বাজারের নাম অষ্টধার বাজার। আমরা যখন আগে ভ্যানভ্রমণে যেতাম তখন এই বাজারে কয়েকবার যাওয়া হইছে আমার। লাস্ট ২০১৫ সালে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল অনেকেই। বাজারের একটু সামনে গিয়ে দেখতে পেলাম—একটা বড় গাছের নিচে দুধের বাজার। জোয়ান বুড়া যুবক সবাই বসে আছে দুধ নিয়ে। দুধের সামনে মাছিদের অদ্ভুত বসে থাকা। যেন মাছিরা দুধের অভ্যন্তর পড়ে নিতে দুধের দুয়ারে লেপে দিচ্ছে গুণাহসকল। মাছিরা গন্ধের মাধ্যমে দূর থেকেই দুধের উপস্থিতি টের পায় কেমনে? আগ্রহ হয়। কোথায় থেকে প্রবাহিত হয়ে নীল মাছির দল আসছে। যেখানে পাশের হোটেলের গরম আলুর দমের ভেতর এসে বাতাস ছন্দ হারিয়ে ফেলছে। আমার কাছে মনে হলো—বাতাস তো হরিদাসের মতো, ডান বা বাম যে-কোনো কানে একটা বিড়ি গুঁজে বেরিয়ে পড়তে পারে অবলীলায়। তার আবার ছন্দ কি? ছুরির মতো ঠোঁট বেরিয়ে থাকে বাতাসেরও। তবে এখানে যে-মাছিগুলো বসে আছে তারা নিশ্চয়ই গৃহমাছি নয়।
মানুষের আকুতি দেখছি—মানুষের ভিড়েও মানুষ কীভাবে দীর্ঘশ্বাস হয়ে উঠছে। আর আমি ভাবছি—মানুষের এই অপূর্ণতার দুটি চোখ। জীবনের প্রতি সংবেদ। পুরনো পোস্টঅফিসের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কিছু সর্বজয়া। অথবা বাগান—ক্রমশ হয়ে উঠছে যে ফুল। যেখানে ভবনসমূহের সকল নন্দন আমাদের নীরবতার বাইনারিতে।
০২.
বাজারের এক মাথায় এসে দেখতে পেলাম—কিছু মানুষ কানের লতিতে চুন লাগিয়ে ঘুরছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল। যেন একটা আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়েছে এই মানুষগুলো। কারো এক কানে আবার কারো দুই কানেই চুন লাগানো আছে। যা দেখতে ‘ইয়ার-স্টেলাই’-র মতো। ঐতিহাসিকদের মতে, কানের লতি ছিদ্র করে অলঙ্কার পরার উদ্দেশ্য কেবল সাজসজ্জা নয়, বরং অশুভ আত্মা থেকে শরীরকে রক্ষা করাও ছিল। আমার কৌতূহল থেকে একজনকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম—আচ্ছা, আপনারা কানে চুন লাগিয়েছেন কেন? মানুষটা তখন উত্তরে বলল—এখানে সাতকামড়ি পোকা আছে প্রতিটা গাছে গাছে। এই কীটপোকারা যখন গাছ থেকে উড়ে এসে গায়ে বসে, তখন কামড় দেয়। আর একবার কামড় দিলে ওই জায়গাটায় ভীষণ চুলকায়। লালচে হয়ে ফুলে যায়। তাই পোকাদের কামড় থেকে বাঁচার জন্যে কানের লতিতে চুন লাগিয়ে বাজারে আসি।

গাছগুলো দেখতে অতি প্রাচীন। গাছে গাছে এখনো হোঁচট খায় সূর্যের সোনালি বিচ্ছুরণ। বিকেলের পশ্চিম আকাশ, যেন সাজানো লোহিতক্ষেত্র সুশোভিত বিংশতি যুগের। ভাবি, আমাদের আরো বিশাল আকাশ। কুমোরপাড়ার মাটির ওপর পা রেখে যে-আকাশটা ঘুমায়।
০৩.
ক্লান্ত লাগছে ভীষণ। তবুও হাঁটছি, থেমে যাচ্ছে কণ্ঠায় ঠেকানো কথারাও। জানি, এই দেখার ভেতর দিয়ে বুকের সবুজ গুঙিয়ে উঠবে আবার মরে যাবে শুকিয়ে আমার কবিতায়। একটা বিশাল বটগাছের নিচে বসে আছেন একজন নরসুন্দর। নাম তার দেবেন বিশ্বাস। তার সাথে আছে ছোট একটা কাঠের বাকশ। বাকশের ভেতর তিনি রাখেন কাঁচি, ক্ষুর, চিরুনি ও সাবান। শীতল ছায়ায় টুলে বসেই এই কাজ করে থাকেন তিনি। তার গলার বলিরেখা জুড়ে ঘাম কভু হয় কোমল। যখন তুলসীর মালা আর ঘাম একাকার করে—আনন্দ রয়ে যায় চোখের পাতায়। তার সেই চোখের ভাষা। ভাষার চোখ। আমি পড়ে এসেছিলাম সেইদিন।
সেইদিন বাজারের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়েছিল আয়না আর আয়না হয়েছিল পাখি। শুধুমাত্র আশ্চর্য চেয়ে থাকতে পারা—দেবেন বিশ্বাসের সহচরী আলোছায়ার ভেতর।
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- ছায়ানৈকট্যে বসে থাকেন একজন দেবেন বিশ্বাস || শুভ্র সরকার - June 18, 2026
- আবার সন্ধ্যায় ভোলাভুলির রোদ নামুক || শুভ্র সরকার - June 10, 2026
- নিঃশব্দে পাহারা দেয় কেউ আশ্চর্য জীবন || শুভ্র সরকার - June 3, 2026

COMMENTS