শোনো পুঁইপাতা : পাণ্ডুলিপি পাঠভাষ্য
♣
ঢেঁড়স ফুলের চোখ দিয়ে আমি দেখছি আকাশ।
আমার দুচোখ বেয়ে বরবটি গাছ উঠছে অম্বরে। অতঃপর কলাবতী মেঘে। মেঘের ভিতরে গিয়ে আমাকে সে ডাকে—বুকের দুপাশে দুই পাথরের নদী, এসো।
ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যা। মাচাঙ ভাসছে ধীর লয়ে, আকাশগঙ্গায়।
বেগুনের সুপ্ত দুরবিনে দেখছি সূর্যের বুক। মানুষের কাছ থেকে দূরে যাবে বলে এক পুঁইশাকের যুবতী, হৃৎপিণ্ডে লুকানো পাথর সহ নেমে গেছে সূর্যাস্তে। এবার পুড়ছে গুপ্ত শহর, পুড়ুক।
♣
হে অসাধারণ, কুয়াশার ছিদ্র দিয়ে দেখা যাচ্ছে তোমার চুল। তুমি তো অনন্ত। তুমি অনাদি রাক্ষস। আমি এক ছোট্ট তুলতুলে পুঁইশাক। আমার কান্নার জলে ওঁত পেতে আছে কোন সর্প?
বিহঙ্গের বোকা বোকা বুকের স্পন্দন বাজে আমারই শিকড়ে। অতলান্ত চারা আমি। অথচ আশ্চর্য! এ ভূত্বক ছিঁড়ে, উদ্ভাসিত হব নাকি বণিকের করতলে!
বর্তনের মধ্যে, মাঝরাতে, ঘুমহীন কয়েকটি লাল ভাত। আরো জেগে আছে কিছু করুণ বেগুন।
পৃথিবীকে কমলালেবুর মতো ভেবে যে ভুল করেছি, সে-ভুলের নিচে অস্ত গেল সূর্য। আমি তাই বেগুন গাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ শঙ্কিত। হে অসাধারণ, তুমিও কি তাই?
♣
পরকাল থেকে ফিরে এসে, দীপ্ত এক পেঁপে গাছ ঝাপটে ধরেছে কোনো বেগুন গাছকে।
পেঁপে গাছে অশেষ গোধূলি। যেখানে আমরা মুখ ঘষি। কান্নার আবীর রঙা ঢেউ। যেখানে পাপের গন্ধ ধুই। বয়ে চলে কুয়াশাবিহ্বল নদী। সীমারের হাত থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়া তরমুজ, বলো দেখি, সবজি ক্ষেতের ভবিষ্যৎ আজ কতটা সবুজ?
এইবার, পরকাল থেকে ফিরে, আমিও ঠোঁট ঘষব তোমার ঠোঁটে। হাজার হাজার কামরাঙা গাছে।
সূর্যমুখী কোনো প্রতারক ফুল নাকি? পাপড়ি ছুঁতেই মনে হলো, এতদিন বেঁচে আছি অন্য কারো ঘুমের ভিতর। যে-ফুলে বেদনা থাকে, তার গাছের ভিতর কত শত নদী!
♣
শিমের আত্মার সঙ্গে মিশে আছে বরবটি। তাদের শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে রোদ। রোদ আসে নাকি কৃষকের বউয়ের জঙ্ঘা থেকে। যেখানে নিশীথে রোজ কয়েক সূর্যের বোঝাপড়া হয়।
বাইরে মিছিল। বাইরে গুলির শব্দ।
অথচ এখানে শিম আর লাউয়ের ডগা বাউরি বাতাসে চুমো খেয়ে যায়।
বাইরে স্তব্ধতা। নতুন স্লোগান।
পাগলের প্রচণ্ড প্রলাপ থেকে ঠিকরে বেরোয় আজ বেগুন ক্ষেতের আলো। সে-আলোয় দেখি, মানবজন্মের অন্ধকারে শসাফুল ফুটে থাকে…
হে মিথ্যে, হে মাননীয়, রাজপথে নেমে আসা শত শত নিমগাছ দ্যাখো। ছায়াপথে ছড়িয়ে পড়েছে সব রক্তাক্ত ডালপালা।
♣
তোমার নিঃশ্বাস ভরা ধনেপাতা-ঘ্রাণে।
তোমার আঙুল ঢেঁড়সের মতো মায়াবী সবুজ, অস্তিত্বের বিষাদের মতো, ধীরে ধীরে আমার নিকটে আসে। শুয়ে থাকে করতলে। চাঁদের উদ্ভিদ জানে কত চিত্রনাট্যে ভরা এই রাত। গন্ধে স্পর্শে কতটা মাতাল।
পৃথিবীর কিছুটা উপরে, ছাদে, আমাদের এই অনুরাগ, কীট-পতঙ্গের থিয়েটারে অভিনীত হতে থাকে রোজ। বাদাম গাছের নিচে কেউ রুয়ে গেছে আমার সমস্ত অভিমান। অতঃপর বাদামের খোসা খুলতেই, অকস্মাৎ উন্মোচিত হলো অসুখের ধূসর জগৎ।
পুদিনাপাতার এই চায়ের সংসারে, তুমি ছাড়া কেউ নেই আর!
ঝরে-পড়া নক্ষত্রের অবশেষ দিয়ে আমি তোমাকে বানাই। অথচ আশ্চর্য! হিলিয়াম লিথিয়াম নয়, তোমার নিঃশ্বাস ভরা থাকে প্রতিদিন ধনেপাতা-ঘ্রাণে!
♣
হৃদয়ে কংক্রিট নিয়ে হেলেঞ্চার দেশে নাকি ভ্রমণ নিষেধ।
অনেক সূর্যাস্ত হলে তবে, হৃদয়ে সবুজ সমাহিত হলে, আমাদের পর্যটন শুরু হয়। প্রায় অন্ধকারে, মায়াবী কলমিলতা, অতীতের মৃদু ব্যর্থতার মতো পায়ে বাজে। যত ইচ্ছে মেঠোপথ, যত ইচ্ছে নিঃশব্দ লাঙল, এগিয়ে চলেছে অস্তাচলে, সান্নিধ্যের তীরে।
আমি বিস্তারিত হতে থাকি নীল রাত্রির ভিতর।
বিস্তারিত হতে হতে, তুলসীপাতার গন্ধ থেকে আশ্চর্য বেগুনে, ঝিঙে ফুলে, আর পেয়ারার অনন্ত অম্বরে ভেসে ভেসে, মিশে যাই তোমার শরীরে।
রাত্রির বেগুন ক্ষেতে হংসের মৈথুন জেগে থাকে। যেন কারো জন্মপরিচয় বহুদিন পর জানা গেছে এই হেলেঞ্চার দেশে এসে।
♣
সারারাত চালকুমড়াকে বুকে নিয়ে ঘুমালাম। ঘুম ভেঙে দেখি বউ। কুমড়ার ফুলে ফুলে ঢাকা তার বুক। মটরশুঁটির মতো অর্ধ-নিমীলিত দুটি চোখ। আর মহাজাগতিক ধূলিকণা তার চুলে।
এ-রকম কুহেলিকা দেখে ভাবি, কী যেন ঘটেছে কাল রাতে!
কুমড়ার বিজন জানালা দিয়ে কারা তবে দেখেছিল চাঁদ? গোপনে ক্রন্দন করে করে স্তম্ভিত হয়েছে কারা? বিশ্বাসে ও বন্যতায় আপোসহীন যে রাত, মনে হয় তার সমস্ত বিহ্বল বাতাসের আনাগোনা ছিল এই ঘরে।
শুয়ে শুয়ে আদিম জানালা দিয়ে দেখি, শত শত বেগুন বাংলার লাঠিয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপেক্ষায় আছি, কখন যে বীরত্ব দেখাবে।
আজ অপেক্ষায় আছি, অনেক ওষ্ঠের ভেজা চুম্বন পেরিয়ে এই বিস্রস্ত নগরে, কখন কুমড়ো তার নগ্নতা দেখাবে।
♣
কোথায় চলেছ তুমি ডেঁয়ো পিঁপড়ের পিঠে চড়ে, এই চিতল মাছের জোছনায়? মাচা জুড়ে ভেসে আছে সমস্ত পিপাসা। তোমার তমাল বন্ধু আমি, ক্ষেত ছেড়ে কোথাও যেও না, পুঁইপাতা।
তোমার শরীর ভর্তি বিরূপ অক্ষর। চুপ থাকো, নচেৎ পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে।
পুদিনা পাতার মধ্য থেকে উঁকি দিলো ধূলিকণা। তার কাছ থেকে জানা গেল, মানচিত্রে কোনো দেশ নেই। দেশ থাকে মনে, আর বৃক্ষের গভীরে।
হে অজানা পাখির পালক, আচমকা এই পুঁইশাকে তুমি কোথা থেকে এলে! তোমার গন্তব্য কি জবাফুলের রক্তাক্ত প্রান্তরে?
♣
সাইট্রাস, সমস্ত বিপন্নতার মাঝেও, আমি আর কচি রোদ বসে আছি লেবুপাতা-ঘ্রাণের ভিতর। শান্তি দাও। শান্তি। তোমার প্রেমের নদী চুষে খাবো আমি। তুমি আছ বলে মাতৃদুগ্ধস্মৃতি বেঁচে আছে আজো।
আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাও, বলো। কোনো ফার্ন উদ্ভিদের বনে, যেখানে শব্দ ও ইশারার বোঝাপড়া হয় সঙ্গোপনে? যেখানে ভাষা ও ভাস্কর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক রোজেলা গাছের ছায়া।
বিরহ-কণ্টক ফোটে পায়ে। তবু হাঁটি। হেঁটে হেঁটে দেখি এক শসা ঘিরে আছে লাল পিঁপড়ের দল। তাদেরকে বলি, সামান্য শসায় চড়ে আর কতদূর যাবে! শান্তি চাই। শান্তি।
সাইট্রাস, দ্রুত হাঁটো, শীতের সবজি মুখে নিয়ে একটি গগনপাখি উড়ে চলে যায়!!
♣
শীত এসে দেখে গেল, আমি আর নেবুফুল ঘুমিয়ে রয়েছি। শীত এসে দেখে গেল, দরোজার বাইরে মৌমাছি আছে অপেক্ষায়।
বাতাস বইছে রাতে অজানা দিগন্ত হতে আজ। কোথাও তো শব্দ নেই। শূন্যতাও নেই। শীত এসে দেখে গেল মাঝরাতে বিছানার সব কারুকাজ।
কোথাও জায়গা নেই। চারা হাতে ঠায় তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ। যদি না জায়গা পাও, আমারই অন্তরে আজ রুয়ে দাও গাছ।
কে জানে কোথায় কাঁদে ফেলে-আসা হাওরের হিজলের ফুল। কুয়াশার প্রতারণা প্রতিদিন বেড়ে চলে। পৃথিবীর ছাদে ছাদে, আমি উষ্ণ পুঁইপাতা, তুমি তার উপরে ঝরে-পড়া শীতার্ত বকুল।
আজ শীত এসে দেখে গেল, নিঃসঙ্গ শামুক এক জেগে আছে দূর জানালায়।
শোনো পুঁইপাতা ।। জাকির জাফরান ।। অগস্ট ২০২৬ গানপার
জাকির জাফরান রচনারাশি
গানপার কবিতার, কবিতার গানপার
- শোনো পুঁইপাতা, জাকির জাফরান ও এক গার্ডেনারের গান - August 4, 2026
- শোনো পুঁইপাতা || জাকির জাফরান - August 4, 2026
- জন্মগানের কৃতজ্ঞতা || মনোজ দাস - August 1, 2026

COMMENTS