আজ ৩১ জুলাই। কিছুক্ষণ হলো জালাল খাঁর মাজার থেকে ফিরেছি। আজ সাধকের চুয়ান্নতম প্রয়াণদিবস। শ্রাবণের বৃষ্টিবাদলেও নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া গৌরীপুর সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যরা এসেছেন। যারা এসেছেন তাদের মধ্যে একমাত্র কটিয়াদীর হাশেমই তাঁর সরাসরি শিষ্য। বাকিরা পিতার গুরুকে কিংবা গুরুর গুরুকে উত্তরাধিকার হিসেবে ধারণ করেন। ফকিরি জ্ঞানে জালাল খাঁ এক মহাসিন্ধু রেখে গেছেন। আত্মজ্ঞানের, স্রষ্টা ও সৃষ্টির রহস্যের সেই মহাসিন্ধুতে এই সহজিয়া শ্রমজীবী মানুষেরা বিচরণ করেন। এই জ্ঞানকে তারা ধারণ করেন। তারা মনে করেন জালাল খাঁকে না-বুঝলে সুফিবাদকে, মারাফতকে বোঝা যাবে না।
বাংলার লোকায়ত জ্ঞানের সাধনজিজ্ঞাসায় সুফি, মরম, দেহবাদ ও ফকিরি ভাবুকতায় বাউল সাধক কবি জালাল উদ্দীন খাঁ এক অনন্য তত্ত্বজ্ঞান ও সুর রেখে গেছেন। ১৮৯৪ সালে নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানায় জন্মগ্রহণ করে ১৯৭২ সালে এই দিনে এই জুলাই মাসের ৩১ তারিখেই তিনি প্রয়াত হন।
বাংলা গানে ও কবিতায় তিনি মাটি ও মানুষের মূল সুরকে, মানুষের বর্তমান ও পারলৌকিক জিজ্ঞাসাকে, অধ্যাত্মচিন্তার রূপ-অরূপ অন্বেষাকে, অধরাকে ধরার আর্তি ও সাধনাকে দার্শনিক সুর ও জিজ্ঞাসায় বয়ান করেছেন। আকার ও নিরাকারের, রূপ-অরূপের জিজ্ঞাসাই জালালের মর্মকথা। পূর্ব-ময়মনসিংহের হাওরমৃত্তিকার জ্ঞান ও গৌরবকে তিনি অনন্য ভাষা ও সুরে বিশ্বমনীষায় রেখে গেছেন।

বাংলার ভাব ও ভাবুকতায় জালাল খাঁ একটা স্বাতন্ত্রিক বিদ্যালয়। আত্মসন্ধান ও জীবনজিজ্ঞাসাই তাঁর সুরের জগৎ। হাওরের তাজা পানির কলকল ধ্বনির এই জিজ্ঞাসা সুরের ভেতর দিয়ে মর্মে প্রবেশ করে। এই জিজ্ঞাসাই এই অঞ্চলের বাউল সাধক কবিদের যাপিত দর্শন। সুরমা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র এই তিন নদীর বিচিত্র ভূমি অর্থাৎ নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নরসিংদীর তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ঘিরেই বাংলার লোকায়ত জ্ঞান ও ভাবুকতার এক স্বাতন্ত্রিক জগৎ উন্মোচিত হয়েছে। বাংলা গীতিকাব্য কিংবা সাধক মরমী কবি ও কবিতার বিস্তারে জালাল খাঁর স্কুলিং ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
তাঁর জীবদ্দশায় চারখণ্ডের ‘জালাল-গীতিকা’ গ্রন্থে ৬৩০টি গান প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ‘জালাল-গীতিকা’ পঞ্চম খণ্ড। সেই খণ্ডে গানের সংখ্যা ৭২টি। এই নিয়ে মোট ৭০২টি গান নিয়ে যতীন সরকারের সম্পাদনায় ২০০৫ সালে ‘জালাল গীতিকা সমগ্র’ প্রকাশিত হয়। এছাড়াও ‘বিশ্বরহস্য’ নামে একটি গ্রন্থ রয়েছে। তিনি তাঁর সাধনরত্নকে মোট ১৩টি তত্ত্বে ভাগ করে আমাদের সামনে হাজির করেছেন। যেমন : আত্মতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, নিগূঢতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, সংসারতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, লোকতত্ত্ব, মাতৃতত্ব, দেশতত্ত্ব, বিরহতত্ত্ব।

তিনি মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজের মরমী দার্শনিক। পূর্ব-ময়মনসিংহের লোকায়ত ধর্মসাধনা, মাটির পরম্পরাগত যাপন ও ঐতিহ্য, চিশতিয়া সুফি সিলসিলার সহজিয়া ধারণাকে তিনি সুর ও পঙক্তিতে উচ্চপর্যায়ে রেখে গেছেন।
পূর্ব-ময়মনসিংহের লোকায়ত ধর্ম সাধনা ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে, চিশতিয়া সুফি সিলসিলা ও লোকসংগীতের ইতিহাসে জালাল উদ্দীন খাঁ একটি অবিস্মরণীয় নাম। বাউল গানের সুর ও তত্ত্বজিজ্ঞাসায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গণমানুষের চৈতন্য ও যাপনে বেঁচে আছে তার সুর ও গান। এই সাধারণ মানুষেরাই বলে জালালীয় সুর ও জ্ঞান কোনোদিন ম্লান হবে না। জীবনজিজ্ঞাসায় এই সুর পথ খুলে দেবে। বাউল গানের আসরে, জিকিরে, হালকার সমাবেশে, গ্রামের হাট-বাজারে, সুফি খানকায় ও দরগাতে এই গানের চর্চা অব্যাহত থাকবে। গানের মায়াবী ধ্বনিতে মানুষ খুঁজে পাবে নিজের অস্তিত্ব।
আমি দেখেছি বাউলেরা, বাউলজ্ঞানের অনুসারীরা নিভৃতে এই জ্ঞানকে ধারণ করেন। চর্চা করেন। শত বাধা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও গুপ্ত সাধনায়, খাতায় খাতায় এই জ্ঞানকে রক্ষা করেন। প্রচার করেন শিষ্য-সাগরেদি পরম্পরায়। আজকেও জালাল উদ্দীন খাঁর রওজামোবারকের সামনে শিষ্য-সাগরেদরা

মঞ্চ তৈরি করছেন। শিল্পীরা, যন্ত্রীরা ইতোমধ্যে এসে পৌঁছেছেন। এ-রকম আয়োজনে জালাল উদ্দীন খাঁর সরাসরি শিষ্য সুনীল কর্মকার প্রতিবছর হাজির থাকতেন। সারারাত গান হবে কিন্তু সুনীল থাকবেন না। আহা রে জীবন! এখন জালালতত্ত্বকে কে আর আর প্রচার করবেন?
এই গান তো আত্মজিজ্ঞাসার গান। আশেকের সাথে মাশুকের মিলনের গান, প্রেমের গান। এখন এই নিগূঢ়তত্ত্বকে এই প্রজন্মের মাঝে কে প্রচার করবে? কেউ-না-কেউ তো আসবেনই। সেই মহাজনের ধ্যানী বংশীবাদক আসুক।
গানপারে জালাল উদ্দীন খাঁ
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
- জালাল উদ্দীন খাঁ : আশেকের রওজায় || সরোজ মোস্তফা - August 1, 2026
- শূন্যতার ওজনের নিচে || রোদ্দুর রিফাত - July 29, 2026
- অ্যাআই বিজ্ঞান || সাইফুল ইসলাম - July 10, 2026

COMMENTS