
১৫.
ছোটকালে ভয় পাওয়া ভূতদের সাথেও যে এইভাবে কোনোদিন দেখা হয়ে যাবে, দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি নাই।
কিন্তু আমি না ভাবলেই বা কী? আমার ভাবাভাবির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে ভূতের দল কিনা মাঠে নেমে পড়ল। তাই আমার সাথেও নানারকম, নানান পদের ভূতেদের দেখাসাক্ষাৎ ঘটতেই লাগল। কথাবার্তাও বলা হলো ওদের সাথে। কারো কারো ভাবভঙ্গি দেখে সত্যিসত্যিই ভয় পেয়ে কুঁকড়ে গেলাম। এমনকি জোরেসোরে চিৎকার করেও উঠলাম।
সুপার মার্কেটগুলিতে হলদে-কমলা-পোড়ামাটি রঙের মিষ্টিকুমড়ারা চড়া দরে বিকোতে লাগল। কারণ জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন (খোদাই-করা মিষ্টিকুমড়া) বানাতে হবে এবং সাজাতে হবে। নইলে কী আর ভুতদের উৎসব জমবে নাকি?
দোকানে দোকানে ঝুলতে লাগলো নানা রকমের ভুতদের আদল। মামদো, কানা, লম্বা, তেঁতুলে, গেছো, শাঁকচুন্নি, ডাইনি, আদুরে, রাগী, বখাটে—এ-রকম নানা ভূতের মুখোশ পরে হেঁটে যেতে লাগল লোকজন। আর রাস্তাঘাটে কুমড়াকৃতির লণ্ঠনগুলি জ্বলতে লাগল দিবারাত্র সব একাকার করে দিয়ে।
এতসব দেখেশুনে বুঝতে আর অসুবিধা রইল না যে, ভূতউৎসব আসন্ন। যদিও অক্টোবরের শেষ দিনটিতে পালিত হবে এই উৎসব, কিন্তু সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু হয়ে যায় ভূতেদের আনন্দ উদযাপন। এরা তক্কে তক্কে থাকে কখন কার ঘাড় মটকে দেয়া যায়। যদিও ঘাড় মটকাবার মতো লোমহর্ষক কোনো ব্যাপারস্যাপার ঘটেই না। থাকে শুধু অফুরান ফান আর গান। বাচ্চাদের জন্য এই উৎসবে থাকে জমজমাট আনন্দ!
হ্যালোইন হলো প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালিত হওয়া একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এটি মূলত ‘অল হ্যালোস ইভ’ (All Hallows’ Eve) নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই দিনে মানুষ ভূত, ডাইনি বা বিভিন্ন চরিত্রের ভয়ের পোশাক পরে, মিষ্টি বা চকলেট সংগ্রহ করে এবং লণ্ঠন বানায়।
‘অল হ্যালোস ইভ’ এই নামটি এসেছে খ্রিস্টীয় পবিত্র দিন ‘অল সেইন্টস ডে’-র আগের সন্ধ্যা থেকে। প্রাচীন সেল্টিক উৎসব ‘সামহাইন’ থেকে এর শুরু। আগেকার মানুষ বিশ্বাস করত এই রাতে মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে।
চারপাশে ভূতেদের ক্যারিকেচার দেখে তাতে সামিল না হলে চলে নাকি? তাই আমার গ্র্যান্ডসন অঞ্চিত আর অদ্বিকও পরল ভূতের পোশাক। অদ্বিকের লাইফে্র পয়লাপরথম হ্যালোইন বলে কথা! সে পরল কালোরঙে ভূতের শাদা মাথা বসানো ভারি মজার একটা টিশার্ট।
এখন তো ভূতেরাও আর কারো বাড়ি যেতে পারে না ফোনটোন না করে।
বাচ্চারা তাই শপিং মলের দোকানগুলিতেই যায় মনে বড় আশা নিয়ে। হাতে থাকে ভূতের নাকচোখ আঁকা ছোটছোট কমলা, হলদে বা হলুদাভ বালতি। দশটা দোকান হাঁটলেও বেচারাদের ছোট বালতির আধেকও পূর্ণ হয় না চকলেট-চুইংগামে! এই ট্রিক-অর-ট্রিট করা বাচ্চাদের ভারি আদুরে দেখায়। একেকজন কত যত্ন করেই না ভূতপ্রেতডাইনি সেজে আসে!
একটা শপিং মলের ভিতর সত্যি সত্যিই ভূতের বাড়ি বানানো হয়েছে। এই বাড়িতে ঢুকতে হলে কোনো এন্ট্রিফি লাগে না। এই সভ্য দেশে বহু আনন্দ কড়ি ছাড়াই বিলানো হয়। কড়ি দিয়ে উচ্চ মূল্যে এইখানে কিনতে হয় না সবকিছু। এত কাছে এসেও ভূতের বাড়িতে দুইদণ্ড পিঁড়ি পেতে বসে যাব না তা হয় নাকি? কিন্তু ভূতেদের বাড়িতে ঢুকেই ভড়কে গেলাম, ভয়ঙ্কর চেহারার দুই-একজন ডাইনি মানুষের কঙ্কালের খুলি হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজনকে দেখলাম সদ্য গ্রেইভইয়ার্ড থেকে উঠে এসেছে। পরনে ধবধবে সাদা কাফন! একটা অন্ধকার প্যাসেজে ঢুকতেই নানারকম ভূত হাউমাউখাউ করে ছুটে এল। সে এক অভিজ্ঞতা বটে! এই প্যাসেজে নানা রঙের আলো ফেলে ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। বাচ্চারা একেকজন ভয় পেয়ে তারস্বরে কান্না জুড়ে দিয়েছে। কেউ কেউ মা বা বাবার কোলে ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাদের মতো লটকে আছে। কোনোভাবেই কেউ কোল থেকে নামছে না। ভূত দেখে ভয় পাওয়া কান্নারত বাচ্চাদের সামলাতে ব্যস্ত ওদের বাবামা।
অঞ্চিত নির্ভীকভাবে ভূতের বাড়িঘরে ঘুরাঘুরি করতে লাগল। ঘুরে ঘুরে ওর পছন্দসই ভূতদের সাথে হ্যান্ডশেইক করার জন্য ছোট্ট হাতখানা বাড়িয়ে দিলো। ভূতেরাও হাসতে হাসতে ওর সাথে হাত মেলালো। আমি শুধু ভাবছি, শিশুদের নির্ভেজাল আনন্দ দেবার লক্ষ্যে ভূতের বাড়ির ভূতরূপী মানুষগুলো কি সামান্যতম ক্লান্তি বোধ করছে না? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব ভূতেরা রঙচঙ মেখে লাগাতার শিশুদের আনন্দ দিয়েই যাচ্ছে। অথচ এই আনন্দধামে, মুখোশের আড়ালে ঢেকে রাখা মুখগুলোকে এইসব অবুঝ শিশুরা হয়তো কোনোদিন চিনতেও পারবে না।
পৃথিবীর সব কাজেই বিনিময় খুঁজতে হবে কেন? তাই ভূতরূপী মানুষেরা তাহাদের কাজ করিয়া যায়…
২৬ অক্টোবর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৫ || পাপড়ি রহমান - August 22, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৪ || পাপড়ি রহমান - August 14, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১৩ || পাপড়ি রহমান - August 7, 2026

COMMENTS