বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আত্মজীবনী || সরোজ মোস্তফা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আত্মজীবনী || সরোজ মোস্তফা

শেয়ার করুন:

মানুষ, নদী, ভূগোল, প্রকৃতি, সরলতা—সবকিছু মিলিয়ে সুনামগঞ্জকে আমি খুব ভালোবাসি। সুরমার বাতাসে এখানকার সবাই শান্ত ও সহজিয়া। সহজিয়া মানুষই জ্ঞানে, গানে, সুরে জগতকে প্রশ্ন করতে পারে। সহজিয়া মানুষই আকাঙ্ক্ষার চেয়ারে না-বসে আত্মার পরিচর্যায় এখানে-সেখানে বিচরণ করে। প্রশ্ন করার চেয়ে ইম্পর্টেন্ট উপলব্ধি জগতে আর নেই। হাসন রাজার শহরে, শাহ আবদুল করিমের মাটিতে, দুর্বিন শাহের আধ্যাত্মিক অনুভবে, কামাল পাশার অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, রাধারমণের প্রেম ও বিচ্ছেদে সুনামগঞ্জের মাটিতে কী যেন আছে—যা মানুষের অন্তরকে জীবন্ত করে, স্পর্শ করে; মানুষের অন্তরকে পুনরায় জাগতিক করে।

সেই মায়া ও মরমি জ্ঞানের সুনামগঞ্জে আমি প্রায় দু-বছর ছিলাম। সেখানে চাকরির শুরুতেই প্রফেসর মুহাম্মদ শাহ্ আলমগীরের সাথে মেশার সুযোগ পেয়েছি—এটা অবশ্যই আমার সৌভাগ্য। তিনি একজন খাঁটি, নিখুঁত, রসিক সাহিত্যের শিক্ষক। সততা, আত্ম-আদর্শবাদমগ্ন একজন পরিপূর্ণ দায়িত্ববান মানুষ। স্পষ্ট উচ্চারণ আর শান্ত স্বরে কথা বলেন। পৃথিবীর অন্যতম শান্তি আর শান্তির বিদ্যাপীঠ সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে অতিরিক্ত চালাক আর কুটিল সহকর্মীর ভিড়ে আমি একজন তাজা মানুষ পেয়েছিলাম। তাঁর সান্নিধ্য আমাকে শিখিয়েছিল সহজতা কি। নিজের দৃষ্টি ও দায়িত্বের প্রতি কীভাবে অবিচল থাকতে হয়। আমি বরাবরই মানুষের ভালো গুণগুলোকে প্রচার করি, খারাপিপনা আর বিকৃতভাষ্য,  পরচর্চার কুটিল সূচি ও সংস্পর্শ এড়িয়ে চলি। আলমগীরস্যারের মধ্যেও এই অনন্য সৌন্দর্য বিদ্যমান দেখে তাঁর অন্তরের কাছাকাছি বসতে চেয়েছি।  একুশ বছর অতিক্রম করে আজও তাই স্পষ্ট করে বলতে পারি উনার মতো বিদ্বান আর আন্তরিক শিক্ষক সুনামগঞ্জ কলেজের বাংলা বিভাগ হয়তো কমই পেয়েছে।

তিনি দু-বেলা ইনসুলিন নেন, লম্বা সময় ধরে হাঁটেন, উচ্ছ্বাস নামিয়ে হাসেন—সেই হাসিতে থাকে দোলনচাঁপার অপূর্বতা। তিনি নাটক লেখেন। রেডিও-টেলিভিশনে সেই নাটক প্রচার হয়। সুরমার একান্ত নির্জন সারলিক দিনগুলোতে আলমগীরস্যারই হয়ে ওঠেন আমার প্রিয়তর, অন্তরতম অনুপ্রেরণা, মানবিক ও শ্রীমণ্ডিত সান্নিধ্যে একান্ত আশ্রম।

কয়েকদিন আগে ডাকে পেয়েছি মুহাম্মদ শাহ্ আলমগীরের আত্মজীবনী ‘আমার পনিকাল’। আত্মজীবনী না-বলে বইটাকে লেখকের কর্মজীবনী বলাই ভালো। তবে কর্মজীবনও তো মানুষের আত্মজীবনই। একজন মানুষ যখন আত্মজীবনী লেখেন তখন তার সময়টাকে লেখেন, তার চারপাশটাকে লেখেন, বিচরণরত সহচরগণকে লেখেন। হাওরাঞ্চল থেকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক হয়ে তিনি বদলি হলেন। তাঁকে বদলি করে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই সময়ের বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান। লেখক তাঁর পনিকালকে এই বইটি উৎসর্গ করেছেন। পরিশিষ্ট অংশ ছাড়া ১৫২ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি ৫৫টি শিরোনামযুক্ত অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রত্যেকটি অংশেই উঠে এসেছে লেখকের আত্মজীবনী। ঢাকা থেকে নৌপথে বরিশাল যেতে যেতে তিনি নিজের জীবনকে যেভাবে পেতে চাইতেন কিংবা যেভাবে পেয়েছিলেন তা-ই এই গ্রন্থে লিখেছেন। সহজতায়, রসিকতায়। এই গ্রন্থের গদ্য অনন্য। যে-কেউ একনিঃশ্বাসে এই গ্রন্থ পড়তে পারবেন।

পৃথিবীতে প্রত্যেকের আত্মজীবনীতে থাকে স্বাতন্ত্রিক বয়ান। আত্মজীবনী পড়তে পড়তে আমরা আমাদের সময়টাকে খুঁজে পাই। ব্যক্তি হয়তো নিজের কথাই লেখেন, নিজের সময়ের কথাই লেখেন কিন্তু সেই লেখাটার ভেতরে একটা সামষ্টিকতা হাজির থাকে। সে-সামষ্টিকতার ভেতরে সমাজ এবং আমরা উপস্থিত থাকি। এই গ্রন্থটার বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ শাহ্ আলমগীরের বয়ানে আমরা বাংলাদেশের গোটা পরীক্ষাব্যবস্থাটি বুঝতে পারি। পরীক্ষা, পরীক্ষার্থী, এর সাথে যুক্ত চারপাশকেও বুঝতে পারি। এ-রকম একটি গ্রন্থ পড়ে আমরা আমাদের সমাজটাকে একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি।  মুহাম্মদ শাহ্ আলমগীর সারাজীবন শিক্ষকতা করতে চেয়েছেন। কিন্তু নিজের ইচ্ছার বিপরীতে তাকে নানান প্রকার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে—এই গ্রন্থ তারই অভিজ্ঞান।

বাঙালিরা অনেকেই আত্মজীবনী লিখতে পারেন না। কারণ আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে প্রায় প্রত্যেকেই নায়ক হয়ে ওঠেন। এই গ্রন্থে লেখক নায়ক হয়ে ওঠেননি বরং বাস্তবতাকে লিখেছেন। ২০২৬ সালের জুন মাসে গ্রন্থটি পানকৌড়ি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এ-রকম একটি গ্রন্থ লেখার জন্য লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। এই গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক বলেছেন :

আমার পনিকাল  একটি ‘আত্মকথনধর্মী’ রচনা। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আত্মজীবনী লেখা হয়। যেহেতু ‘আত্মজীবনী’, সুতরাং নিজেরই তা লেখার কথা। কিন্তু অনেক আত্মজীবনী আছে, যা পেশাদার দক্ষ লেখককে দিয়ে লেখানো হয়। আমার বেলায় এর কোনোটিই প্রযোজ্য নয়। প্রথমত আমি কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি নই, দ্বিতীয়ত আমি কোনো পেশাদার দক্ষ লেখক নই। তাহলে আমি কেন এটি লিখতে গেলাম আর পাঠকই-বা কেন এটি পড়বেন?

মানুষ হিসেবে আমার মনের কথা, অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করার অধিকার বা স্বাধীনতা আমার আছে; তাই আমি লিখেছি। আবার পাঠকেরও পড়া না-পড়ার স্বাধীনতা আছে। তবে হ্যাঁ, এই পুস্তক পাঠে কোনো জ্ঞান অর্জন না হলেও কিছু আনন্দের সঞ্চার এবং সঞ্চয় যে হবে, সে-বিষয়ে আমি জোর দিয়ে না হলেও আলতো করে বলতে পারি।

শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও মাঝপথে আমাকে শিক্ষা-প্রশাসনে চলে যেতে হয়েছিল। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে প্রায় নয় বছরের কর্ম অভিজ্ঞতার বিভিন্ন দিক এই লেখার প্রতিপাদ্য হয়েছে। তাই এর নাম দিয়েছি ‘আমার পনিকাল’—অর্থাৎ আমার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককাল।”

জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের চোখ দিয়ে দেশের সার্বিক শিক্ষার গোটা আয়োজনটিকে এই বইয়ের পাতায় দেখে নেবার সুবর্ণ সুযোগটা পাওয়া যায়।


সরোজ মোস্তফা রচনারাশি

শেয়ার করুন:
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you