মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থটি সুফি বিষয়ক তত্ত্বগ্রন্থ। প্রায় আড়াইশ বছর পাণ্ডুলিপিটি অপ্রকাশিত ছিল। ১৬৯৪ সালে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায় জন্ম নেন সাধক গোলাম হুসন। আশি বছর বয়সে ১৭৭৪ সালে তিনি তালিব হুসন রচনা করেন। মূল পাণ্ডুলিপির মোট ৪১টি গান আলোচিত হয়েছে—মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থে। নাগরীবিদ ও গবেষক মোস্তফা সেলিম পাণ্ডুলিপিটির উপস্থাপনের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে এক নতুন দিগন্ত। এ পাণ্ডুলিপিটি যেমন নাগরীলিপির আদি নিদর্শন, তেমনি বাংলা মরমি গানেরও আদি পাণ্ডুলিপি। মরমি গানের ইতিহাসের প্রাচীনত্ব ও উৎস নির্ণয়ে গ্রন্থটি এক অনন্য দলিল।
মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থটি মূলত সিলেটি নাগরীলিপিতে রচিত হয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর হাত ধরে নেপাল থেকে যেমন আবিষ্কৃত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ, তেমনি গবেষক নাগরীবিদ মোস্তফা সেলিম এই বিশাল গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে নাগরীলিপির নবজাগরণে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।
মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থটি বাংলা গানের ইতিহাসে এক স্বর্ণরেখা। গৌরবময় ফলক চর্যা যেমন বাংলালিপির আদি নমুনা, তেমনি গোলাম হুসনের গানও সিলেটি নাগরীলিপির আদি নমুনা। লালন সাঁইজি বাংলার মরমি সাহিত্যের ধারায় অগ্রণী এমন ধারণাই সর্বমহলে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সম্প্রতি আবিষ্কৃত গোলাম হুসনের গান ও তার পাণ্ডুলিপি বিশ্লেষণে দেখা যায় যে—গানের ভাব, ভাষা, দর্শন ও আধ্যাত্ম চিন্তায় এ গ্রন্থটি বাংলা মরমি গানের এক প্রাচীনতর উৎস।

গ্রন্থের গানগুলো সিলেটি নাগরী হরফে লেখা হলেও বাংলালিপিতে রূপান্তর করা হয়েছে। গোলাম হুসনের গানে আঞ্চলিক ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার রয়েছে। পাঠকের সুবিধার্থে শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা সহ পাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে যাতে বই পড়তে এবং এর গূঢ় তাৎপর্য সহজে অনুধাবন করা যায়।
মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থের গানগুলো পুথিকাব্যের পর্যায়ভুক্ত। তাঁর গানের সুর ছিল অধিকাংশ ধ্রুপদি ঘরানার। গানগুলোতে এক বা একাধিক ভাব বিষয়কে কেন্দ্র করে বিবৃত হয়েছে—কাহিনি ও বিষয়বস্তু। বিষয় হিসেবে—নবীতত্ত্ব, নবীবন্দনা, সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, আদমতত্ত্ব ও আল্লাহর বন্দনা রয়েছে অধিকাংশ গানে।
গোলাম হুসন মূলত আধ্যাত্মিক সাধক। সুফি তরিকা ছিল তাঁর স্বর্গে পৌঁছানোর এক পন্থা। আত্মা, প্রেম, পরম তত্ত্ব ও ঈশ্বরের সাধনা গূঢ় রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর গানে—যা দেহতত্ত্ব ও আত্মতত্ত্বের গভীর মিলনভাষ্য। গোলাম হুসন ছিলেন তত্ত্বজ্ঞানী ও অসাম্প্রদায়িক। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তিনি তাঁর গানগুলি রচনা করেছেন। তাঁর প্রতিটি গানই যেন রূপরসে দ্যুতিময়। তাঁর গানের ভাব, বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা শৈলী, আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও অস্তিত্বের গভীরে রয়েছে সুফি দর্শনের গূঢ় রহস্য। বিস্ময়কর হলেও সত্যি গোলাম হুসন তাঁর গানে একাধিক ধর্মের মর্মকে এক বিন্দুতে পরিণত করেছেন এবং তা হলো প্রেমবাদ। প্রেমই বিশ্ববিধাতাকে পাওয়ার পরম পন্থা।

নাগরীগবেষক মোস্তফা সেলিম মরমি গানের : উৎসমুখ গোলাম হুসনের গান প্রকাশ করতে গিয়ে গোলাম হুসনের পরিচিতি এবং তাঁর গানের আলোচনা করেছেন গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে—যেখানে গানের গভীরতম অন্তঃমূলের সন্ধান করেছেন ব্যাপকভাবে। গান লিপ্যন্তর, বাংলা রূপান্তর, শব্দার্থ ও টীকা, ভাব-বিষয়ের সংক্ষেপ, প্রচলিত রীতি, কাব্য গীতি ও পুথি গান ও পরিশিষ্টকে সার্থকভাবে প্রকাশ করেছেন।
সিলেটি নাগরী সাহিত্যের অমর ঋষিতুল্য সাধক গীতিকবিদের মধ্যে এযাবৎ প্রকাশিত আদিতম নিদর্শন হচ্ছে গোলাম হুসনের মরমি গানগুলি। তেরো শতকের শেষ ভাগ থেকে চৌদ্দ শতকের উষালগ্নের দিকে মরমি গানের সূচনা হয়। সুফি, সহজিয়া ও বৈষ্ণব মিলিত হয়ে একটি নতুন ধারার জন্ম দেয়, যা মরমি গান নামে পরিচিত।
আত্মসন্ধান সমাজ সংস্কার, সহজ-ভক্তিপূর্ণ জীবনচর্চার নবধারার মিথস্ক্রিয়ায় জন্ম মরমি গানের। এর মূলে রয়েছে দেহতত্ত্ব। দেহকে আত্মা ও ঈশ্বরের মিলনের রূপক হিসেবে গণ্য করা হয়।

মরমি গানে গুরুবাদী সাধনা চর্চায় থাকে পরম্পরা। গোলাম হুসনও ব্যতিক্রম নয়। গবেষক মোস্তফা সেলিমের মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থে গানের উৎপত্তি, ব্যুৎপত্তি, বিবর্তন, নিগূঢ় রহস্যভেদ ও দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয় করেছেন সন্তসাধকের চোখে। বিশেষ করে আবেগ অনুভূতি, ভাবসম্প্রসারণ ও সারাংশে গোলাম হুসন ও তার গানের উপস্থাপনা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে বিরল এই দুষ্প্রাপ্য ৪১টি গানের ভেতর সুফিবাদের গূঢ় তত্ত্বকথা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সুরমঞ্জরির বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনার স্বতস্ফূর্ত স্ফূরণ ঘটেছে গোলাম হুসনের গানে। প্রকৃতপক্ষে তাঁর গানের ভাব ও বিষয়কে প্রকাশের চেষ্টা রয়েছে অতৃপ্তির মাঝেও।
সৈয়দ শাহনূর, লালন সাঁই ও হাছন রাজার বহুকাল পূর্বেই গোলাম হুসনের জন্ম। লালন সাঁইয়ের ৮০ বছর পূর্বেই গোলাম হুসন জন্ম নেন সিলেট অঞ্চলে। মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান সিলেটি নাগরীলিপিতে রচিত হলেও তার সঙ্গে আরবি, ফার্সি ও উর্দুর বহুল ব্যবহার রয়েছে। শব্দতত্ত্ব ধ্বনিতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব সিলেটি হরফ ও ভাষার ব্যাকরণের অনুসরণ হয়েছে দৃঢ়ভাবে। সিলেটের উপভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক ও শব্দতাত্ত্বিক কাঠামোর রূপরেখা এই গ্রন্থে ধরা পড়ে।
গোলাম হুসন বাংলা মরমি গানের প্রাচীনতম কবি হিসেবে স্বীকৃত, যার গান ও দর্শন মরমি গানের আধ্যাত্মিক সংগীতের ইতিহাসে এক সমৃদ্ধ সংযোজন। তাঁর গানগুলো মরমি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। দেহ-আত্মা ও প্রেমের এক নতুন আধ্যাত্মিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন গোলাম হুসন। তাঁর সার্থক উত্তরসূরি সৈয়দ শাহনূর, শিতালং শাহ, লালন শাহ, হাছন রাজার মতো শত শত মরমি সাধক সমৃদ্ধ করেছে মরমি গানের ভাণ্ডারকে। ভাবসাধনায় তিনি ছিলেন এক মরমি ও সুফিবাদ চিন্তার দর্শনের পথিকৃৎ হিসেবে। প্রেমের আকুতি, আত্মার প্রশান্তি ও বিচ্ছেদের ব্যাখ্যা প্রেমিক প্রভূকে পাওয়ার পথচলা, লোভ-সংসার-মোহ থেকে মুক্তির সাধনাকে জাগ্রত রেখেছেন তাঁর মরমি গানে।

নাগরীবিদ মোস্তফা সেলিমের মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। ৪০০ পৃষ্ঠায় রচিত এই বিশাল গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে অবশ্যই। পরিশ্রমলব্ধ মেধার অনন্যতায় মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান গ্রন্থটি অনুসন্ধানী ও প্রকৃত পাঠকের পাথেয় ও সহযাত্রীর মতো বই।
১৮ আগস্ট ২০২৬
- রচনায় ব্যবহৃত ছবিগুলি নিবন্ধলেখকের সৌজন্যে পাওয়া।
- ‘মরমি গানের উৎসমুখ : গোলাম হুসনের গান’ প্রসঙ্গে || বদরুল হায়দার - August 20, 2026
- পৃথিবী আমার নিজেরই ছায়া || রোদ্দুর রিফাত - August 20, 2026
- ম্যাডোনায় মৃত্যুচিন্তা - August 11, 2026

COMMENTS