চক্রবর্তী বিনয়

চক্রবর্তী বিনয়

শেয়ার করুন:

কবিরে পাবে না তার জীবনচরিতে; বেশ, ভালো কথা, তাহলে কোথায় পাবো তারে? কবিতায়? না, তা তো নয় মনে হয়। ঠাকুরবাক্য শিরোধার্য হলে যেমন নয়, তেমনি ঠাকুরবাক্য মস্তকে না-নিয়েও কবিরে বের করা তার জীবনচরিত খুঁড়ে — না, তা-ও সম্ভব নয়। জীবন হয়তো খুঁজিয়া পাওয়া যাবে চরিতালেখ্য থেকে, বেশ অথেন্টিক কবিজীবন লভ্য কবির অটোবায়োগ্র্যাফি মারফতে — সেইটা তার বিকাশকালীন চারপাশ, তার সমাজ, কবির বংশলতা আর তার পারিবারিক ও সামাজিক ও রাজনৈতিক তৎকালেতিহাস; ওইসব খোঁজপাত্তা আদৌ নগণ্য নয়, জীবনচরিত কবিখোঁজায় বেশ ভালো সম্পূরক তথ্যের উৎস। তবু গোটা কবিটাকে সেখানে পাওয়া যায় না বলিয়াই বেত্তাদের অভিমত। রইল অবশিষ্ট কবির কবিতা। তা যে তেমন অনির্ভরযোগ্য নয়, স্বীয় কবিতাবলি থেকে কবির জীবন রিকল করা যায় এবং তেমন করা হয়েও থাকে। এই নিবন্ধে সেসবের কিছুই হচ্ছে না। তাহলে? এই নিবন্ধের জন্রা কী? নিবন্ধের আবার জন্রাও হয় নাকি? নিশ্চয় হতে পারে। এইবার কনফেস করি। দিস পিস অফ আর্টিকল ইজ অ্যা ওয়ার্ক অফ ফিকশন। অ্যানি রিজেমব্লেন্স টু অ্যাকচুয়াল পার্সন্স, লিভিং অর ডেড, ইজ পিউরলি কোইন্সিডেন্টাল। ইট ইজ নট ইন্টেন্ডেড টু অফেন্ড অর হার্ট দি সেন্টিমেন্টস অফ অ্যানি ইন্ডিভিজুয়াল, কমিউনিটি, কাস্ট অর রিলিজিয়ন। রচনাটি ফিকশন। কমপ্লিটলি ফিকশন।

 

গায়ত্রী, বিনয়, ফিরিয়া-পাওয়া চাকা
গায়ত্রী চক্রবর্তীকে চেনেন না, এমন কবিতাপাঠক ভূবাংলায় বিরল। পরিণীত, পরিণত ও পরবর্তী জীবনে যিনি হয়েছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। তুখোড় বিদ্যায়তনিক মেধা ও সাফল্যের অধিকারী তিনি অতি অল্প বয়স থেকেই। লিজেন্ড হয়েই জীবন ও ক্যারিয়ার শুরু করেছেন তিনি, কিংবদন্তি হাসিল করা বা ধরে রাখার জন্য সেলেব্রেটিদিগের ন্যায় বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাকে, দেখে মনে হয় যেন অনায়াসেই এসেছে খ্যাতি তার হাতে, থেকেছে যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই, নিজের ভেতরের শক্তিবলে, সম্ভবত। অফ গ্র্যাম্যাটোলোজির ইংরেজি ভাষান্তর বা সেই ভাষান্তরিত ভার্শনের ইন্ট্রোডাক্টোরি প্রিফেইস পড়ার সুবাদে কিংবা ডায়াস্পোরা  বা আদার এশিয়া  বা সাবোল্টার্ন স্টাডিচিন্তা বা তার পোস্ট-কলোনিয়্যাল ক্রিটিক ইত্যাদির জন্য তিনি আমাদের কাছে লেজেন্ডারি ফিগার হয়েছেন কথাটা ডাহা মিথ্যা। গায়ত্রীর দুনিয়াজোড়া খ্যাতি আর বাংলাজোড়া খ্যাতি ভিন্ন দুই কারণে। দুনিয়ায় তিনি সমাদৃত লিটারেরি থিয়োরির একজন শার্প ইন্টার্প্রেটার হিশেবে, আমেরিকার অ্যাকাডেমিক অ্যারেনায় তিনি বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় জুড়ে খ্যাতিকীর্তিশীর্ষে একজন স্কলার হিশেবে, এদিকে বাংলায় তিনি খ্যাত ও সকলের সপ্রেম কৌতূহলকেন্দ্র একজন কবির সূত্রে। এই নিবন্ধে গায়ত্রী স্মৃত হচ্ছেন অবশ্য অন্য কারণে, একটা বইয়ের সুবাদেই, একটা নতুন প্রকাশিত বইপাঠের সুবাদে। কেন নয়, হ্যাঁ, কেন নয় সেই জীবনব্যয়িত উন্মাদগ্রস্ত কবিটিও?

বইটা আয়ওয়ার ডায়েরি,  লিখেছেন শঙ্খ ঘোষ, প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০১৪, পাঠক  নামে একটা কলকাতাভিত্তিক প্রকাশালয় থেকে বেরিয়েছে বইটা। সাকুল্যে ২৪০ পৃষ্ঠার বই, গায়ের দাম ২৫০, মুদ্রাবদলের পর মোটমাট হাদিয়া দিতে হয়েছে ৪৭৫ বাংলাদেশি টাকা। কাগজ-বাঁধাই-মুদ্রণসৌকর্য সবকিছু মিলিয়ে একবার হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে আপনারও মনে হবে, তেমন বেশি তো না দামটা, ঠিকই তো আছে। কেনার সময় — ঠিক খরিদমুহূর্তে নয়, কেনাদাম চুকায়ে বইখানা ব্যাগস্থ করবার পর সঙ্গীদের সৌজন্যে সান্ধ্য চা-পুরি খেতে বসে — একটু খচখচ করছিল বটে। একজন মনের ভেতর কু ঢুকিয়ে দিলেন, বইটা ঘুমিয়ে-পড়া অ্যালবাম  নয় তো! সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, আরে, তাই তো! শঙ্খ তো আয়ওয়াস্মৃতি নিয়ে এর আগে ঘুমিয়ে-পড়া অ্যালবাম  নামে একটা বই করেছেন, তবে কি পুরনো পূর্বপঠিত বই কিনে ফের ঠকিলাম? অসোয়াস্তি ছিল সেই-হেতু। পুরনো মদ খুবই ভালো জিনিশ, উমদা ব্যাপার, মদামোদী মাত্রই তা জানেন। কিন্তু পূর্বপঠিত বই কিনে ঠকা খাওয়ার মতন বিড়ম্বনা আর-কিছুতে নেই, কথাটা ভুক্তভোগী মাত্রই স্বীকারিবেন। এহেন ঠকা খাওয়ার এক্সপেরিয়েন্স প্রচুর জুটেছে হুমায়ূন-মিলন পড়ার দিনগুলোতে। একই বই ভিন্ন নামে ভিন্ন প্রকাশনী থেকে বেরোনোর ঘটনা কমার্শিয়্যালি হট-কেইক লেখকদের বেলায় ঘটে থাকে, শঙ্খ এমন দুষ্কর্ম করবেন মর্মে বিশ্বাস হচ্ছিল না।

না, মিছে দুর্ভাবনা, ঠকি নাই। অনেকদিন আগে বেরোনো ঘুমিয়ে-পড়া অ্যালবাম  বস্তুত কবির আয়ওয়াবাসের স্মৃতিভিত্তিক প্রকাশার্থে-তৈয়ের-করা পূর্ণাঙ্গ রচনাই ছিল, যেখানে আয়ওয়ায় বাসকালীন শঙ্খসংস্পর্শে-আসা স্থান, ঘটনা ও ব্যক্তিবর্গ নিয়ে স্কেচধর্মী কিছু খণ্ড-খণ্ড লেখা আলগ-আলগ উপশিরোনামের আওতায় পাশাপাশি বসে একটা বই হয়েছিল। শঙ্খ ওইসময় যে-ডায়েরিটা রাখতেন নিয়মিত প্রায় প্রতিদিন, সেইটি এই প্রথম প্রকাশিত হলো। ১৯৬৭-৬৮ সময়পর্বে শঙ্খ আয়ওয়া কোর্সে ছিলেন কিছু-কম বছরকাল মোটমাট। বইয়ের উৎসর্গপঙক্তি : “ইভাকে, সেই দিনগুলি”। ইভা শঙ্খসহধর্মিনীর ডাকনাম। মনে পড়ে, এছাড়াও, অন্যকিছু? মনে পড়ে, শঙ্খ-অভিষেক? সন ১৯৫৬, শঙ্খ ঘোষের প্রথম পৃথিবী ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ছিল হোথায় “হে আমার সুনিবিড় তমস্বিনী ঘনভার রাত্রি, আমাকে হানো” — স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে হেনেছিলেন পয়লা বাণ পঙক্তিটি, ‘ইভাকে’ লেখা আছিল অভিষেকবইতেও উৎসর্গপৃষ্ঠায়, নিশ্চয় বিস্মরণের নয়। এইখানে, ‘আয়ওয়ার ডায়রি’ — এই বইয়ের শুরুতে একপ্যারা সূচনাকথা, এর শেষ লাইনটা হলো : “সম্ভাব্য পাঠকদের শুধু জানিয়ে রাখি যে মনন বা অনুভবের বিশেষ কোনো চিহ্ন নেই এখানে।” কিন্তু বইয়ের পাঠক নিশ্চয় শঙ্খবিনয়ের সঙ্গে ইতোপূর্বে পরিচিত। অতএব, কবির কূটকথায় না ভুলি, নির্দ্বিধায় বইয়ের ভেতরদেশে প্রবেশ করা যেতে পারে।

কিন্তু এইখানে কেবল কিছু কোটেশন চয়ন করা যাচ্ছে, বই থেকে, যেগুলো গায়ত্রীসংশ্লিষ্ট। দুইজন নারী-চরিত্র আছেন এখানে, যারা আমাদের পূর্বপরিচিত, এদের একজন গায়ত্রী এবং অন্যজন মার্গারেট। সেই মার্গারেট, সুনীলের নানান লেখায় এবং বিশেষভাবেই ছবির দেশে কবিতার দেশে বইয়ের সুবাদে যার চেহারা আমাদের কাছে প্রেমোজ্জ্বল হয়ে আছে। অ্যানিওয়ে। এইখানে কেবল গায়ত্রীমন্ত্র। মার্গারেট-মর্সিয়া বারান্তরে।

১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮, কনকনে এক বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনে, শঙ্খ প্রথমবার গায়ত্রীকে দেখছেন আমেরিকায়। ইত্যবসরে বেরিয়ে গেছে বিনয়ের বেশ-ক’টি বই এবং বিনয় চিকিৎসাধীন পাগলা-নিরাময়করণ হাসপাতালে। বেরিয়েছে বিনয় মজুমদারের গায়ত্রীকে,  ১৯৬১, এবং ফিরে এসো, চাকা,  ১৯৬২, এবং বই-কয়টি ও বিনয়ের কারণে কবিমহলে গায়ত্রী এক বিখ্যাত রহস্যচরিত্র। যদিও এসবের সঙ্গে গায়ত্রীর কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই, এই-মর্মে বিনয় বিভিন্ন ইন্টার্ভিয়্যু ও অন্যান্য লেখাপত্রে বিবৃতি দিয়েছেন, গায়ত্রী বিনয়ের অনুপ্রেরণাদাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই বনেদি গৃহের ঝাঁ-চকচকে মেধাবিনী বিদুষী সুষমাশীলাকে দেখেছেন কবি দূর থেকে, অ্যাপ্রোচ/প্রোপোজ করেননি। কিন্তু গায়ত্রী চক্র তথা চাকা তার — বিনয়ের — আজীবনের কবিতায় ফিরে ফিরে এসেছে। দেওয়ানা জিকিরের ন্যায় এসেছে ফিরে ফিরে। এ যেন সেই রাধা, আহা, রাধিকাধারণা! গায়ত্রীকে  নামে বেরোনো বইয়ের কবিতাগুলো নিয়েই তিনি পরে ফের বের করেছেন ফিরে এসো, চাকা ; আবার নাম বদলে বের করেছেন আমার ঈশ্বরীকে, এরপর ফের ঈশ্বরীর কবিতাবলি, ইত্যাদি। বাংলাকবিতার পাঠক এইসব, সমস্তই, জানেন। কাজেই শঙ্খরক্ষিত আয়ওয়াদিনপত্রী বিহার করে আসা যাক একদৌড়ে। এখানে কেবল গায়ত্রীনিঃশ্বাসটুকু :

“অসম্ভব ঠাণ্ডায় পথে বেরিয়ে জমে যাচ্ছিলাম প্রায়। দৌড়ে কোনোরকমে লাইব্রেরিতে আশ্রয়। ছেলেমেয়েদের এক দফা পরীক্ষা হয়ে গেছে বলে লাইব্রেরি এখন একটু শান্ত, লোকজন নেই বললেই চলে। বেরোবার সময়ে এসে ধরলেন গায়ত্রী স্পিভাকের মা। সঙ্গে গায়ত্রী। অতএব আলাপ হলো শহরের সবচেয়ে খ্যাতনাম্নী গায়ত্রীর সঙ্গে। জানা গেল ইনিও আমাকে লক্ষ করেছেন অনেকদিন, বুঝতে পেরেছেন আমিই শঙ্খ, অবসর হয়নি আলাপ করবার। আমিও উল্টে বললাম তা-ই। আসলে আমি ভেবেইছিলাম নিজের থেকে আলাপ করব না, ভালো লাগল যে ইনিই করলেন।

কথাটা এ-ই যে সত্যি সত্যি গিফ্টেড এই মহিলা — মানে, মেয়েটি। বাংলা বলায় কোনো ভঙ্গিমাজনিত জড়তা নেই বা কোনো স্নবারির চিহ্ন। ফরাসি ইংরেজি বলেন সমান চালে। আর, গায়ত্রীর মা সদ্য ভর্তি হয়েছেন একটা কোর্সে, এই বয়সে।”

এই সাক্ষাতে গায়ত্রী নিমন্ত্রণ করেন শঙ্খকে, তাদের বাসায়, নেক্সট স্যাটার্ডে। এগিয়ে যাওয়া যাক শনিবারের পাতায়, শঙ্খভুক্তিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি, গায়ত্রীদের বাড়িতে :

… যেমন হয়ে থাকে পার্টিতে, কয়েকজন বিচিত্র মানুষের সঙ্গে আলাপ। … গায়ত্রীর মাকে খুব ভালো লাগল। কথাসূত্রে গায়ত্রীর স্বামী বলে বসলেন, বেনারসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ডায়ারিয়া হয়েছিল। শুনে তাঁর শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন করুণকোমল গলায় : “এইটেই কি সবচেয়ে মনে রাখবার কথা?”

৭ মার্চের এন্ট্রিতে এরপর, ঝকঝকে সানশাইনি দিন ও উত্তাপও বেশ, পাওয়া যাচ্ছে :

গায়ত্রী নিমন্ত্রণ জানালেন ১৪ই। দোলের জন্য? “দোল? কবে? চৌদ্দই? মাকে এখন বলব না, সেদিন বলব। মজা হবে।”

এরপর ২০ মার্চ যেয়ে এই ভুক্তি :

“সোমবার সকালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল একটা, গায়ত্রীর সঙ্গে। ইচ্ছে করেই যাইনি। কিন্তু ভালো হয়নি ব্যাপারটা, আবার ফোন করে নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে মেয়েটি, আজ যেতে হলো। মেয়েটিই বলতে হচ্ছে, কেননা আমার চেয়ে বছর-সাতেকের ছোট হবে। কিন্তু প্রতিভাবলে খুবই প্রতিপত্তি এখানে, গুণীই বলতে হয়। ফরাসির সঙ্গে জার্মান ভাষাও জানে, সামনের বছর আবার এখানে সংস্কৃত পড়াবে। ওর স্বামী নাকি একটি উপন্যাস শেষ করেছেন সম্প্রতি। প্রোগ্রাম বিষয়ে আমার কথাবার্তা শুনে বলল : আমিও তো তাই ভাবি, লেখকরা কেন আমেরিকার টাকায় আসবে এখানে। একটা অব্লিগেশন তো বটে।

যাদবপুরের কম্প-লিট্রেচার বিভাগের সমালোচনা করল খানিক। মূল উদ্দেশ্য ছিল অনুবাদ বিষয়ে পরামর্শ। কোনো একটি সংস্থা থেকে অনুবাদের দায়িত্ব পাবে হয়তো, কী বই ধরা উচিত। দিবারাত্রির কাব্য, জাগরী  আর অন্তর্জলী যাত্রার নাম বললাম।”

যে-প্রোগ্রাম বিষয়ে কথা হচ্ছিল, সেইটে এই আয়ওয়া প্রোগ্রাম। আর কথা হচ্ছিল যাদবপুর ইউনিভার্সিটির তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ নিয়ে, যে-বিভাগের পত্তনি ও প্রতিষ্ঠা বুদ্ধদেব বসুর হাতে।

এর পরের এন্ট্রি ৩১ মার্চ। গায়ত্রীর বাড়ি।

“গায়ত্রীর বাড়িতে ভারতীয় সমাবেশ। ওর স্বামীকে তো একটু একটু করে ভালোই লাগছে। মিথ্যে ধারণা দিয়েছিল সেনগুপ্ত। চুপচাপ কেন, জিজ্ঞেস করলেন আমায়, একান্তে। বললাম, বলেই ফেললাম, এ-রকম ভিড়ের মধ্যে সাজানো কথা বলতে ভালো লাগে না। শুনে বললেন, সত্যি বলতে অনেকেরই তা লাগে না, অকারণে অনেকে নিজের ওপর অত্যাচার করে মাত্র। … গায়ত্রীর বোন এসেছে। দুজনে মিলে গান গাইল। বেশ ভালো। গায়ত্রী নাকি কবিতা লিখেছে কয়েকটা, প্রকাশ করবারও ইচ্ছে, কিন্তু আমাকে দেখানোয় খুবই অনিচ্ছে।”

এইবার এই নিবন্ধাংশের শেষ-বক্তব্য, উপসংহারহীন, উদ্ধার করে ক্ষান্ত হওয়া যাক। এইটি বেশ আগের এন্ট্রি, ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখের, শেষের জন্য বেছে রেখেছিলাম। কেন শেষের জন্য, তুলে দিচ্ছি, বোঝা যাবে। অ্যানিওয়ে। এখানে হুআলিং নামে একটা ক্যারেক্টার উল্লেখ পাওয়া যাবে, ইনি আয়ওয়া প্রোগ্রামপ্রধান মশহুর পল এঙ্গেলের সহকারিণী চীনা লেখক, শঙ্খ ও অন্যান্য কোর্সমেটদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সংশ্লিষ্ট। ভুক্তিটির প্রাসঙ্গিক অংশ পড়তে পড়তে এই অংশ থেকে বিদেয় হওয়া যাক :

‘লাইব্রেরি — হুআলিংকে কবিতাগুচ্ছ (রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব, বিনয়) — পথে গায়ত্রী — “আচ্ছা, আপনার কাছে কি বিনয়ের বই আছে?” — না তো। আসলে কেন জানি আমার একটা কুসংস্কার আছে যে এই বই আমার রাখা উচিত নয়। — “উচিত নয়?” — উচিত নয়।

এই উচিতবোধটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিন্তু দেশ থেকে আসবার সময়ে বিনয়ের বইটা আমি ভুলে গেলাম কী করে?’

শেষের বাক্যটা, বাক্যদ্বয় ইন্-ফ্যাক্ট, শঙ্খের জনান্তিকে উক্ত, বলা বাহুল্য। শঙ্খপাঠক যারা, বা ডায়েরি-জর্নাল পড়তে ভালোবাসেন যারা, তাদের কাছে এই বই তো মন্দ লাগবার নয়। কিংবা যারা জার্নাল  পড়েছেন এই লেখকের, এবং/অথবা ঘুমিয়ে-পড়া অ্যালবাম  তার, ভালো লেগেছে যে-কারণে সেই বই দুটো/একটি, ঠিক সেই কারণেই ভালো লাগবার কথা আয়ওয়ার ডায়েরিটাও।

চক্রবর্তী, প্রিয় চাকা, বিনয় করি প্রিয়া…
আজ আর মনে করে উঠতে পারব না গানটা পুরোপুরি, মস্তিষ্কের ভেতর মনে-রাখারাখিক্রিয়ায়-নিয়োজিত কোষগুলো ক্রমে কর্মক্ষমতা হারাতেছে, কে সেই গানের পদকর্তা। গানের বাণী ও সুরের স্রষ্টা যিনি, গাইয়ে যিনি, আমরা তারই গলায় না-শুনলেও অন্য অনেকের কণ্ঠে ক্যাসেটে শুনেছি। ইউটিউবেও শুনি। ইয়াদ নাই কার গলায় বেশি ভাল্লাগে। যে-গানটা ইয়াদ হচ্ছে এ-মুহূর্তে, সেই গানের শুরুটা এমন : “বিচ্ছেদের অনলে / সদা অঙ্গ জ্বলে / বিনয় করি গো প্রিয়া / আয় আয় রে …”  — একই গীতের মুখপাত শুনে এগোনো গেলে এমন-সব লাইন-লতাপাতা আসে : “বন্ধু বন্ধু বলে / ঝাঁপ দেবো জলে / বিনয় করি গো প্রিয়া / আয় আয় রে” — শেষের পদাংশদ্বয় ফিরে ফিরে আসে গানজুড়ে — বিনয় করি গো প্রিয়া / আয় আয় রে — রিফ্রেইন হিশেবে। এই গানসূত্রে একটা ব্যক্তিগত স্মৃতি রিকালেক্ট করতে চলেছি আপনাদিগের ইজাজত নিয়ে। একপ্যারা জায়গা লাগবে, বেশিক্ষণ সময় নেব না, এরপরেই যাওয়া যাবে মূল প্রতিপাদ্যে।

একজন মধ্যবয়সী পুরুষ। একান্নবর্তী সংসারের সন্তানসন্ততি বড় করতে যেয়ে ব্যক্তিগত সাধাহ্লাদগুলো জলাঞ্জলি দিয়েছেন। কড়া মিজাজ, সংসারের সবার সঙ্গে একটা বানিয়ে-তোলা দূরত্ব গড়ে উঠেছে এই কড়া কঠিন মেজাজের সুবাদে, সন্তানসন্ততি ও সংসারের সকলে সেই পুরুষটাকে বাঘের মতন ভয় পায়, দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তিনিও হয়তো তা-ই চেয়েছেন, সংসারের স্বার্থে, উপভোগই করেন বলে মনে হয় এহেন সকলের সমঝে-চলা তারে। অ্যানিওয়ে। একদিন হঠাৎ জীবনের মাঝপথে সেই পুরুষটির স্ত্রী মারা যান। দীর্ঘদিনের সঙ্গী, একমাত্র নিকটতমা তার, পত্নীবিয়োগের পর দিশাহারা বোধ করেন তিনি। কিন্তু ব্যঘ্রস্বভাব সেই মিজাজি পুরুষের ভাবমূর্তি ভেঙে গেলে তো হবে না, তাই ঠিক বোঝা যায় না বাইরে থেকে যে পুরুষপ্রবর মচকাইলেন না ভাঙলেন। তবে একদিন ঠিকই বোঝা যায়, ধরা পড়ে ব্যাপারটা, এবং মৃত্যুপরবর্তী ক্রিয়াকলাপ সমাধার অব্যবহিত পরেই একদিন গভীর নিশীথে সেই ঘটনাটা জ্ঞাতিসূত্রে এই নিবন্ধকারের কর্ণগোচরীভূত হয়। ব্যাপারটা ঘটেছিল এ-ই যে, প্রেমাস্পদকে বিনয় করিয়া ডাকার এই মিনতিমূলক গান এবং তৎসঙ্গে আরেক মহাজন পদকর্তা শীতালং শাহের গান — “পিঞ্জিরা করিয়া গেলায় খালি রে / পিঞ্জিরা করিয়া গেলায় খালি / ওরে আমার যতনের পাখি / ও মন সুয়া রে / একবার পিঞ্জিরায় আও দেখি” — এই একজোড়া গান সেই মিজাজি বিপত্নীক পুরুষের ঘরে স্টেরিয়োপ্লেয়ারে ঘুরেফিরে বাজতে শোনা যায়। নিশীথগহনে। একদিন, দুইদিন, তিনদিন। গভীর রজনির সেই হাহাকার আপনাকে শুনতে হয় নাই বলে বেশ বাঁচিয়া গিয়াছেন আপনি। নয়তো থমকে যেত আপনার হুল্লোড়ে ইয়ার-বখশি জিন্দেগির বহুকিছুই। কিন্তু ভাবুন তো একবার, সেই বিপত্নীক মধ্যবয়স-অতিক্রান্ত পুরুষের একাকিত্বের দুর্বহ ভার! ক্যাসেটপ্লেয়ারখানা তো সন্তানসন্ততিদিগের দখলে, যেমন হয়ে থাকে ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে, এই ঘটনায় স্পৃষ্ট হয়ে সেই বিপত্নীক কড়া-মিজাজমর্জিসম্পন্ন পুরুষের সন্ততিরা রাত-গভীরের আগে স্টেরিয়োপ্লেয়ারখানা তাদের পিতা/পিতৃতুল্য পরিবারসঞ্চালক কর্তাব্যক্তিটির শিথানে রেখে আসে। এইভাবে বেশ দুনিয়াটা পাশ ফেরে, কঁকায়-ফোঁপায়, ফের জীবনে প্রবেশ করে বেভোলা-বিভোর জীবন।

ঘটনা হলো, একজোড়া এই গানের সুবাদে সেই রাশভারী ব্যঘ্রস্বভাব বিপত্নীক পুরুষ নতুন একটা আইডেন্টিটি নিয়া আবির্ভূত হইলেন তার সন্ততিদের সামনে, অরিয়েন্টেড হলেন প্রেমের লাগিয়া পীড়িত-পর্যুদস্ত এক অসহায় নিরবধি-বহমান সত্তা হিশেবে। এরপর তিনি ভুলিয়া গেছেন, হয়তো, অথবা শরীরস্থ মনে বা অন্য কোথাও রাখিয়া দিয়াছেন গোপনে সেই তার যতনের পাখিটিরে, সে-খবর আমরা রাখি না। রাখবার উপায়ও তো নাই। আমরা যার যার জিন্দেগি নিয়াই নির্ঘুম অনিবার, দোবারা না মিলেগি ইয়ার, জিন্দেগির ওয়ান-ওয়ে এই ট্র্যাভেল, বেখবর এ-দুনিয়ায় খবর রাখে কে-বা কার! কিন্তু যদি তিষ্ঠোই ক্ষণকাল, হেথা এই নিদয়া সায়রের অকূল অপার ভবধামে, এই বিপত্নীক সম্পর্কছুট পুরুষের অতিকায় একাকিত্বমহাজাগতিকতাটাকে যদি ছুঁতেই না-পারে একটাবার আপনার মহাবাজার-উল্টে-ফেলা লেখা, তাহলে মিছে এই বিফাই-বড়াই আপনার লেখাযাবতীয়ের। রকবাজ লেখাই লিখিয়া যান, কে তাতে বাগড়া দিচ্ছে আপনেরে, কিন্তু অন্তিমে হেরে যাচ্ছেন কি না বাউল কোনো পদকর্তা বা বিজয় সরকার কি শীতালং শা বা আবদুল করিমের কাছে, সেদিকপানেও দৃষ্টিপাত করুন আল্লার দোহাই! প্রাগাধুনিক-আধুনিক-উত্তরাধুনিক — পটপ্রেক্ষা যা-ই হোক, ক্রন্দন তো খণ্ডায় নাই হে! প্রকাশমাত্রা পাল্টাতে পারে, কান্নার কারণ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কান্না তো পুরানা দিনেরই, কান্না আবহমান, কান্নাই মৌলিক, কান্না আর হাহাকার, অরব অথবা সরব।

গল্প অবশ্য অন্য পদকর্তার, অন্য মহাজনের, গল্প বিনয়ের। গল্প বিনয় মজুমদারের। অথবা কে বলতে পারে হলফ করে যে, একই সেই বিজয় সরকার কি শীতালং শা বা আবদুল করিম নন গল্পের এই বিনয় মজুমদার? একই তো কান্না, একই হাহাকার, একই প্রেমের প্রবারণা পূর্ণিমা। আবার গল্পটা তো বিনয়েরও নয়, গল্পটা গায়ত্রীর, সরলার, প্রিয়া ও পরমার, প্রেমমন্ত্রের গল্প। শ্লোকের মতন সুন্দরের গল্প এইটি, নিরবধি নিরন্তিম, সুন্দরের মতন শ্লোকের গল্প। সমস্ত গল্পের গতরেই, জগতে এই এক ভেল্কি, থাকে প্রেমার্তি ও অনিবার্য বিচ্ছেদ। গায়ত্রী-বিনয় গল্পেও তা-ই। নির্ব্যাতিক্রম বিচ্ছেদেরই গল্প এইটি, কিংবা শ্বাসরোধী মিলনের কথা,  গল্পটা আগাগোড়া আমাদের জানা। তারপরও পুনরায়, একটু সংক্ষেপে, একবার শুনব ফের সেই গণিতের অবাক শূন্যের গান, মর্সিয়ামাতম তার। আর কে না জানে যে, প্রেমের গল্প যদি পাপাত্মাও ভনে, তো যে শোনে, সে পুণ্যবান অতিশয়। নিশ্চয়, নিশ্চয়।

এখন ঘটনা হলো, এই গল্প এমনই শ্বাসরোধী যে, গল্প শুনে মনে হবে, মানুষ তার চিবুকের কাছেও একা — আবুল হাসানের এই ভীষণ সত্য পঙক্তিধৃত একাকিত্বও ম্লান হয়ে যায় এর কাছে, একাকিতা ব্যাপারটাকেই নিছক রোম্যান্তিক মনে হবে গল্পটি শ্রবণোত্তর, একাকিতা ব্যাপারটাকে স্রেফ বিলাস মনে হবে কবিতাশহিদ বিনয়ের গল্পের পাশে, অথবা মনে হবে এ এক অন্য অতিজাগতিক একাকিতা, স্বনির্বাচিত একাকিতা, নাকি নিয়তিনির্দিষ্ট বিবিক্তি? কিন্তু গল্পপ্রহর তো ফুরায়া আসে হে! গল্পের বেলা যে তোমার বয়ে যায়… বয়ে যায়…! জারা ধিরে, জানেমন, একটু অ-ত্রস্ত প্রবেশিয়ো গল্পে, কেননা জীবন এক দ্রুতপঠনের পুস্তিকা বস্তুত, শুরু হইবামাত্তর আসিয়া যায় গল্পসমাপ্তি, জীবনাবসান, জীবনাবশেষ, কাজেই ধীরে প্রবেশ অভিপ্রেত, গল্পে এবং প্রেমে হুড়োহুড়ি নিন্দনীয় জানিবেন।

তাছাড়া গল্পের নায়ক বিনয়, প্রোট্যাগোনিস্ট বলে যারে, এমন ত্যাদড় যে, এমন মোচড় মারিয়া রাখিয়া গিয়াছে সে তার গল্পে, এমন এভার্লাস্ট ট্যুইস্ট, স্বহস্তে, স্বীয় জিন্দেগি দিয়ে, এই গল্পের শেষ পাওয়া ভার। শুরু যদি থাকে, তবে তো শেষও থাকবার কথা। আজ্ঞে, সেইটাই। কিন্তু দুনিয়ার গোয়ান্দাবৃত্তি দিয়া, হিন্দি স্যোপ-অপেরার জাসুসি দিয়া, ছানবিন দিয়া, বিনয়াখ্যানের শুরুবিন্দু বের করার ভরসা নাই, বা থাকলেও অল্প ও অনির্ভরযোগ্য অতি।

বিনয় স্কিৎসোফ্রেনিয়াক্রান্ত হয়ে পড়ে একদম অল্প বয়সে। এই গল্পের লিসেনার আমি-আপনি এখন এ-মুহূর্তে যে-বয়সে এসে পৌঁছেছি, এর কম-স্যে-কম বছর-দশ আগেই বিনয় চিকিৎসার অতীত অসুখের অধিকারে, বাংলাভাষায় এই অবস্থার ভালো নাম বদ্ধ-উন্মাদ। তবে এইসবের পেছনে গায়ত্রীর কোনো হাত ছিল না। গায়ত্রী নির্দোষ। চক্রবর্তী বিনয় নিজেই নিজ মনে, নিজের মুদ্রাদোষে, চাকার পরিধিদেশে ঘুরে ঘুরে চকোলেটের ন্যায় নিঃশেষে গলাধঃকরণ হলো বিনয়জীবন, অশেষ করে দিয়ে গেলেন দুঃখিনী বাংলা কবিতারে, এবং আমরা পেলাম এই এক উপসমাপ্তিবিহীন আদি-অন্ত-নির্ণয়-অসাধ্য গল্পের সুতো পুনরপি।

কিন্তু কোনোই কি হাত ছিল না, গায়ত্রীর, আখ্যান নিয়ন্ত্রণে একেবারেই কি নির্দোষ সেই মৃত্যুসৌন্দর্যশীলা শ্যামসমা জার্মান-ফরাশি-ইংরিজি-সংস্কৃতজ্ঞ দুনিয়াজয়ী বিদুষীটি? কোনোদিন তো মুখোমুখি কথাটিও হয়নিকো উহাদের পরস্পরের, চালাচালি হয়নি চির্কুট কি চিঠিচাপাটিও, সংশ্রব ছিল না কোনো অন্যের সনে একের — ইত্যাদি, জানি তো, বলবেন আপনি। কিন্তু গল্পের খাতিরে এই-সমস্ত হার্ড ফ্যাক্ট ভুলিয়া থাকা চাই। পূর্বশ্রুত গল্প পুনরায় শোনার সময় শুনিনিকো-পূর্বে-কভু মুখভঙ্গি করাটাই তো রুসম্। আর এই গল্প তো রূপকথাই। অপরূপকথা অফ অ্যা স্যুপার্ন্যাচারাল পোয়েট অ্যাপার্ট।

লেট্’স্ গেট ইন্টু …

কাম ব্যাক, ও হুইল্, ফিরিয়া আইসো, চক্র হে!
এক অপর কবির মুখ মনে পড়ে যাচ্ছে, এই গল্প শুনতে শুনতে, বিনয়ের বেশ অনেককাল পরের কবি তিনি, বিনয়ের অনুজ দশকের কবি, বাংলাদেশে আবির্ভূত কবি, মরেও গিয়েছেন অল্প বয়সে, বিনয়ের পরে জন্মেও মরেছেন তিনি বিনয়ের আগে, প্রেমে পড়েই মৃত্যু, অথবা পাগলামিতে। এ এক ফ্যাসাদ, সত্যি, কবির প্রেম ও পাগলামি পৃথক করা নামুমকিন প্রায়। প্রেম ও পাগলপনা আলগ করে দেখতে পারা মুশকিল নেহি নামুমকিন হ্যায় অ্যাট-লিস্ট কবির ক্ষেত্রে, প্রেমোন্মাদ-প্রেমোন্মাদিনীর ক্ষেত্রে, এবং অবভিয়াস্লি অ্যানোনিমাস ঈশ্বরের ক্ষেত্রে। প্রেম হইতে পাগলামো যুধা করে ফেললে যা থাকে তলানিতে পড়িয়া অবশেষ, উহার নাম সংসারধর্ম, সোয়ামি-ইসতিরি যুগলাভিনয়, বিবেকানন্দ-পরমহংসগিরি। কিন্তু গল্প তো ধর্মাধর্মোর্ধ্ব হোথা, পাগলামি প্লাস প্রেমোপাখ্যান, কাজেই বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতা আপাতত অপেক্ষাকামরায় নিরীহ বসিয়া থাকুন, চাহনি বিনিময় করিতে রহুন অপলক অধিচৈতন্যসম্ভূত, পরে কখনো কোনো গল্পে উনাদিগেরে ডেকে নেয়া যাবে।

যে-কবির মুখ উঁকি দিচ্ছে এইখানে, এই গল্পপথিমধ্যে, তিনি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তসলিমা নাসরিন, পরবর্তী দিনগুলোতে যিনি বাংলা লিখে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় বেশ নাম উড়িয়েছেন, হয়েছেন অন্যায়ভাবেই নিন্দিত ও দেশান্তরিত, সূচনাজীবনে ছিলেন রুদ্রপ্রণয়িনী ও ইমিডিয়েইট-আফটার রুদ্রপরিণীতা, তারপর ছাড়াছাড়ি, বিখ্যাত বিচ্ছেদ, প্রাগৈতিহাসিক ন্যাচারাল পরিণতি প্রেমের, তারপর রুদ্রপ্রস্থান, তসলিমার বহুকথিত অকপট মেমোরি রিকালেকশন ও সত্যিকারের সিফিলিস গল্পের বেস্টসেলিং ব্লকবাস্টার বই। কিন্তু এইসব কারণে এ-গল্পে রুদ্র উঁকি মারছেন মনে করা বারণ। জনপ্রিয় হয়েছিলেন রুদ্র কবিতা লিখে তার সময়ে, একাত্তরোত্তর পুনর্গঠন-যূথচারণাহ্বান তথা জাতিপ্রেম-কওমচেতনা তার কবিতার মুখ্য উপজীব্য হয়েছিল, এইসবও তো লাস্ট করে না কালের ক্রিকেটপিচে। প্রেম, ও অবধারিত পাগলামি, টিকিয়া যায়। একটা গান বেঁধেছিলেন রুদ্র, অসম্ভব অভাবিতপূর্ব প্রেমের সেই গান, রুদ্ররচনারাজি সমুদয় একত্র জড়ো করে একদিকে রেখে এই একটা গান অন্যদিকে ফেলে রাখলে এ-মরজগতের সমগ্র বস্তুপুঞ্জপর্বত ওই অন্যদিকের চুম্বকটানে হেলিয়া পড়িয়া মাথা ঝুঁকাইয়া রাখিবে। সেই গানটার কথা আর প্রেমিকজনেরে কি বলিব বুঝাইয়া, জানেন সর্বজনা, গাইছেন প্রত্যেকেই সেই বিচ্ছেদের পরমুহূর্ত হইতেই, নিজের নিজের বিচ্ছেদযাপনের প্রতিটি মুহূর্তে সেই বিচ্ছেদী, বিচ্ছেদ ছাড়া প্রেমের তো উড়াল নাই, বিহঙ্গের উড্ডয়ন তো প্রকৃত প্রস্তাবে সেই মিথুনরতা পাখিজোড়ের শায়কবেঁধার পর হইতেই শুরু, নইলে তো প্রকৃত সারস উড়তই না জিন্দেগিতে, কেলি করিয়া বেড়াইত পরস্পর শুধু। যুধা হইবার পরমুহূর্ত হইতেই ক্রৌঞ্চ তার যতনের ক্রৌঞ্চীর তরে কেবল হাহাকারিয়া বেড়ায়, আর গান গায়, একা একা, গান গায় ঘুরে ঘুরে, উড়ে উড়ে, রাশি রাশি শুভেচ্ছা ঝরায়, মিথুনরতা দিনগুলির স্মরণে স্তোত্র রচিয়া যায়, দিন ঘোরে দিনান্তরে তার প্রার্থনাগীতিকায় : “ভালো আছি ভালো থেকো / আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো / দিও তোমার মালাখানি / বাউলের এই মনটারে / আমার ভিতর ও বাহিরে অন্তরে-অন্তরে / আছো তুমি হৃদয় জুড়ে” … এ-ই তো, সমস্ত গল্পের ক্লাইম্যাক্স ও ক্যাথার্সিস, উজ্জ্বল উদ্ধার দুনিয়ার।

এমনিতে মনে করার কোনো কারণ নেই যে বিনয়ের কবিতাবলি গায়ত্রী শীর্ষক একটা ব্যক্তিনামপদশাসিত। মোটেও তা না। সাধারণত দুর্বল কবিতার লক্ষণ হিশেবে এইটা কমন দেখা যায়, প্রেমাস্পদের নাম লইয়া জপমালাকীর্তন। তবে এইটা আবার সবসময় ঠিকও নয় যে ব্যক্তিনামবিশেষ্য কবিতায় কীর্ণ হইলে সে-কবিতা দুর্বল। বনলতা বা বিয়াত্রিসে প্রমুখ স্মর্তব্য। জীবনানন্দ তো অনেক কবিতাই লিখিয়াছেন এই কায়দায়, একটাকেও তো দুর্বল-সবল দাগিয়া বিচার করা যাবে না। যা-ই-হোক, বিনয়ের কবিতায় এই তরিকা এস্তেমাল করতে দেখা যায় নাই, সম্ভবত একটিবারের জন্যও নয়। এখন, কথা হলো, গায়ত্রী তাহলে কেমন করিয়া আইডেন্টিফায়েড হইলেন। রহস্যময় সেই উৎসর্গ। অথবা তা না, আসলে রহস্যও ছিল না কিছুই, ক্লিয়ারকাট পূর্ণ নাম : গায়ত্রী চক্রবর্তী। তিন-তিনটা বইয়ের উৎসর্জন অভিন্ন একই ব্যক্তি। কে সে? লাগাও খোঁজ। পাগলা নানা সময়ে এ-সম্পর্কে নানা কথা বললেও ব্যক্তি গায়ত্রীকে যে হেরিতেন দূর হইতে এ-বিষয়টি তিনি স্বীকারিয়া গিয়াছেন গোড়া থেকেই।

কিন্তু তৎসত্ত্বেও বিনয়জীবন ও গায়ত্রীজীবন — উভয়ের উৎস-প্রবাহ-মোহানা কিচ্ছুটির কোনো যোগ কোথাও তো দেখা যায় নাই, একজন যাপন করিয়া গেছেন প্রাকৃত ও ব্রাত্য জীবন, অন্যে এক বিদ্যাভিজাত্যমণ্ডিত সফলোজ্জ্বল জীবন করিয়া যাইছেন যাপন আজোবধি — উভয়ের সেই-অর্থে দেখাদেখি বা কথা-বলাবলি কোথাও কদাপি হয় নাই। কিন্তু না, এদ্দিন ভুল ভাবতাম, গায়ত্রী ঘুণাক্ষরে এসবের কিচ্ছুটি জানতেন না — এইটা ভুল। অন্তত শঙ্খ ঘোষের ১৯৬৮ সালের ডায়েরিভুক্তি থেকে এইটুকু সপ্রমাণ অনুমেয় যে, শ্রীমতী তাহা সর্বৈব জানিতেন এবং ঘুণাক্ষরের চেয়ে বেশিভাবেই জানিতেন এবং বেশ ভালো অক্ষরেই জানিতেন ঘটনাবলির তাৎপর্য ও পরিণতি সমেত। শঙ্খদিনপত্রীর ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখের প্রাগুক্ত ভুক্তিটি পুনর্দ্রষ্টব্য। তবে জানিলেও কি-বা করার ছিল গায়ত্রীর পক্ষে, কি-বা হতো অনেককিছু করাকরির পরের কন্সিক্যুয়েন্সেস, সেসব আলাদা আলাপ। মজুমদার বিনয়ের জবান হইতে চক্রবর্তী গায়ত্রীর সনে তার আশনাই সম্পর্কিত একটা সংক্ষিপ্ত উইটনেস-স্টেইটমেন্ট শ্রবণ করা যাক এইবার।

কবিতা লিখেছি কবে, দুজনে চকিত চেতনায় — এইটা বিনয়ের কবিতার লাইন, সকলেই জানে। একটি ইন্টার্ভিয়্যুতে বিনয় জানাচ্ছেন : “আমি যখন ইডেন হিন্দু হোস্টেলে ছিলাম তখন গায়ত্রীর বাবা ছিলেন স্যুপারিন্টেন্ডেন্ট, জনার্দ্দন চক্রবর্তী, দাদার নাম প্রসূন চক্রবর্তী। তখন ওর বয়স বছর ১২। তখন থেকে দেখেছি। পুরোহিতের মেয়ে তো। বেশি কথাবার্তা হয়নি। আলাপ-আলোচনা হতো। কবিতা নিয়ে। কবিতা লিখেছি কবে, দুজনে চকিত চেতনায় — এবার বুঝলে তো! তারপর ভালো ছাত্রী হওয়ার ফলে সহকারী অধ্যাপক হিশেবে ২৩ বছর বয়সে আমেরিকায় চলে গেল। আমি তিনটি বই তাকে উৎসর্গ করেছি।”

ফিরে এসো, চাকা  থেকেই বিনয়, তথা গায়ত্রী, তথা ঈশ্বরী, লোকালয় শ্লোকাচ্ছন্ন করিয়া রাখতে শুরু করেন। পয়লা-পয়লা পাঠকের নানাবিধ অস্বস্তির মধ্যে একটি ছিল, চাকা সম্বোধন করে এ কেমন কবিতাবইয়ের নাম বাপু! এ কী ধারা পাগলামির ছিরি গা! আইজ্ঞা। আস্তে আস্তে এই কিম্ভূত সম্বোধন হইয়া উঠিল বাংলা কবিতার মধুরতমা সাধু ও সাধ্বী সম্ভাষণ। বাংলা সাহিত্যে একচ্ছত্র ছড়ি-ঘোরানো বনলতা সেনের দর্পচূর্ণকারিণী সিনোরিতা এই চাকা। শোনা যাক বিনয়জবান : “আমার এক বন্ধু ছিল, সরোজ চক্রবর্তী। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ শিবপুরে আমার সঙ্গে পড়ত। এক-বছর পড়ার পর তার বাবা তাকে বিলেতে, লিডসে পাঠিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। কিন্তু সেখানেও পড়া শেষ না-করেই বছর দুই পরে ফিরে আসে। তারপর চৌরঙ্গির কাছে মেটাল বক্স  কোম্প্যানিতে চাকরি নেয়। একদিন তার অফিসে গিয়ে দেখি দরজার বাইরে নেমপ্লেটে লেখা ‘সরোজ চাক’। সেখান থেকেই, মানে ‘চাক’-এর স্ত্রীলিঙ্গ করে দিলুম ‘চাকা’। ফিরে এসো, চাকা  বইটি পুরোটাই গায়ত্রী চক্রবর্তীকে আমার বক্তব্য।”

গল্পের এই পর্বের যতি এখানেই আপাতত। পর্বান্তরণপূর্ব সমাপ্তিদৃশ্যের গানটা : ‘আইসো হে প্রাণনাথ আইসো, আইসো হে প্রাণনাথ আইসো … আইসো ও নাথবতী আইসো, এ-অনাথবতের ক্রোড়ে আইসো … চক্র ও চাকা ফিরা আইসো, বিনয়বিনোদগৃহে আইসো …

গায়ত্রী, ঈশ্বরী, বিনয়, নিয়তি নিরতিশয়
এত এত ডাকাডাকি, এত অনুনয় বিনয়ের, এত শিল্পসুষম সুরে মিনতিগীতিকা, গায়ত্রী কি সেই মন্ত্রে একটিবারের তরে থমকিয়া দাঁড়ায়েছিল? শুধুই কি “পলকের পরে থাকে বুক ভরে চিরজনমের বেদনা / … তারই লাগি কেন এত সাধাসাধি / অবুঝ আঁধারে কেন মরি কাঁদি / দূর হতে এসে কেঁদে যাই শেষে / বহিয়া বিফল বাসনা” — আহা! গায়ত্রী কি বুঝিল মম মন? মনে কি রাখিল মোরে — একটুকু করিল কি করুণা? ঠাকুর, ওগো, অনাথবতের অয়ি নাথসম! “মম মন বুঝে দেখো মনে মনে / মনে রেখো / কোরো করুণা” … না, এতই হ্যাংলা বিনয় হয় নাই বটে। এতটা বালকপনা তারে করিতে হয়নিকো — না কবিতায়, না যাপনে। এরচেয়ে বরং হয়েছে সে বদ্ধ-উন্মাদ। সোমত্ত ব্যক্তিমানুষের পক্ষে, এই মিনিয়ন-মেইকিং কর্পোরেটোক্রেইসিতে, এছাড়া আর-কিছু হইবার কথাও তো না। কাজেই, নিজেই বলিছে বিনয়, “হাসির মতন তুমি মিলিয়ে গিয়েছ সিন্ধুপারে। / এখন অপেক্ষা করি, বালিকাকে বিদায় দেবার / বহু পরে পুনরায় দর্শনের অপেক্ষার মতো — / হয়তো সর্বস্ব তাঁর ভরে গেছে চমকে-চমকে। / অভিভূত প্রত্যাশায় এরূপ বিরহব্যথা ভালো।”

তথাপিও অনুনয় এত, অঘ্রানের অনুভূতিমালা পাতার-পর-পাতা, বিস্তর শীতকাল ও সকল বকুলফুল — কোনো-এক চক্র সমীপেষু; হয়তো-বা এই চক্র জনার্দ্দনতনয়া, বা আরেকটু হয়তো কলেবর-বিস্তৃত সেই উদ্দিষ্ট চক্র, হয়তো গোটা বিশ্বটাই পরিসর সেই চক্রের। নমঃশূদ্র মজুমদার বিনয় ঈশ্বর ও একইসঙ্গে সেবায়েত সেই চাকার, আর ভাইস-ভার্সা, চাকাটাই ঈশ্বরী তার। বিনয়কে চালায় সে যে, বিশ্ব চালায়, একমন্ত্রে ফানাফিল্লা বাবু বিনয় মজুমদার। এতই হিম্মৎ ধরে সেই চক্রখানি! এতই কী গরিমাময়ী সেই চাকা? আলবৎ, অফ-কোর্স, চিরকাল তা-ই। কেননা, শাশ্বত ওড়ে ব্রহ্মাণ্ডপথে-মহাকাশে-দূর্বাঘাসে সেই লোকায়ত গান : “রাধা তো সামান্য নয় গো / শ্যামের মনজোড়া” … আহা! শ্যামের মন যাহা জুড়িয়া রয়, সে রাধিকা হোক বা ললিতে, ক্ষেত্রফলে-আয়তনে-পরিসীমাঙ্কে তারে মেপে ওঠা যায়? এ-ই হলো গণিত বাংলার, সহুজে দর্শন, শাস্তর সহজিয়া। বাংলার প্রেমের নমুনা।

ডাকাডাকিই তো অসার এই দুনিয়ার সার, সাবস্ট্যান্স, ডাকাডাকি মাত্রই তো ‘প্রথম গান’ — ‘দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ — এই বিকল্প উত্তর দিয়ে গেল মিলিয়ে কেউ উত্থিত সন্ধ্যার বিলীয়মান অন্ধকারে; অ্যানিওয়ে, ভাববাদী সিল ছাপ্পিয়া তারে খারিজ করা যায়। কিন্তু এই ডাকাডাকির তাতে সুরাহা তো হয় না। নাকি ‘ইহাদেরি কানে’ — সেই জীবনানন্দের কবিতায় — ফের একবার এর মীমাংসা তালাশ করে দেখা হবে? সেই যে, “একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে — একবার বেদনার পানে / অনেক কবিতা লিখে চলে গেল যুবকের দল; / পৃথিবীর পথে পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে / শুনিল আধেক কথা; — এইসব বধির নিশ্চল / সোনার পিত্তলমূর্তি : তবু, আহা, ইহাদেরি কানে / অনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চলে গেল যুবকের দল; / একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে — একবার বেদনার পানে।” এ-ই তো, ধুলো আর কাদা, হায়, এই ভালোবাসা! ‘হায় হাসি, হায় দেবদারু’ — ‘তবুও কেন যে আজো’ — মনে পড়ে যেতেও পারে কারো যে, বিনয়ের অভিষেক স্তোত্রপুস্তিকার নাম ‘নক্ষত্রের আলোয়’ — সেসব অবশ্য অত বড় কিছু নয়।

কিন্তু চাকা কি ফেরাল মুখ একবারটিও চক্রানুবর্তী বিনয়ের পানে? — কে এমন জিজ্ঞাসে ফের পুনঃপুনরপি! বিনয়ের উত্তর : “আমি তো বলছি, সে কি আর ফিরে এল? প্রেসিডেন্সি কলেজের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে বিএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে চলে গেল আমেরিকায়। আমেরিকায় গিয়ে এক কৃষ্ণাঙ্গকে বিয়ে করল। ছেলেপুলে হয়েছে। এখন একদম বুড়ি হয়ে গেছে। চুল কেটেছে। আমার চুল দেখছ — এর চেয়েও ছোট, কদমফুলের মতো।” মনে পড়ে যাবে আমাদের যে, মৃত্যুর অল্পকাল আগে একটি-কোনো ছোটকাগজে অদ্ভুত সুস্থ ও করুণ বিপন্নকর একটা কবিতা ছাপা হয়েছিল বিনয়ের, সেই কবিতায় এই কদমছাট চুল ও অন্যান্য ইশারায় গায়ত্রী-উপস্থিতি সুস্পষ্ট। বলতে গেলে এত স্পষ্টভাবে কবিতায় গায়ত্রীবিচ্ছুরণ এ-ই প্রথম ও এ-ই শেষ। কবিতাটা সাঁটা গেলে বেশ হতো, কখনো খুঁজে পেলে এই গল্পের শেষাংশে সেইটা নিশ্চয় পারা যাবে।

কিন্তু দেখা কি হয় নাই একবারও, ১৯৩৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত শরীরী জীবনকালে, এই এতগুলো বছরে? “না, না। খবরের কাগজে ছবি দিয়েছিল না? দেখেছি …”, — বিনয়ের অকপট উত্তর।

চাকা আবর্তনশীলা
“এ এমন পরিচয় — অনুমতি প্রার্থনা, সবিনয় নিবেদন, কিছুই যে লাগে না / নিজেরই অজান্তে, হৃদয়ের অনন্তে / কিছু কথা ভালো লাগা / করে যাই রচনা / এ এমন বিনিময়, কিছু শুভ সূচনা / এ এমন গীতিময়” … ইত্যাদি; — এ হলো সোলস্  ব্যান্ডের একটা গান, ভোক্যাল ছিলেন তখন-খুব-জনপ্রিয় তপন চৌধুরী, ইদানীং-খুব-জনপ্রিয় অর্ণবের উনি কাকা, আশির দশকে বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে এইটি হিউজ-হিট একটা নাম্বার। অবশ্য বাংলাদেশে ব্যান্ডমিউজিকের তখন অনেকটা শাঁখের-করাত অধ্যায়। একদিকে তরুণদের পরানভোমর এই মিউজিকেই গিট্টু বাঁধা, আর-দিকে একটু উর্ধ্ববয়সী সংস্কৃতিচিন্তায়-নিন্দহারা সামাজিক-পারিবারিক-প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকদিগের তুচ্ছতাচ্ছিল্যকরণ, অধিকাংশ সময় এই মিউজিক অপসংস্কৃতি  হিশেবে ধিক্কৃত হইত উনাদিগের জবানে-জেশ্চারে। এই সিচ্যুয়েশনে ব্যান্ডগানের হিট-ফ্লপ পরিমাপনের বেঞ্চমার্ক নিয়া ভালো বলতে পারবেন অডিয়োইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তখনকার সাউন্ডটেকসংগীতাসারগাম  প্রভৃতি ঢাকার নবাবপুর-পটুয়াটুলিভিত্তিক বিজনেস-অ্যাক্টরবৃন্দ। তবে এই গল্পে সেসব অপ্রাসঙ্গিক।

কথা হলো, পরিচয়টা জাস্ট লাইক দ্যাট — পার্মিশন-অনুমতি-নিবেদনবিহীন, অনুমোদন-অ্যাক্নোলেজমেন্টের তোয়াক্কা না-করা, লেজিটিমেসির পরোয়া ছাড়া। ক্লিশে শোনালেও পরিচয় চিরকেলে। যেসব শ্লোক রচনা করে চলেছিলেন প্রকৌশলী বিনয়, দিবারাতি খাতার পাতায়, সেসব বোঝার মতন মনের বাহক সমকালে সেই একজনকেই মনে হয়েছিল তার। কেননা গায়ত্রী নিজেই তো মন্ত্র, গায়ত্রীমন্ত্র, সায়ংকালীন, আভিধানিক অর্থে, আবয়বিক অর্থেও। মুহতারিমার অনিন্দ্য অবয়ব, শরীরী বিভা তার, মেধাবিনী মুখ ও মনীষা, আর তার শ্রাবণস্নিগ্ধ গমনাগমন — তৎকালে এইসব তো সর্বজনধন্যই ছিল। বটে। এই একজনকেই বিনয়ের অতএব মনে হয়েছিল শ্লোক অর্পণের যোগ্য। কথাটা বলেওছিলেন কোথাও, কোনো কাগজে, কথাগুলোও তো সূত্রছাড়া পাগলের। একেক সময় একেক কথা। কিন্তু প্রলাপ নয়, এখন মনে হয়, এইসব আপাত-পারম্পর্যছুট কথাগুলোর ভেতরেই কীর্ণ গণিতের এই শূন্যটার মুখ, তনুমন, সর্বস্ব।

তো, চক্রবর্তীজাতিকার কোনো হাত ছিল কি ছিল না এই এতসব লঙ্কাকাণ্ডে — ফায়সালা আরেকটু পরে হোক। অথবা আদৌ করবার ছিল কি না কিছু, কি কি ছিল করবার, হস্তক্ষেপের অপশনগুলো কি কি ছিল গায়ত্রীর কোর্টে — এই-সমুদয় নিয়াও পরে ভাবা যাবে খন। শুধু শোনা যাক এইবেলা পাগলের স্বর : “আমার জীবনও উদ্ভট হয়ে গেল ফিরে এসো, চাকা  লেখার পর থেকে।” সারাজীবনে প্রায় ১৫ রকমের কবিতা লিখেছেন — বলেছেন আলাপচারিতায়, মৃত্যুর বছর-পাঁচ আগে, এর মধ্যে এই ফিরে এসো, চাকা  পর্যায়ের কবিতাগুলোই বিনয়কে তৃপ্ত করেছে বেশি। বলেছেন তিনি। ওয়েল, দেন্, হোয়াট অ্যাবাউট ঈশ্বরী? “ঈশ্বরের বউয়ের নাম ঈশ্বরী। সে তো বইতে ছাপাই আছে — ঈশ্বরীরে জিজ্ঞাসিল ঈশ্বর পাটানি / একা দেখি কুলবধূ কে বলো আপনি — এই বলে তো ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর কবিতা লিখেছেন। পলাশীর যুদ্ধের ৫০ বছর আগে। এখনো ক্লাস টেনে-ইন্টারমিডিয়েটে পড়ায়। আচ্ছা। সেই ঈশ্বরী আজো আছে কি না আমার জানা নেই। তবে আছে — সেই ধারণা নিয়েই লিখেছি।”

টুকে রেখে দেয়া যাক শব্দটা, ধারণা, আপাতত। বলা বাহুল্য হলেও বলে সেইফ সাইডে যাব, উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি বিনয়ের স্বর। কথাগুলি, নিবন্ধে উদ্ধৃত কবির কথাগুলি, বিনয়পাঠকের প্রায় সকলের কাছে এত পরিচিত যে এগুলির সূত্রোল্লেখ বাহুল্য। তথ্য ধরে ঢুন্ডলে সূত্র অল্পায়াস পাওয়া যায়।

 

গাণিতিকতা, চাকা, ধারণা, আন্দাজ, কল্পনাসারবত্তা ও শ্রীমদ্ভগবতগীতা
আগে যে-কবিতাটার ভাবোল্লেখ করেছিলাম পূর্বাংশে, একটা সাক্ষাৎকারের অংশত উদ্ধৃতি নিয়েছিলাম যেখানে চাকার সঙ্গে দেখা হয়েছে কি না বাকি জীবনে, এমন প্রশ্নকারীকে বিনয় ত্রস্ত উত্তর দিয়েছিলেন, “না, না। খবরের কাগজে ছবি দিয়েছিল না? দেখেছি …”, সেই বিনয় মৃত্যুর কিছুকাল আগে এই কবিতাটি লিখেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের একটা পাক্ষিক পত্রিকায় সেই কবিতা ছাপা হলে টের পেয়েছিলাম এ হচ্ছে এক গ্রেইট কবির বিদায়ভাষণ। অথবা, তা নয়। বিনয়ের ফিকশনের অভিপ্রেত সমাপয়েৎ। কবিতাটা পাওয়া গেল বলে একবার পড়ে নেবার পরে হবে বাকি কথা। আখ্যানে এই একটাবারই রিসাইট করব কবিতা। আস্ত কবিতাটা।

আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো।
তোমার গায়ের রঙ এখনো আগের মতো, তবে
তুমি আর হিন্দু নেই, খৃস্টান হয়েছ।
তুমি আর আমি কিন্তু দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছি।
আমার মাথার চুল যেরকম ছোট করে ছেঁটেছি এখন
তোমার মাথার চুলও সেইরূপ ছোট করে ছাঁটা,
ছবিতে দেখেছি আমি দৈনিক পত্রিকাতেই; যখন দুজনে
যুবতী ও যুবক ছিলাম
তখন কি জানতাম বুড়ো হয়ে যাব?
আশা করি বর্তমানে তোমার সন্তান নাতি ইত্যাদি হয়েছে।
আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,
তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে,
চিঠি লিখব না।
আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।
[আমরা দুজনে মিলে / বিনয় মজুমদার]

শুধু শুধু ধারণায় কী আর এমন কবিতা হয়? কেবলই গাণিতিকতায় কী আর এমন লেখা বাইরয়? এ কী ইম্যাজিন্যাশনের উৎসার শুধু? ‘তুমি সমস্ত জুড়িয়া রহিয়াছ, সুতরাং তুমিই সমস্ত।’ শ্রীমদ্ভগবতগীতায় আছে এমন অর্থের একটা শ্লোক। কতটা ব্যাপ্ত হয়া থাকলে পরে একটা সেন্টার ইমেইজ কবিজীবনের অন্তিমেও পুনরায় ফেরে, এমনভাবে, এত ক্ষয় ম্যাডনেস অবনমনের পরেও!

হয়তো বলা হবে এ এলো-মস্তিষ্কের হ্যালুসিন্যাশন শুধু। তবু। হয়তো প্রমাণ দাখিল করা হবে বাস্তবের চাকার সঙ্গে এ-জীবনে কবির বার-দুয়েকের সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এর বেশি কিছুই ছিল না। যা আছে দেখা যায় তা সবই কবির কল্পনা। তা সত্ত্বেও। তবু। বলা হবে এক্স্যাক্ট উনিশশচৌষট্টির পর থেকে বিনয়ের গায়ত্রীবন্দনায় আর্ট সেভাবে নাই যতটা আছে ফেটিশ। তবুও। মন মানে না।

আর এই কবিতাটি যেন চক্রবর্তী বিনয়ের সারাজীবনের সমস্তকিছুর পিছনের নিয়ন্তা চাকাধারণার গোটা আবয়বিক উপস্থাপন। সমস্ত দিনের শেষে একটা আদ্যোপান্ত উন্মাদ জীবনের অন্তিমে এসে এই সিম্পল কবিতায় চাকার সঙ্গে কবির অমরলোকে একত্রবাস কনফার্ম হয়। ষাইটের দশকের গঙ্গোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায় আর বন্দ্যোপাধ্যায় মুখোপাধ্যায় টাইটেলের কবিভিড়ে ম্যাডম্যান মজুমদার পেয়ে গেল অমরলোকের ভিসা! যাবজ্জীবনের যাতনার বিনিময়ে এইটুকু শতভিষা। বাংলা কবিতায় একটা আখ্যানের দিশা।

আপাতত শান্তিকল্যাণ
রচনাটা আগায় নাই আর। দরকারও হয় না আর আগাবার। এইটা পার্ট বাই পার্ট উপশিরোনাম দিয়া পাব্লিক নোটে লেখা, সামাজিক মিডিয়ায়, আজ থেকে তেরোচোদ্দ বছরেরও আগে। এইটা ফেইসবুকে শেয়ার করা হয়েছিল জুন-জুলাই দ্বিসহস্রচৌদ্দয়। প্যান্ডেমিকের সময় এইটা ‘কালক্রম’ নামে একটা সাইটে প্রকাশ করেছিলেন খুর্শিদ রাজীব। তখনও ভূমিকাটা আর কবিতাটা না-পাওয়ায় ‘গাণিতিকতা, চাকা, ধারণা, আন্দাজ, কল্পনাসারবত্তা ও শ্রীমদ্ভগবতগীতা’ পার্টটা ড্রাফট করা যায় নাই। ঠিক জুন-জুলাই দ্বিসহস্রছাব্বিশে ব্যাপারটা ডান ডিক্লেয়ার করা গেল, যখন, ফর দ্য রেকর্ড, সম্পূর্ণ অবিদ্যায়তনিক কারণে ‘ক্যান দ্য সাবোল্টার্ন স্পিক’ তথা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বাংলাদেশের রিলস রিয়্যালিটিতে ব্যাপক উচ্চারিত কয়েকটা জার্গনিক সাউন্ড মাত্র। স্যুডোফিকশন্যাল এই নিবন্ধাখ্যানের জন্ম ও বিকাশ সাধিত হয়েছে এসবের উদ্ভবের অনেক অনেক কাল আগে। সেসবই ছিল কবি ও কবিতার অনুরাগে। এইখানেই বিনয় মজুমদার তস্য এক নমঃশূদ্র তথা সাবোল্টার্ন জাগে। অ্যাআইলিপ্ত অনিঃশেষ অ্যালগরিদমের দুনিয়ায় ক্রিয়েটিভ লেখকেরা কা কা রবে রঁদেভ্যু উথলায় আর কাঠ খায় আংরা হাগে। এই বৃষ্টিবিপুল জুলাই দ্বিসহস্রছাব্বিশে তেমাথার মোড়ে দেখি বৃষ্টির বেজায় বন্দনায় মেতেছে একদল খলবল স্কাম্ব্যাগে। এর উল্টাপাশে একদল উদলাগাত্র ভোম্বলে চেল্লায় আবহমান জুলাই মাসে বেফজুল কোনোই বৃষ্টিপাত হয় নাই বলে। এইসবের মাঝখান দিয়ে এই সময় ফার্স্ট অফ জুলাই থেকে লাস্ট অফ অগস্ট পর্যন্ত উনাইয়া উনাইয়া বারোমাসি বৃষ্টি হয় এতদঅঞ্চলে। এই কথায় কার্সার উঠিয়ে নেব, এন্টার ফলে।

জাহেদ আহমদ জুলাই দ্বিতীয় দুইহাজারছাব্বিশ


জাহেদ আহমদ রচনারাশি 

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you