ইফতারমুহূর্তে

ইফতারমুহূর্তে

শেয়ার করুন:

বেলা পড়ে আসছে। এখন বিকেল মোড় নিচ্ছে সন্ধের দিকে। রোদ  মরাটে হয়ে ঢলে পড়ছে, তেজ তবু কম নয় এ-মুহূর্তেও। সন্ধের পর প্রচুর জ্যোৎস্না হয় আমাদের জানালায়। ঘর ভরে যায় মিষ্টি জ্যোৎস্নায়, মিস্টিক জ্যোৎস্নায়। ঋতু শরৎ বলে ভ্রম হয় কেবল ওই জ্যোৎস্নারাত্রিকালে। দিনের বেলা ঘোর গ্রীষ্ম। রোদ্দুর তেজোদ্দীপ্ত। রজনী বৃষ্টি ও জ্যোৎস্নামুখর। আঞ্চলিক আবহাওয়া এ-ই। টিগার্ডেনে ঘেরা আর্দ্র শহরটায় টিল্লাটাল্লার ফাঁক দিয়া সারাটিদিনের ডিউটি শেষে সূর্য তখন অনিচ্ছমন পশ্চিমেতে ধায়। বিকেল ভরে ওঠে বিদায়ী সূর্যের লালিমায়। সান্ধ্যাহ্নিকের শান্ত সুষমার আভা প্রতিফলিত হয় গেহসংলগ্ন সুরমায়। আর ঘণ্টাদেড়েক পরে ইফতার।

যদিও খিদে পেয়েছে রোজাদারের, এবং বিরান বালির দেশের তৃষ্ণা, তবু ভক্ষণ-বিরত প্রতীক্ষা সান্ধ্য-প্রচ্ছায়া-ফুঁড়ে-ভেসে-আসা মাগ্রিবের আজানের। সারাদিন রোজা রেখে এই ইফতারমুহূর্ত, ইফতার সামনে নিয়ে বসে থাকবার এই স্নিগ্ধ মুহূর্ত, অনন্য। মুহূর্তটি এলে আমি অবিকল ফিরে পাই আমার ছেলেবেলা, আমার অমল-ধবল কৈশোরের দিন। কত-কতভাবেই-না ছেলেবেলা ফিরে পাওয়া যায়, তাই না? কোনো কোনো মানুষের পাশে চুপচাপ বসে থাকার বা টুকটাক কথা বলার মুহূর্তেও আমি ছেলেবেলার অনেক অনুভূতি স্মৃতি সিনসিনারি দৃশ্যাবলি ফিরে পাই।

প্রিয়, ও আমার সর্বস্ব, পরম করুণাময়, কৃপাসায়র! সব কথা ভাষাধারে প্রকাশসম্ভব নয়, শোভনও হয় না সব হড়হড় বলে ফেলা, তা না-হলে বলতাম তোমাকে, কত গল্প-উপাখ্যান, শোনাতাম কত-কত গান, কত কথা ও কৌতুকী! কিছুই না-বলে, কিচ্ছুটি না-করে চুপচাপ বসে থাকি আমি, বসিয়া থাকি চিরটাকাল তোমার পাশে আলতো। শুয়ে থাকি আড়াআড়ি, প্রকাশ্য বাস্তবে বা মনে মনে, পায়চারি করি ঘরময়, মেঝেতে গড়াগড়ি যাই। কিংবা তোমার সনে রৌদ্র তাপাই, জ্যোৎস্না পোহাই, ছায়া লাগাই গায়ে। আমার চুপচাপ-মুহূর্তগুলোর তুমি দেখি ভিন্ন মানে বুঝে আমার ওপর নিক্ষেপ করো বহুবিধ বালামুসিবত।

তোমাকে যে কেমনে বোঝাই! নীরবতা ছাড়া তোমাকে তো দেখতে পাই না আমি। বিজ্ঞাপনসংস্থার হুজুরেরা পায় নিশ্চয় দেখতে, তাই তারা ফোঁক দেয় চোঙায়। হেফাজতি আমার কিছু সহকর্মীও তোমাকে পেয়ে যায় কী সহজে, কী অনায়াস পাঁচওয়াক্তের ব্যায়ামে, দাঙ্গাবাজ পত্রিকার পাতায়!

তুমি আমার মুখে হয়তো নাই, কিন্তু মুখই তো আর আমার একমাত্র অঙ্গ নয়। প্রেমপ্রকাশের একমাত্র অঙ্গ নয় মুখ। জবানের যন্ত্রণা যে জানে, সে প্রেমপ্রকাশে জবান ব্যবহারে বিরত রহে। ভাষার সীমা ও সংকট সম্পর্কে যে জানে না, তার তো মুখেই বেহেশত মুখেই তুমি। প্রেমপ্রমাণের জন্যও তার একটাই অঙ্গ : মুখ! জপনাম আর পঞ্চকীর্তন। তুমি কী এত সহজপ্রাপ্য!

মনে থেকো তুমি মানুষের, সখা হে, মুখে নয়। জেনো মুখ বড় প্রতারণা জানে, জবানের রয়েছে কত ছলনার লীলা! বাগিন্দ্রিয়ে কতটা আর হয় প্রকাশিত? প্রযত্নে রেখো শুধু শুভ মকসদগুলো। সর্বস্ব আমার! প্রিয় হে! প্রে অ্যান্ড হোপ ইয়্যু আন্ডার্স্ট্যান্ড মি। অ্যান্ড থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর কাইন্ড অ্যাটেনশন।

খুশবুদার নরম তুলতুলা খাবার সামনে রেখে এই নিরাত্মকথন।

  • ব্যানারে ব্যবহৃত আর্টোয়ার্ক সুধীর মৈত্র

জাহেদ আহমদ ১১ জুলাই ২০১৩


জাহেদ আহমদ রচনারাশি

জাহেদ আহমদ
Latest posts by জাহেদ আহমদ (see all)
শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you