
০৯.
কয়েকদিন ধরেই ফেসবুকে দেখছিলাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার লাইফ সাপোর্টে আছেন। সংবাদ জেনে বিমূঢ় হয়ে বসে থেকেছি। আর কয়েকজন এত ঘনঘন আপডেট দিচ্ছিলেন, আমি শঙ্কিত হচ্ছিলাম। কী দরকার এত বিস্তারিত জানানোর? সকলেই কী স্যারের বন্ধু? শত্রু কেউ নয়? স্যারের অসুস্থতার সংবাদ এত সরবে প্রচার করার কী দরকার? মনের ভিতর কু ডেকে যাচ্ছিল অহর্নিশ! এবং এই মনের কু সত্যি হয়ে উঠবে ভাবি নাই আমি। আমার ভাবাভাবিতে এই জগতের কী যায় আসে?
কিন্ত সত্যসত্যই স্যার উনার গল্পের মতোই মনে দাগ কেটে হারিয়ে গেলেন।
স্যার, আপনার কাছে আমার অনেক ঋণ রয়ে গেল। ইহজীবনে তার কিয়দংশও শোধ করার স্কোপ পেলাম না!
বা/এ থেকে যখন সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার পাই, স্যার আমাকে বললেন—“পাপড়ি, তোমার চাইতে যোগ্য আর কাউকে পেলাম না। তাই তোমার নাম নমিনেট করেছি। হাবিবুল্লাহ সিরাজীও একমত হলেন আমার সঙ্গে।”
আমি স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। সার্ক লিটফেস্টে দিল্লিতে বা লাখনৌতেও স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করে মঞ্চে উঠেছি।
স্যারের মতো এ-রকম নিপাট ভদ্রলোক আমি খুব কমই পেয়েছি। স্যারের চোখেমুখে থাকত সরল অভিব্যক্তি। থকথকে লোভ আর হিপোক্রেসি দেখতে পাইনি কোনোদিনই।
ক্যানাডার লন্ডন সিটিতে বোবা চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি গাছেরা কেমন মৃতবৎ হয়ে উঠছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে সবুজ। কমলা ছোপে ছেয়ে যাচ্ছে বনভূমি। ঠিক আমাদের বাংলাদেশের মতো। সবুজ মানুষেরা ঝরতে ঝরতে ফুরিয়ে যাচ্ছে। ধূসর হয়ে উঠছে আমাদের শিল্পসাহিত্যের অঙ্গন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একজন যথার্থ শিক্ষিত ও স্মার্ট লেখক ছিলেন। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত উনার বক্তব্য। চলনবলন এবং সিদ্ধান্ত।
মনে পড়ছে প্রতিবার বা/এ পুরস্কার ঘোষণার পর উনি আমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। একবার আমি হাসতে হাসতে স্যারের সামনে গিয়ে বললাম—স্যার, পালাচ্ছেন কেন? আমার কোনো দল নেই, তাই আমি কোনোদিন কোনো পুরস্কার পাবো না এটা আমি নিশ্চিত জানি।
স্যার হা হা করে উঠলেন—আরেহ না না, আমি তো সে-রকম কিছু বলিনি।
একজন সরল মানুষের চোখেমুখে থাকে অন্যরকম আলো, স্যারের তা-ই ছিল। যে-আলোতে ভরসা করা যায়। আমি অকপটে অনেক কথাই স্যারকে বলতাম। স্যার শুনে হাসতেন।
আমার ৮ম গল্পগ্রন্থ স্যারকে ডেডিকেট করে লিখলাম—
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
প্রিয় লেখক, প্রিয় মানুষ
এ জগতের যত প্রিয় সবই বুঝি অকালে হারায়? জানি না। আমি তো হরদম হারিয়ে ফেলছি।
হারিয়েছি আমার প্রিয় বাবা, প্রিয় বড়চাচা, প্রিয় বড়চাচিমাকে। হারিয়েছি আমার একমাত্র প্রেমিককে। বহু পথ পেরিয়ে আমি যাকে পেয়েছিলাম। পেয়ে ভুলতে পেরেছিলাম যত দুঃখবেদনা আর অপমানের অগ্নিকুন্ডকে। আহ! সে ছিল আমার স্বপনচারী। আমার ভরসার জায়গা। আনন্দের সরোবর।
মনজুর স্যারকে আমি বিদায় বলতে পারিনি। কীভাবে তা বলা যায়? কীভাবে তা বলা যেত? যতদিন আমার আয়ু ততদিন তিনি তো রইবেন আমার চিন্তায়। আমার চেতনায়।
মেইপল গাছেরা কেমন ঝিমিয়ে পড়ছে। ওদের ছায়ারা ফিকে হয়ে উঠছে। রাতের পরতে পরতে হিমের ধারালো নখ উন্মুখ হয়ে উঠছে আক্রমণ-অভীস্পায়।
আমি তাকিয়ে আছি ল্যাপটপের ম্লান আলোর দিকে।
রাস্তার আলোগুলি কী দারুণ উজ্জ্বল। চলন্ত যানবাহনের শব্দে রাতের নির্জনতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ছে।
মানুষের আয়ুর কাল কতদিন? কীজন্য এত মারামারি আর কাড়াকাড়ি? এত ঝুটঝামেলা? এত লোভ আর জিঘাংসা? রিরংসা? হানাহানি আর কাটাকাটি?
স্যার, এই পৃথিবীর আপনাকে ভারি প্রয়োজন ছিল। ঘন-হয়ে-থাকা অন্ধকারে পথ দেখানোর জন্য আপনাকে বড় দরকার ছিল।
স্যার, শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? আপনার মতো আর কে আসবে? কে থাকল আর এই অন্ধকার ঘুচিয়ে দেবার?
আপনি রাজার মতো এসেছিলেন। মাথা উঁচু করা রাজার মতোই অন্তর্ধান হলেন। কাউকে কিছু বলার বা বোঝার স্কোপ দিলেন না। জানার অবকাশ দিলেন না! নিজের পায়ের ওপর ভর করে হেঁটে হেঁটে ঘন কুয়াশার ভিতর হারিয়ে গেলেন। কই যে গেলেন তা নিজেও কি জানলেন? নাকি আমাদেরও জানতে দিলেন?
দুম করে অদৃশ্য হয়ে বুঝিয়ে দিলেন—এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর…
১০ অক্টোবর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৯ || পাপড়ি রহমান - June 17, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৮ || পাপড়ি রহমান - June 11, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৭ || পাপড়ি রহমান - June 7, 2026

COMMENTS