অবিরত তোমাকে লেখা

অবিরত তোমাকে লেখা

শেয়ার করুন:

তোমার কথাগুলো তোমার মতো করেই লিখিয়া রাখতে চাই। লিখে যেতে চাই তোমাকে একটুও অদলবদল না-ঘটায়ে, হেরফের না-করে তোমার, একটুও সংস্কার সংশোধন না-করে তোমার তুমিত্ব। মন্দে ভালোয় মিলায়ে সকলি শ্রীরবীন্দ্রনাথের মতো। তুমি ঠিক যেমন করে কথা বলো, তোমার মুদ্রা ও মধুরতা, তোমার ত্রুটি ও তাৎপর্য সব আমি লিখে লিখে একটা আবয়বিক রূপ দিয়ে যেতে চাই। কিন্তু বস্তুত সম্ভবিবে এহেন রচন রূপায়ন? প্রকৃত প্রস্তাবে এহেন রচনাকাণ্ড সম্ভব? তুমিময় লেখা কী পৃথ্বীধামে কেউ লিখে যেতে পেরেছে কস্মিনকালেও? রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন? অথবা গ্যোয়েটে? কেউ বৌঠানকে লিখতে লেগে লিখে গিয়েছেন জীবনভর বসন্তপ্রণাম, লিখেছেন কেবল ছুটিরই নিমন্ত্রণ, রচিয়া গিয়াছেন জাগতিক আনন্দযজ্ঞের গান। অন্যদিকে আরেকজন বিয়াত্রিচে-চেহারা আঁকতে যেয়ে কেবলই কী বিয়াত্রিচেই লিখিলেন-আঁকিলেন? নৌপ, না! আপনিই তো, আপনারই প্রেমমুখ তো, তোমারই তো মুখ সমস্ত! তুমি ও আপনি, দুইয়ের মধ্যকার ডিকোটোমি ও ইল্যুশন লক্ষণীয়। বৌঠান ও বিয়াত্রিচে তো তুমি হয়া যায় লহমায়! এ কী তাজ্জুবি কীর্তি!

ওইদিকে দেখো পঙক্তিমিছিলে এসেছেন কত কত তুমিপ্রিয়তমারা! কারা যেন তারা? কাইটলিন, ফ্যানি ব্রন, লু সালোমা, জান দ্যুভাল, ইসাডোরা ডানকান, এলসা ত্রেয়োলা, মাটিল্ডা…গায়ত্রী…দি হুইল…চক্র…সুরাইয়া…আমাদের সুরাইয়া খানম! কত কত তুমিতীর্থ! কত-না তোমার মুখ ও মুখরতা! আর তারা কী তুমি? কিংবা তুমি বুঝি তারা? আসলে তো তুমিই ত্রিভুবন, তুমিই সারে-জাহাঁ, তুমিই জিন্দেগানি, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, তুমিই তো দুনিয়া—যারা বলে, তারা ভালো পরিমাণের ভাববাদী হলেও একেবারে ভুলও তো বলে না। কারণ তোমাকে লিখতে গেলেই ফিক করে হেসে ওঠে হাভাতে স্বপ্নেরা, হাতছানি দিয়া ডাকে তেপান্তরের রূপকথা, গাহে গান গনগনে দুপুরের চিল, খর চোখে তাকিয়ে থাকে একলা পাঁচিল। তোমাকে লিখতে গেলেই তৃতীয়োর্ধ্ব মুলুকের ভেংচি ও বুজরুকিগুলো সটান দাঁড়ায় এসে লেখার সামনে। তোমার ধ্যানে মগ্ন হলেই বিপুল-তরঙ্গা তাথৈবিশ্ব সম্মুখে এসে যায়। যেন তুমি তোমার সেপাই-সান্ত্রী সাঙ্গপাঙ্গ-সখাসখি সঙ্গে নিয়া দাঁড়াও আসিয়া আমার লিখনদুয়ারে। এবং তোমাকে লেখার ফরমায়েশ করে খেলতে লাগো তুমি মিউজিক্যাল-চেয়ার ঘুরে ঘুরে তোমার ইয়ারবন্ধুদের সনে। জেরবার দশায় ফেলে দেখতে চাও হিম্মৎ আমার।

সবই কিন্তু বুঝি, ঠিক সব বুঝতে পারি আমি। দৃশ্যত তুমি, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এ ভবরঙ্গ। বুঝি। কিন্তু ভুলি নাই তো, যে, তোমাকে লেখার পণ করে আমি লিখতে লেগেছি তিনভুবনের স্তোত্রতন্ত্রমন্ত্র। যদি না-পারি, ইস্তফা দেবো মরণের আগে। মৃত্যু তক সহিসালামতে লিখিয়া যাব তোমার কথা, তোমার গান, তোমার বাদ্য, টোল-পড়া গাল, তোমার হাস্য, ভ্রুকুটি ও ক্রোধ, তোমার বকবকানি। লিখে যেতে চাই তোমাকে, যেমন করে কাঠখোট্টা দার্শনিক লেখেন ক্রিটিক অফ পিওর রিজন, যেমন করে ঘোরগ্রস্ত কবি লেখেন টোয়েন্টি ল্যভ পোয়েমস অ্যান্ড অ্যা স্যং অফ ডিস্পেয়ার। তা তুমি যে-ই হও, ভূতিনী প্রেতিনী শ্যাওড়াগাছের কিংবা সাত-আশমানের পরী…

লিখব। জরুর লিখব। টুনাইট আই ক্যান রাইট…দ্য নাইট ইজ স্টারি অ্যান্ড দ্য স্টার্স আর ব্লু…যদি তিনমুহূর্ত বাঁচি, লিখব। যদি এক মুহূর্ত মাত্র, ধরব দুইলাইনেই বিপুলায়ত তব সংসার। অথবা, না পারি কিছু আর, আঙুলের ইশারায় হাওয়ায় লিখি নিতান্ত ওয়ানলাইনার।

জাহেদ আহমদ ২০১৪


দ্য আর্ট অফ রাইটিং
জাহেদ আহমদ রচনারাশি

জাহেদ আহমদ
শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you