতএব, কবিতামালাটাকে সেই দুই বয়সশ্রেণির পাঠকের কথা মাথায় রেখে একটা মিডল গ্রাউন্ডে রেখে দেবেন কবি সবসময়, চাইব এইটা, আধ্যাত্মিক শব্দটা মাথায় না থাকলেই ভালো। কবিতা আধ্যাত্মিক এক উৎপাদনপ্রক্রিয়া, আপনা থেকেই, তার আর এক্সট্রা আধ্যাত্মিক হবার দরকার হয় না। অ্যাবাভ অল, পোকার আবির্ভাবে এই মিহি স্বচ্ছ কবিতামালার জটিলতার দিকে যাত্রা সাবলীল জলের মতো হোক।

বলব যে এই কাব্যের লাইন বাই লাইন এবং রিডিং বিটুয়িন দ্য লাইন্সের ভাব আমার কাছে ক্লিয়ার। কিন্তু কোথাও কোথাও স্তবকান্তরে অত্যধিক এক্সক্লামেশনের প্রয়োগের কারণে কর্তা বা উদ্দেশ্য বিধেয় কখনো কখনো সনাক্তকরণে বেগ পোহাতে হয়। এক্সক্লামেশন কমায়া লাইনগুলা শার্পেন আপের দিকে টেক্সট ডেভেলপমেন্টের কোনো-একটা পর্যায়ে কবি নিশ্চয় নিবিষ্ট হবেন। অবলীলায় পড়ে যাওয়া গেল তবু সমস্ত কবিতা। তারপরও সতর্ক পড়ে গেলাম। দুইহাজারপঁচিশের কতকগুলি দিবারাত্র। অগ্রগতি অসাধারণ। সংগীতে যেমন রাগের বিস্তার, তারপরে প্রশমন, এই কাব্যপ্রবাহ অনুরূপ বিস্তারের সময় পার হচ্ছে দেখতে পেলাম। অচিরে যেন প্রশমনের দিকে যেতে পারে, যথাসময়ে, এই দোয়া করি। কিন্তু গুরুতর অর্থে একবারও চলন বা চাল বেখাপ্পা লাগে নাই কোথাও, পুনরাবৃত্তি কানে ঠেকলে নিশ্চয় তা বলতাম। কবিতাগুলি পড়তে পড়তে রেইনি সিজন সামার অটাম পারায়া যাই নিরঙ্কুশ উইন্টারে। একেক কবিতায় ফ্রেশ জ্যোৎস্নাপ্লাবিত কুয়াশার ঋতু গোচরে এল সহজে।

এই বাগানের আসলে শেষ নাই, যদি দেশ হিশেবে প্লেইস করি বাগানটাকে। ক্যালামিটি আসবে, শস্যবন্ধ্যা দশা পার হবে, বিরান হবে বাগান, আবার প্রপার মালির হাতে পড়ে বাগান পুষ্পপল্লবে ছেয়ে উঠবে, একদিন, এই তো। গোটা বইটা। আমার কাছে। এ অনিঃশেষ। আমরা বাগানের মালি মাত্র, মালিক নই। রিডার হিশেবে এই পলিটিক্যাল টোনটা অলরেডি পাচ্ছি আমি এইখানে এই বইটার গোপন প্রস্তাবনায়। ট্রিলোজিও অসম্ভব নয়, এই প্রবাহ বজায় রেখে, যেমন ‘সতত ডানার মানুষ’ মূলত তিনটা বইয়ের একটা। বাকি দুইটাও সমরূপ। ওই তিন বইয়ের প্রত্যেকটাই আমার কাছে উপসংহারহীন, অনিঃশেষ। রসযুক্ত কবিতা মাত্র উপসংহারহীন, অনিঃশেষ, অমীমাংসিত।

সবকিছুর উপরে এবং পরে যেটুকু সত্য তা সবকিছুর আগেও সত্য। সুন্দর একটা পাণ্ডুলিপিপাঠের অভিজ্ঞতা। আমার পড়তে এবং রসজারণ করতে একটা কাব্যেও সমস্যা হয় নাই। শুধু কবিতার বাইরে একটাই প্রশ্ন, সামনের মৌসুমে সত্যি কি সব ঠিক হয়ে যাবে? এইটা বাংলাদেশের বাস্তবের সওয়াল, কবিতার নয়।

জাহেদ আহমদ অগস্ট ২০২৬


শোনো পুঁইপাতা : পাণ্ডুলিপির কবিতা
জাকির জাফরান রচনারাশি
জাহেদ আহমদ রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you