
১১.
সারাদিন শ্রাবণ মেঘের দিন। সারাদিন বাদলা রঙিন। জানি না এই বিদেশবাড়ির কেউ রবীন্দ্রনাথ শোনে কি না, শুনলে বলা যেত—
আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে / জানি নে, জানি নে / কিছুতে কেন যে মন লাগে না…
কিংবা এই বিদেশবাড়ির কেউ কবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ পড়ে কি না—
স্বপন-মিলনে যদি কভু প্রিয়ে তোমারে হৃদয়ে ধরিতে যায়, / শূন্য আকাশে প্রসারিয়া বাহু বৃথাই কেবল দুঃখ পাই! / হেরি অভাগার গভীর যাতনা দেবতারও আঁখি সজল হয়, / তরু কিশলয়ে অশ্রু মুকুতা ঝরি ঝরি পড়ে বেদনাময়…
ভিজে আছে পথঘাট। ভিজছে গাড়ির বহর। ট্রাফিক সিগনাল। দূরের আগুনরঙা বন। আমি সজল চোখে তাকিয়ে আছি। সারাদিন নিঝুম জল, অবিরল। ফোরকাস্টে ছিল বিকেলে জল যাবে থেমে। হায়! কীসের কী! জল থামবে কী! জল যেন আরও নামে ঝেঁপে!
রোববার এদের আরামের দিন। আয়েশের দিন। তাই রাস্তাঘাটে নাই লোকজন। কাকপক্ষী নাই বলা গেল না। এই দেশে আজ অব্দি কোনো কাক চক্ষে পড়ে নাই! যেদিকে তাকাই দেখি—কাঠবিড়ালির পুটুশপাটুশ তাকানো। আর ফুরুত। একেকটার দশাসই শরীরগতর। মনে হয় এদের বাগানে বাগানে ঝুলে আছে পেয়ারা। নাকি বাদাম? তবে এখন আপেলের ভরা মরসুম। তাজাকিস্তানের নারীদের গালের রঙ চুরি করে গাছে গাছে ঝুলছে পক্ব আপেল। স্বাদও দুর্দান্ত! কচকচে ডাঁশা!
আপেল দেখলেই আমার কিনা আদম আর হাওয়ার কথা মনে পড়ে। এ জগৎ আপেলময়। সুন্দরী আপেলের শক্তি মধ্যাকর্ষণশক্তিকেও হার মানায়। আরেহ! এ দেখি বিষম ব্যাপার! স্বর্গ হইতেও বিদায় হইতে হয় এই লাবণ্যময়ী আপেলের কল্যাণে! আপেলের কিংবদন্তির সাথে জড়িয়ে আছে কতই-না কিসসা।
গ্রিকরা বিয়ের প্রস্তাব দেয় আপেল দিয়ে। আপেল হলো ভালোবাসার প্রতীক। একটি আপেলকে মাঝখানে কাটলে হৃদয়ের মতো দুটি খণ্ড হয়। তার মানে একটি আপেলে দুটি হৃদয় মিশে আছে। প্রেমের জন্য এর চেয়ে ভালো প্রতীক আর হয় না। কোনো মেয়েকে পছন্দ হলে গ্রিকরা তার দিকে ছুঁড়ে দেয় একটি আপেল। মেয়েটি যদি আপেলটি ধরে মিষ্টি হাসি দেয়, তার মানে মেয়েটি রাজি। আর যদি না-ধরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে?
বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস! এত বৃক্ষ দুনিয়াজোড়া, সব থাকিতে আপেলবৃক্ষের পতিত আপেল থেকে আবিষ্কার হয় অপসারিত তরলের ওজন প্রতিস্থাপিত বস্তুর সমান!
আর্কিমিডিস পাশ কাটিয়ে আমার কিনা ঝটিতি স্নোহোয়াইটের কথা মনে পড়ে যায়। বিমাতা বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল এক সুন্দরী আপেলের গতরে। আহা! লোভে পড়ে সেই টসটসে আপেল খেয়ে স্নোহোয়াইট ঘুমায় কিনা দিবারাত্রি। চিন্তাভাবনাহীন! অশান্তিবিহীন!
এই বিদেশবাড়িতে এখন চলে আপেলের ঋতুকাল। কী আর করা? আমিও তাই আপেল খেয়ে চলি হরদম, কিন্তু আধোঘুম বা আধোজাগরণে্র মাঝেও কোনো মাজেজা ঘটে না। যদি ঘটত? অনন্তকাল আমি আধো ঘুমের মাঝে, আধেক স্বপনের মাঝে স্নোহোয়াইটের মতো অনন্ত যৌবনের আস্বাদ নিয়ে শুয়ে থাকতাম! আর আমার সেই মরার-ঘুম ভাঙিয়ে দিত কোনো-এক মানবিক রাজকুমার!
সারাদিন জল অবিরল! সারাদিন অঝোর শ্রাবণ। আমার মেঘের বুকে জল, তোর তেমন আকাশ কই? ইচ্ছে করে আরেক জীবন মুষলধারা হই…
এত জল তবুও কিনা বাতাসে উষ্ণতা প্রকট। জানলা-দিয়ে-আসা জলের ছিটায় হাত ভিজিয়ে নিয়ে পরখ করি কতটা সে শীতল নাকি উষ্ণ?
এখানে সন্ধ্যারা বড় দীর্ঘ। প্রলম্বিত। হয়তো রাত্রির খোঁজ করতে করতে ওরা হারিয়ে ফেলে চেনাপথ!
সন্ধে যেখানে রাত্রির সন্ধানে / পথিক হয়েছে কালপুরুষের টানে / সেইখানে হবে দেখা / তোমার সঙ্গে একা…
হুম, সত্যসত্যই একাই দেখা হয়েছিল তোমার সঙ্গে আমার । আমি নিশ্চিত জানতাম দেখা হবে। হতেই হবে। না হলে এ জগতসংসার মিছে।
কিছুই মিছে হয় নাই, শুধু তুমিই আচানক মিছে হয়ে উঠলে। যে-সম্পর্কের মর্যাদা দিতে জানে না, তার সবই মিছে হওয়াই উত্তম বিবেচনা করি।
কিন্তু আজও কী কাঁদে কাননে কুহেলিয়া?
আকাশ যেখানে সজল মেঘের খামে / বর্ষার চিঠি পাঠায় তোমার নামে / সেইখানে হবে দেখা / তোমার সঙ্গে একা / ওই বৃষ্টি যেখানে তোমার চোখের জলে / অন্য কারোর দুঃখের কথা বলে / সেইখানে হবে দেখা / তোমার সঙ্গে একা…
আর হবে না হে প্রিয়, এ জীবনে আর হবে না দেখা এবং একা তো নয়ই। আর হবে না থাকিতে এ জীবন…!
এখন রাত ঘন ও গহন। ঘুমিয়ে পড়েছে পাড়া। ঘুমিয়েছে জলে ভেজা রাস্তা। এমনকি ল্যাম্পপোস্টগুলিও ঘুমন্ত। কারণ বৃষ্টির জল ক্রমশ ঘোলা করে তুলেছে আলো। সেই জলের সাথে যুক্ত হয়েছে দামাল হাওয়া। ফলে সৃষ্টি হয়ছে আলোর ঘূর্ণি।
কিন্তু আমি জানি, প্রদীপ নিভিয়া আসিতেছে। ঝরিয়া পড়িবার বেশিদিন বুঝি নাই আর বাকি!
আরো কতদিন বাকি / তোমারে পাওয়ার আগে বুঝি হায়! নিভে যায় মোর আঁখি।। / কত আঁখি-তারা নিভিয়া গিয়াছে কাঁদিয়া তোমার লাগি…
১৯ অক্টোবর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১১ || পাপড়ি রহমান - August 1, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১১ || পাপড়ি রহমান - July 27, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১০ || পাপড়ি রহমান - June 25, 2026

COMMENTS