এপ্রিল মাসের কোনো এক শনিবার বাড়ি থেকে আসার সময় মা আমাকে কালো সুতোর সাথে লাল কাপড়ের টুকরো গিট্টু দিয়ে কোমরে বেঁধে দিলেন। তখন মাকে জিগ্যেশ করলাম—এটা কেন বেঁধে দিচ্ছ? উত্তরে মা আমাকে জানালো শনিদেবের অশুভ প্রভাব কমবে এবং ইতিবাচক শক্তি বাড়বে। তো আমি আর তখন মাকে বলতে পারিনি যে, লাল কাপড়ের টুকরোর ভিতরে কি আছে৷ যদিও কোমরের এই বাইট্টা নিয়ে আমার কোনোরকম অসুবিধা হচ্ছিল না। তবুও একটা কৌতূহল থাকল মনে। এইভাবে বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর একদিন মাকে হঠাৎ করে জিজ্ঞাস করলাম—আচ্ছা মা, লাল কাপড়ের ভিতরে কি বাঁধা আছে? মা জানালো ওইটায় শুধু তুলসী গাছের শিকড় বাঁধা। আর কিছু নয়। জানা মতে, শিকড়ের সাথে মানুষের প্রথম সম্পর্ক হয়েছিল নব্যপ্রস্তর যুগে। জন্মকুণ্ডলীতে উপস্থিত নয়টি গ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। তাই ভেষজ গুণাবলির পাশাপাশি এগুলোর মধ্যে অলৌকিক নিরাময় ক্ষমতা রয়েছে বলেও মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
০২.
সেই দফায় বাড়িতে গিয়ে দেখলাম একটা ইচেভেরিয়া সুন্দর পাতার গঠনে বেড়ে উঠেছে। গাছটাকে এর আগে যখন দেখেছিলাম তখন ভেবেছিলাম বাঁচবে না হয়তো, মরে যাবে। আমি বুঝিনি গাছেদেরও যে ইচ্ছে জাগতে পারে পৃথিবীতে পাতার মস্তিষ্ক আঁকার। যে-মস্তিষ্ক দিয়ে অনুভব করতে জানে উড়ে গেছে দূরে কোথাও মুখস্মৃতির পাখি। যে-পাখি আমার মায়ের মতো বুকের ভেতর হাহাকার তৈরি করতে পারে। এখনে সন্ধ্যা নামে, আর আমি বাড়ির কথা ভাবি। সন্ধ্যার রঙ ধরতে থাকে যখন আমাদের জবাফুল গাছে, তখন মনে হয় আমার টিশার্টে অবাক করা ছোপ ছোপ রঙ এসে জমে আছে। কী অদ্ভুত! মা, তোমাকে কীভাবে বলি যে সে এক বিষাদের রঙ। ছড়িয়ে পড়ছে আমার কলমে আঙুলগুলো দিয়ে। কীভাবে বোঝাই নিজেকে—দূর বলে কিছু নেই, নিকটেই সব। যেমন দেখি—ভ্যান গগের তারকাখচিত রাত্রি। সেখানে সাদা রঙের সামিয়ানা টাঙিয়েছে বাবা। আমি শব্দ করে ডাকলেও তার কোনো সাড়া মেলে না।
০৩.
ওইদিন রাস্তা পার হইতে গিয়ে একটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে যেন বেঁচে ফিরলাম৷ উত্তুরে হাওয়া এল। যে-হাওয়ার ভেতর আমার কথাসকল ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আমার বুকে মাছে ঘাই মারা জলের মতো দশা। ঠিক তখন আমি লাল পুটলিটায় হাত রাখলাম। আর ভাবলাম—আর কোনো মৃত্যু এত নিকটবর্তী হয়ে আমাকে বাঁচিয়ে না রাখুক। তখন গোধূলিসন্ধ্যার আলো চলে গেছে বলেই কী মায়া লাগছিল নিজের জন্যে? একটা কাঠবাদামগাছের নীরব ক্লান্তির কাছে এসেও বুঝে ওঠা গেল না ঠিক—মা, ওইদিন কতটুকু নিঃশ্বাস ভরে দিয়েছিল তার আয়ু থেকে লাল পুটলিটায়?
- ব্যানারে ব্যবহৃত ফটোগ্রাফসৌজন্য শুভ্র সরকার।—গানপার
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- মায়ের নিঃশ্বাস || শুভ্র সরকার - June 30, 2026
- ছায়ানৈকট্যে বসে থাকেন একজন দেবেন বিশ্বাস || শুভ্র সরকার - June 18, 2026
- আবার সন্ধ্যায় ভোলাভুলির রোদ নামুক || শুভ্র সরকার - June 10, 2026

COMMENTS