আবার সন্ধ্যায় ভোলাভুলির রোদ নামুক || শুভ্র সরকার

আবার সন্ধ্যায় ভোলাভুলির রোদ নামুক || শুভ্র সরকার

শেয়ার করুন:
  • ‘কার্তিকের তুল্য মাস নেই। সত্যযুগের ন্যায় যুগ নেই। বেদের সমান শাস্ত্র নেই । গঙ্গার ন্যায় তীর্থ নেই।’
  • ‘কার্তিক মাস শ্রেষ্ঠ। কার্তিক মাস সর্বদা বৈষ্ণবগণের প্রিয়। হে মহর্ষি, যে-বৈষ্ণব ভক্তি সহকারে কার্তিক মাসের পরিচর্যা করেন তিনি পূর্বপুরুষগণকে নরক থেকে উদ্ধার করেন।’

পদ্মপুরাণে কথিত হয়েছে—দ্বাদশ মাসের মধ্যে কার্তিক মাসই শ্রীহরির সর্বাধিক প্রিয়। এই সময়ে যিনি এমনকি শ্রীবিষ্ণুর সামান্য আরাধনাও করেন, কার্তিক মাস তাঁকে শ্রীবিষ্ণুর অপ্রাকৃত ধামে বাস প্রদান করে। সবাই জানে, ভগবান দামোদর তাঁর ভক্তগণকে ভালবাসেন।

আমার মনে পড়ে,  কার্তিক মাসের শেষে কার্তিক পূজার দিন—এই সময় খড় বা বাঁশের সাহায্যে মশামাছির প্রতিকৃতি বা ভোলা তৈরি করা হতো। অনেক জায়গাতে এইটাকে ভোলাভুলি উৎসব বলা হয়। এরপর আমরা গোয়ালঘর থেকে মশামাছি মারতাম। কয়টা মারতে হবে এইটার একটা সংখ্যা ছিল, সম্ভবত তিনটা/পাঁচটা এইরকম কিছু হবে। তারপর ঠিক সন্ধ্যার আগে খড়ের এই প্রতিকৃতির তিনটি মাথার আগায় মশামাছি গুঁজে দেয়া হতো। মাঝখানের মাথাটা বড় আর দুইটা পাখা ছোট থাকত। পরে সেই মাথাগুলোতে আগুন লাগিয়ে, সেইটাকে হাতে নিয়ে সারাবাড়ির চারপাশে দৌড়াদৌড়ি করা হইতো। আর পেছনে একজন থাকতো যে-কিনা একটা ভাঙা কুলা হাতে নিয়ে কুলার পিঠে পিটাইতে পিটাইতে ছুটতো।

আগুন জ্বালানোর পর সবাই মিলে সমস্বরে চিৎকার করে বলত, “ভালা আইয়ে বুরা যায়, মশামাছির মুখ পোড়া যায় / ভালা আইয়ে বুরা যায়, ভোলানাথের মুখ পোড়া যায়।” এর সহজ অর্থ হলো—ভালো আসুক, খারাপ বা অমঙ্গল দূর হোক এবং মশামাছির বংশ ধ্বংস বা মুখ পুড়ে যাক। যদিও আজ এ-উৎসব গ্রামবাংলা থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। নতুন প্রজন্মের অনেকে এ-সম্পর্কে জানেই না। জানামতে, হিন্দু-মুসলমান সবাই পালন করতে এইটা। বাঙালি জাতির সংস্কৃতি ধরে রাখার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরের মূলে প্রোথিত। বারো মাসে যে তেরো পার্বণ বলা হতো, সেই বারো মাসে তেরো পার্বণের একটি হলো—মশামাছির মুখপোড়া বা ভোলাভুলি উৎসব।

সূর্য যেন দেখে নিতো সেই আগুন, আগুন থেকে খসে পড়তো ছোট ছোট সূর্যের ইশতেহার। আমাদের আনন্দ জমা হয়ে থাকতো যেন সূর্যের ভুবনে। মামাদের একটা মরিচটাল ছিল। সেখানে মুলা, কপি আরো নানাজাতের সবজির চাষ হইতো। দূরে অনেক সবুজ ধানখেত পার হলে একটা ছোট দরগা, সেখানে দিনের বেলাতে গেলেও গা ছম ছম করতো৷ বেশ কয়েকটা আমগাছ ছিল, সেই টিলার উপর। সেখানকার কোনো একটা গাছে অনেক আগে কালা নামে একজন পুরুষ আত্মহত্যা করেছিল, আমরা অবশ্য দেখি নাই, শুনেছি মাত্র। দক্ষিণ দিকটায় একটা ডোবার মতন ছিল। দিনান্তে কেউ কেউ সেই ডোবায় বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে যেত। খুব রোদেও ঝিম ধরে বড়শি হাতে বসে থাকতে দেখেছি কাউকে আশানুরূপ এমন একটা চেহারা নিয়ে। সেখানে একবার রবিদাস নামে এক বড়শিয়ালকে বলতে শুনেছিলাম—যে-মাছ তিনবার ঠোকর দিয়ে চলে যায়, সেই মাছ আর টোপ খাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে কৌতূহলী হয় না।

কেন জানি রবিদাসের সেই কথা শোনার জন্যে আমি ঘোরের ভেতর আজো অপেক্ষায় থাকি। যা-ই হোক,  পরে সেই খড়ের আংশিক পোড়া প্রতিকৃতি, মানে ভোলা যাকে বলা হয়, তা মরিচটালে মাটিতে গেঁথে রেখে আসতাম। সাথে ভাঙা কুলাটাও। যেন বিস্ময়কর সেই সন্ধ্যা আর কার্তিকপূজার রাতে গীত সহ কার্তিকবীরগাথা আজও হাত বাড়িয়ে ডাকে।


শুভ্র সরকার রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you