জ্বরের ঘোরে পেত্নী+ভূত

জ্বরের ঘোরে পেত্নী+ভূত

শেয়ার করুন:

ভূত বসেছে শিয়রে
পেত্নীর লজ্জা করে
খাঁচার পাখি কী করে—
গালি দ্যায় চার অক্ষরে

এমন হয়। বিশেষত জ্বরজারিতে তো হয়ই। বিভ্রম, হ্যালুসিন্যাশন, তন্দ্রা আর জাগরণের ট্র্যানজিশন। খিড়কি খোলা। হাটখোলা উইন্ডো—সো-দ্যাট হাওয়া আসে, সো-দ্যাট সাফোক্যাশনজনিত সাফারিংস কম হয়। কিন্তু হয় ঠিক উল্টো। উড়ে আসে বেশিমাত্রা বাইপ্রোডাক্ট, বৃষ্টিছাঁট, আর তাতে বেজায় সাইড-ইফেক্ট। মনোরম ঝিঁঝিপোকা আর কলাথোড়ের কীটের কণ্ঠস্বর যুক্ত হয়ে রাইতের তামাম গতরে রাহমানীয় রোশনাই সূচিত হয়। দিলের ভিতর চৈন হয় না হারাম। শরীরের ভিটায় চিরাগ জ্বলে বেশুমার। আসে শক্তির শ্মশানস্বর, অন্ধকারের আয়-আয় আহ্বান, মান্নান সৈয়দীয় জ্যোৎস্নার জল্লাদও অর্ধতন্দ্রায় জিভ ভেংচায় এসে। এবং উড়ে এসে জুড়ে বসে এক উৎকণ্ঠ প্রেতিনী। নিশিদিন ভরসা-খোয়ানো বকাবাদ্যি তার। কাহানি নিষ্করুণ মূর্ছা-যাওয়ার। গল্পটা গানের, গল্পটা গানশোনার, গল্প মূর্ছনার।

+
গা পুড়ে যায় কী জ্বরে
হাওয়া দ্যায় হা হা হা
গা মুড়ে যায় পিঞ্জরে
হাওয়া দ্যায় হা হা হা

আর শবেবরাতের ঘ্রাণ ভাসে বাতাসে। ধুপকাঠি আর বাজি পোড়ানোর প্রতিভাস। অতিকায় আগরবাগান আছে বুঝি নিকটে কোথাও। পরিচিত পরিবেশের সমাজভূগোল বদলে গেছে বলে মনে হয়। চিরকালের জানালাগাছটা, বাঞ্জা পেঁপেতরুটা, চালতাছাপানো পুকুরপাড় সব্বাই মিলে ম্যাজিক দেখায়। খেইল জমায় ভানুমতির। সার্কাসতাঁবুর আধিকারিক এসে একবার দেখা দিয়ে ফের ঢুকে যায় শিরিষের কাণ্ড ঘেঁষে সংলগ্ন জংলায়।

+
চাঁদ উঠেছে শহরে
জোছনায় পালক ঝরে
চাঁদ উঠেছে শহরে
ঝানু চোর লুকিয়ে পড়ে

যেন সবার আকৃতি ঝরে একাকার একাকৃতি হয়ে যাবে এহেন জ্যোছনা আজও হয়। সে-কী নিছক শক্তিপদ্যের প্রভাব? কে জানে, কে এমন জ্বরে বেঘোরে ঝরে ঝরে পড়ে আজ আর হেমন্তপাতার ন্যায় সেই অপরাহ্নলীন অরণ্যের ভিতর? কে আর অমন অনুপম ভোলানাথ ব্যোমশঙ্কর? কে বেশি মাতাল—সরোজিনী, জিরাফ, না শক্তি স্বয়ং? কবীর জানেন? ঘুমন্ত সেই বাউণ্ডুলেটার মুখ মনে পড়ে, জ্বর এলে, কেন যে! ঘুমিয়েছ, রূপক? অন্ধকারের স্তনের ভিতর…গভীর সারাৎসারের মতন…যেন আত্মশমিত শামশের আনোয়ার…

+
ভূত বসেছে শিয়রে
হাওয়া দ্যায় বন্ধ ঘরে
খাঁচার পাখি কী করে—
ছোলা খায় নামতা পড়ে

‘যেন এখন চোখের নিচে কালরাত / কার নখের আঁচড় ভিতরে’;—জনান্তিকে বেজে যায় সঞ্জীবের জ্বরগ্রস্ত ঘোর নৈশগান। মরখুটে ঘোড়াটা—হামিদের না মহীনের—ঘাস খায় হেন জ্বরজ্যোছনায়। কিংবা গাধা, চন্দ্রিল বা অনিন্দ্য বা উপলের, চন্দ্রবিন্দুর। সকালে উঠে দেখা যাবে সেই মুমূর্ষু গাধা, ‘চোখদুটো ঢুলুঢুলু তার ঠোঁটদুটো শাদা’;—গাধাটা জলতেষ্টাক্লান্ত, মহীনের বা হামিদের ঘোড়াটা আস্তাবলে ফিরবে বলে বেহদ্দ ছুটে বেড়াতেছে হেমন্তপ্রান্তরের এ-প্রান্ত ও-প্রান্ত। ঘোড়াটার গান চাই, গাধাটার চাঁদ। জ্বরজ্যোছনায় নিরাকৃতির নৈশ প্ররোচনা দানিয়াছে মোরে এহেন অতীব পরিচিত পরমাদ। শক্তিপ্রায়, জীবনোপজাত, ব্যবহৃত আর ক্লিশে।

+
শিকড়েবাকড়ে ধন্দ
মাতাল ফুলের গন্ধ
অন্ধকারের ছন্দ
ডানার ভিতরে

অমুক প্লাস তমুক। জোড়া জোড়া উজবুক। ওরা আরও কোনো দূর গ্রহের। যেন অ্যালিয়েন। সত্যি সত্যি গ্রহান্তরের গান। নিয়োলিথিক সুর। ধূসর কোনো সমুদ্রসভ্যতার ইতিহাস সেসব। অলিখিত। দ্রোণকলসি আর মরিচজবার মধু ছিল তাদের সুষম খাদ্যাভ্যাসের সাধারণ উপাদান। টকস্বাদ উদ্ভিদের গুটিফল। অপরিপক্ক পেয়ারা আর আমড়ামুকুল ইত্যাদি। শিহরিত হবার অপার অগাধ শৌর্য ও সামর্থ্য ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য তাদের। যুক্ত হতে চাইত জনে জনে, যোগচিহ্নে ছিল তারা ব্যঞ্জিত তুমুল, ডেস্কে-বেঞ্চে খাতার পাতায় মাথার ভিতর যোগের ছড়াছড়ি। চিহ্নটি ছিল দরদালানের চুনকামশোভিত দেয়ালে, ব্যাগের স্ট্র্যাপে, জ্যামিতিডিব্বার সিক্রেট ট্রাঙ্কে। এখন আর নাই সেই যোগচিহ্নের অজস্রতা। হাইফেনের যুগ এখন। অথবা তা-ও নয়, হাইফেনও নয়, স্রেফ স্পেস। যোগচিহ্ন উধাও। যোগমায়ার ন্যায় সেকেলে সে, মায়াদীপ্য, শেষের কবিতার সেই লাবণ্যজনয়িত্রী যোগমায়া।

+
কিছু ছুটবে কিছু ফুটবে কিছু চিত্র ঝলসে উঠবে অথই সাগরে

এসবের একটা মানে তো থাকবে, না কী! কিন্তু দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে-থাকা পাড়ায় তুমি তো রাতের কড়া নাড়া পাও শুনতে ঠিকই, পাও না? বাড়ি থাকুক বা আনবাড়ি যাক, অবনীর জন্য তুমি তো ফুটপাত থেকে ফুটপাতে কোম্বিং সার্চ চালায়া যাও অবকাশ মুফতে পেয়ে গেলে; তাহলে এত অর্থবোধিনীর হাঁকডাক কেন! অনিন্দ্য, চন্দ্রিল আর উপলের ব্যান্ডে একজোড়া গান আছে চন্দ্রবিন্দুর ‘ত্বকের যত্ন নিন’ অ্যালবামে, ‘ভূত’ ও ‘ফের ভূত’ শীর্ষক দুই পিঠোপিঠি সখাসম্ভবা গান, এপিগ্রাফগুলো ওই দুইটা গানের লাইন দিয়া সাজানো। জ্বরজারিতে এমন হয়। এমন তো হতেই পারে। দেয়াল ও গলির মোড়, স্ট্রিটআইল্যান্ড ও ল্যাম্পোস্ট, জ্বরের ঘোরে অতিজীবিতের জগৎ টলমলায়।

দ্রষ্টব্য : চন্দ্রবিন্দু অ্যালবামসমূহ

জাহেদ আহমদ ২০১৫


গানপারে চন্দ্রবিন্দু 

জাহেদ আহমদ
শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you