ননসেন্স রাইম ও ননসেন্স গফের বয়সে “যদি হইতাম”-মূলক একখানা টপিক থাকত। দুনিয়া দেখতে দেখতে বয়স বাড়লে যুক্ত হলো নতুন টপিক “কত বছর বাঁচতে চাও”। এর উত্তরে আমাদের সবার বেঞ্চমার্ক ছিল একশ। সবাই শত বছরের কাছাকাছি বা তারচে বেশি বাঁচতে চাইত। তাদের মধ্যে কয়েকজন এই ধরাধাম ছেড়েছে অনেক আগেই। বছর ঘুরলেই পঞ্চাশে পা। অর্ধশতাব্দী। আমাদের মধ্যে যারা এটা পার করতে পারবে তারা ‘সৌভাগ্যমান’ তো বটেই, কিন্তু যারা পার করতে পারলেন না তারাও সৌভাগ্যবান যদি ভাগের জীবনটুকু উদযাপন করতে পারেন। আধবুড়ো মানুষ হিসাবে বড়ই চিন্তিত এই ভেবে যে—জীবন মাপব কিসে। আদৌ দরকার আছে কি না তা ভিন্ন তর্ক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যদি “জীবন” মাপতেই হয়, তয় মাপব কিসে? বয়সে, বিত্তে নাকি উদযাপনে?
আমাদের সময়ে মানে বাল্যকালে জন্মদিনের উদযাপন এখনকার মতো এত ফরমাল ছিল না। সামান্য দোয়াদুরুদ বা কালীবাড়িতে ভোগ আর বাড়িতে বাড়তি ভালোমন্দ রান্না। প্রিভিলেইজডদের বাড়িতে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ভালোমন্দের সাথে ছাইপাঁশও অর্ডার হতো রেস্তোরাঁ থেকে। সাজসজ্জার এত বালাই তখন ছিল না। ডেকোরেটার্স ছিল কিন্তু ছোট কাজের শিল্পী ছিল না। তবু পাড়া-প্রতিবেশী মিলে কিরম করে জানি কিছু একটা ডেকোরেশন দাঁড়িয়ে যেত। কতবার সাজসজ্জার পরে দেখা গেল কোনো লেখাজোখা নাই, তখন আবার দৌড়ে রংতুলিতে গিয়ে সাদা আর্টপেপারে লিখিয়ে আনা হতো। কিছুটা প্রিভিলেইজড হবার কারণে এ-সমস্ত উদযাপনের সাক্ষি থেকেছি, কখনো উপলক্ষ হয়েছি। যদিও উদযাপনটা জরুরি, এ-বোধ কখনোই আসেনি। আমার কাছে জন্মদিনের আগের দিন যেমন জন্মদিনের পরের দিন তেমন। সব দিনই উদযাপনের।
এবার ফিরি আগের জায়গায়। “জীবন” মাপব কিসে। আমি মাপি উদযাপনে। প্রতিদিনের জীবন যাপনের উদযাপনে। প্রতিটি বৃষ্টির সকাল, কুয়াশার রাত, হঠাৎ বৃষ্টির পরে হঠাৎ রামধনু, কালবৈশাখের তড়ক, কাশবনের দোলা, মনুর বালুচর, সুরমার সিঁড়ি, হাকালুকির আফাল, চাবাগানের টিলা, একপায়ে বক, শত পাখির একদিকে ছোটা—সবই উদযাপনের। উদযাপন করেছি নানা বর্ণের খাবারগুলো, নানা রঙের সম্পর্কগুলো।
প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের উদযাপন আর মানুষের সম্পর্কের উদযাপন ভিন্ন। ভালোবাসা, ঘৃণা, অবহেলা, চমক, স্নেহ, উদারতা, আঘাত, বেদনা নামক মানসিক স্থিতি মানুষ ছাড়া কেউ দিতে পারবে না। তাদের দেয়া অভিজ্ঞতা আপনাকে গড়ে দেয়। উদযাপিত সম্পর্কগুলোই হয়তো সম্পদ হবে শেষকালে।
হাফ-সেঞ্চুরি মার্কে দাঁড়িয়ে কৃতজ্ঞতা জানাই আমার জননী ও জনককে, তাদের ছাড়া পৃথিবী নামক অদ্ভুত সুন্দর গ্রহ দেখা অসম্ভব ছিল। আরো কৃতজ্ঞতা জানাই পিঠাপিঠি সহোদর, কাজিন, সহপাঠী, রক্তের আত্মীয়, সম্পর্কের আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, স্বল্পপরিচিত, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক সহকর্মী, নিন্দুক, শত্রু সহ সকলকে যারা আমার জীবনে কোনো-না-কোনো অভিজ্ঞতা যুক্ত করেছেন। সবশেষে কৃতজ্ঞতা জানাই আমার বিউটিফুল কন্যা ও কন্যার মাকে, যাদের জন্য আমার প্রতিদিন জন্মদিন।
২৯ জুলাই ২০২৬
মনোজ দাস রচনারাশি
গানপারে জন্মদিন সংক্রান্ত গদ্য
- ‘মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান’ প্রসঙ্গে || বদরুল হায়দার - August 20, 2026
- পৃথিবী আমার নিজেরই ছায়া || রোদ্দুর রিফাত - August 20, 2026
- ম্যাডোনায় মৃত্যুচিন্তা - August 11, 2026

COMMENTS