পোস্টমর্টেম ও অন্যান্য কবিতা || আবদুর রাজ্জাক

পোস্টমর্টেম ও অন্যান্য কবিতা || আবদুর রাজ্জাক

শেয়ার করুন:

এবং খুব ব্যক্তিগত
আমরা জলকে বলেছিলাম স্বচ্ছতা, কিন্তু জলের নিচে লুকিয়ে ছিল
ডুবে-যাওয়া মুখগুলোর নাম।
ফুলের রঙ লিখতে লিখতে আমাদের আঙুলে লেগে গেল
অপরিচিত রক্তের গন্ধ, যা কোনো বইয়ে ছাপা হয় না।

পথের কথা বলেছি—যে-পথে মানুষ হেঁটে যায়,
আর মাঠের কথা—যেখানে বাতাস শুয়ে পড়ে সন্ধ্যায়।
কিন্তু সেই পথেই পড়ে ছিল ফেলে-যাওয়া স্বপ্ন,
মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল নীরব হাহাকার।

লিখতে গিয়ে টের পাই, শব্দগুলো আর নিরপেক্ষ নয়,
তারা চোখ বেয়ে নেমে আসে—ঝড়ের মতো, অনবরত।

আমাদের চোখ তখন কেবল চোখ থাকে না,
হয়ে ওঠে ভাঙা আকাশ, যেখান থেকে কষ্টের কান্না ঝরে পড়ে
নামহীন, অবিরাম, এবং খুব ব্যক্তিগত।

 

 

অবাক হই না!
এই বাক্যালাপের কোনো মানে ছিল না,
আমি তো মেঘলা আকাশ দেখেছি অনেক!
মেঘ হয়েছে, বৃষ্টি হয়নি।

আমি অবাক হই না, কারণ আমার বোধ নেই—
চোখের সামনে যা ভাঙে, তাকে আমি শুধু দৃশ্য বলি।

নিঃশব্দ কান্নাগুলো শব্দহীন বৃষ্টির মতো পড়ে যায় আমার ভেতর।
প্রশ্নেরা আসে, কিন্তু উত্তর চাইবার সাহস জাগে না।

আমি হাঁটি অভ্যাসের পথে, অনুভূতির মানচিত্র ছাড়া।
তাই বিস্ময় নয়—শূন্যতাই আমার সবচেয়ে পরিচিত ভাষা।

 

 

এই তো যখন দাঁড়ালে
সময় হলে ঠিক চলে আসবে, ঠিক ঠিক বৃষ্টির দিনে ভিজবে,
কেউ কেউ বন্যার কথা বলে খুব কাঁদবে,
আমি বাড়ি ফেরা মানুষ দেখব,
তাদের হাসিগুলো, কান্নাগুলো জড়ো করে রাখব;
যেন তারা কোনোদিন দেখা হলে তুলে নিতে পারে।

সময়, সে তো নীরব কারিগর, নিজের ছন্দে এসে দাঁড়ায়
যেমন বৃষ্টি আসে, ঠিক যখন তার আসার কথা!
ধুয়ে দেয় ধুলো, ভিজিয়ে দেয় শহর।

যারা বাড়ি ফিরেছি নাগরিক কোলাহল শেষে
তারা, জানালার কাচের ওপাশ থেকে দেখি এই দৃশ্য,
মাঠ থেকে, পথ থেকে, ঠিক যেমন দেখা যায়।

 

 

অপূর্ণতার ভাষা
অনেক হৃদয় ক্ষয় করে, চেনা এক ভোরে,
শূন্যস্থানগুলো ঢেকে রেখে দিই—যেন ফাটলগুলো লজ্জা পায়।
আমরা আলোকে ব্যবহার করি নিজেদের অন্ধত্ব ঢাকতে,
চুপচাপ দাঁড়িয়ে-থাকা সময় হঠাৎ হঠাৎ শব্দ হয়ে ওঠে।

কিছু মুখ থাকে যাদের নাম মনে থাকে না,
তবু তারা প্রতিদিন আমার চিন্তার দরজায় এসে দাঁড়ায়।

আমি শ্বাস নিই ভাঙা ধারণার মাঝখান দিয়ে,
আর বিশ্বাস করি—
অপূর্ণতাই আমাদের সবচেয়ে সত্য ভাষা।

 

 

নাম ঝরে পড়ার পর
দেখলাম যে সুর ছিল না, বসে গেলাম একটি কাঠের খণ্ডে।
নদীটাও বেসামাল নয়, শান্ত, ধীর।
প্রতিদিনকার মতোই সে বইছে।

কিন্তু আমি নতুন।
সে আমাকে তার প্রায় হারানো জৌলুস দেখাচ্ছে—
জলের ভেতর ঘুমিয়ে-থাকা কেউ, ডুবন্ত পাতার স্মৃতিভাষা পড়ছে।

সময় এখানে ঘড়ি পরে না, হাওয়া কথা বলে স্মৃতির সঙ্গে;
আমার নাম খুলে পড়ে থাকে তীরে, নদী জানে,
নতুন হওয়া মানে আনাড়ি নয়—
জানা আছে ডুবে যেয়ে ভেসে ওঠার কৌশল।

 

 

বসন্ত
শব্দের আগে যে নীরবতা ছিল সেখানে হঠাৎ সবুজের জন্ম হয়।
আজ কোনো পাখি ডাকছে না—
মানুষের ডাক আজ পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশে।

রঙেরা তাদের নাম ভুলে গেছে, গন্ধেরা দিকচিহ্নহীন ঘুরে বেড়ায়।
আমার ভেতরেও কেউ একজন পাতা গজানোর শব্দ শুনতে পায়।

আহা বসন্ত!
বসন্ত মানে হয়তো চেনা প্রকৃতির ভেতরে
অচেনা স্বপ্নের অনুপ্রবেশ।

 

 

জলের ছায়া ও দীর্ঘ রাত
চারিদিকে ঘাস ছিল—ছিল না মানুষ;
ধুসর ফ্যাকাসে চাঁদ
কার্তিকের অন্ধকারের ভিতরে।
কিছু ছায়া ছিল ভূতের—নয়তো জীবনের
ছিল স্থির দাঁড়িয়ে;
কখনও থাকে, কখনও থাকে না!
মনে হয় আমি জানি এই সব;
জানি, জলের অতল—ডাকে রোজ,
মধ্যরাতে এক অদৃশ্য পুকুর সে,
যার কিনারা নেই, তলও দেখিনি কোনোদিন।
ডুবে যাওয়ার আগে—শেষ কোনো খুড়কুটো
যদি ভেসে আসে হাতের কাছে,
এই আশা জেগে থাকে
যেন কিছু ভালোবাসা, ভুলে-যাওয়া নক্ষত্রের মতন
পেয়ে যাই—এই প্রার্থনায় ঘুম দীর্ঘায়িত করি!

 

 

উৎসব
চাকার নিচে পড়ে থেঁতলে যাওয়ার কথা
অথচ দিব্যি দাঁড়িয়ে নদীর হাওয়া লাগাই শরীরে!
মাড়িয়ে-দেওয়া ফুল অবহেলা করেছো
তবুও প্রাণপণ সুগন্ধ ছড়াতে সে আয়োজন করে বসে
আসো বা না আসো, উৎসব কিন্তু জমবেই!
সে-আয়োজনের সে-ই তো কারিগর
তার ইচ্ছের কাছে মাটিগুলো আর চুপ থাকে না
নানা পাত্রে রূপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ঘরে ঘরে।

 

 

উপলব্ধি
মেয়ে বললো, আমি কবিতা লিখলে
সেখানে যেন পাখিদের কথা থাকে,
ফুল তো অবশ্যই থাকবে!

সে চেনে পাখিদের গান
জানে ফুলেদের ঘ্রাণ।

আর আমি জেনেছি পৃথিবীর পথে পথে
ফুল, মালা হাতে সবাই গাইবে না;
সেও জেনে যাবে নিশ্চিত!

তবুও ফুলের প্রতি, পাখিদের প্রতি তার
ভালোবাসা থাক।

 

 

পোস্টমর্টেম
প্রতি ভোরে উঠি, প্রিয় মুখ দেখি আয়নায়
যেভাবে ভাবি সেভাবে নয় মোটেও
চোখ সরাই। লুকাতে হবে কপালের ভাঁজ…

প্রতিদিন মগড়ার ‍বুক, প্রতিদিন একই অসুখ
আমাকে টানে।

মাঝে মাঝে কুঁজো মগড়ার জলে
দেখি আমারই ‍মৃত মুখ
আহা! সে পবিত্র নয়, তবুও শান্ত ঘুমে রয়েছে নীরব
অসংখ্য ছবির কোলাজ হয়ে ধীরলয়ে ভেসে যায়।

আবদুর রাজ্জাক। জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭। জন্মস্থান নানাবাড়ি টাঙ্গাইল। বাবার সরকারি চাকরির কারণে ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোণা জেলায় কেটেছে। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায়। ভালো লাগে পড়তে, লেখালেখি করতে ও ভ্রমণ করতে। প্রকাশিত তিনটি বই। প্রথম বই ‘মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ’ প্রকাশ হয়েছিল ২০১০ সালে, ভাষাচিত্র  প্রকাশনী থেকে। দ্বিতীয় বই ‘পথশূন্য এক টুকরো পাথর’ প্রকাশ হয়েছিল ২০১২ সালে, কালিদাস  প্রকাশনী থেকে। তৃতীয় বই ‘হাঁটার দূরত্বে শূন্যতার গভীরে’ প্রকাশ হয়েছিল ২০২২ সালে, চৈতন্য  প্রকাশনী থেকে।


পোস্টমর্টেম ও অন্যান্য কবিতা ।। আবদুর রাজ্জাক ।। গানপার ২০২৬


গানপার কবিতার, কবিতার গানপার

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you